বন্ড বুঝতে পারল না তার চালটা কাজ দিয়েছে কিনা। ডক্টর নো এবং ডক্টর নো-র জীবন কাহিনী যেন এক দুর্ভেদ্য মায়াজাল। তার বলা ইতিবৃত্ত সত্যি বলেই মনে হচ্ছে। হয়ত পৃথিবীতে আরও অনেক মানুষের এরকম নিজস্ব, গোপন রাজ্য রয়েছে যেখানে তারা যা খুশি তাই করতে পারেন।
কিন্তু তাদের মত গোটা দুই বিরক্তিকর মাছিকে টিপে মারবার পর ডক্টর নো কি করতে চলেছেন? আর যদি তিনি বন্ড ও মেয়েটাকে মেরেই ফেলেন, বন্ডের খুঁজে পাওয়া সূত্র কি লন্ডনের বড়কর্তারা ধরতে পারবেন? হয়ত পারবেন। প্লেডেল স্মিথ আছেন, তিনি জানেন বিষাক্ত ফলগুলোর কথা। কিন্তু ডক্টর নোর বিরুদ্ধে বন্ডের জায়গায় যে আসবে, সে কতদূর সফল হবে? বন্ড ও কোয়ারেলের নিরুদ্দেশ রহস্য ডক্টর নো স্রেফ উড়িয়ে দেবেন। বলবেন যে কোনদিন তাদের নামই শোনেননি। ডক্টর নো-র জীবনের পরবর্তী অধ্যায় যাই হোক না কেন, তাতে বাধা দেবার কেউ নেই।
মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বন্ড আগামী বিপদের জন্য তৈরি হচ্ছিল। তার প্লেটের পাশে অজস্র অস্ত্র। কাটলেট আসতে বন্ড ছুরিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল যেন ঠিক করতে পারছে না কোনটা নেবে। শেষে একটা পাউরুটি কাটা ছুরি বেছে নিল। খাওয়া আর কথাবার্তার মাঝে মাঝে সে বড় মাংস কাটার ছুরিটা নিজের দিকে সরিয়ে আনতে লাগল। তারপর ডানহাত প্রসারিত করে কি একটা বলতে গিয়ে যেন অসাবধানে শ্যাম্পেনের গ্লাস উল্টে ফেলল এবং গ্লাসের উল্টে যাওয়ার যে এক মুহূর্ত বিভ্রান্তির সৃষ্টি হল তারই মধ্যে ছোরাটা চলে এল বন্ডের কিমানোর হাতার ভেতর। ক্ষমা প্রার্থনা, ছিটিয়ে পড়া শ্যাম্পেনের মোছামুছি ইত্যাদি গোলমালের মধ্যে বন্ড একবার বাঁ হাত তুলল, আর ছোরাটা পাঁচরের মধ্যে চলে এল। কাটলেট শেষ করে সে কোমরের সিল্কের বেল্টটা শক্ত করে বাঁধল। ছোরাটা এখন ঠিক করে পেটের ওপরে।
খাওয়া শেষ হল। কফি এল। প্রহরী দুজনে এসে দাঁড়াল বন্ড ও মেয়েটার পেছনে। দুই বাহু বুকের ওপর সংবদ্ধ করে, তারা দাঁড়িয়ে রইল অবিচলিত অনড় ভঙ্গিময় যেন দুই জল্লাদ।
ডক্টর নো আস্তে তার প্লেটের ওপর কাপ নামিয়ে রাখলেন। ইস্পাতের থাবা দুটো রাখলেন টেবিলের ওপর। বন্ডের দিকে ঘুরে বললেন, খাবার পছন্দ হয়েছে, মিঃ বন্ড?
সামনের রূপার বাক্স থেকে একটা সিগারেট তুলে বন্ড ধরাল। রূপার লাইটার নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। সে অনুভব করছিল এবার দুঃসংবাদ আসছে। যে করেই হোক এই লাইটারটা পকেটস্থ করতে হবে। আগুন একটা ভাল অস্ত্র। সহজভাবে বলল, হ্যাঁ, চমৎকার রান্না। মেয়েটার দিকে ঘুরে তাকাল। সামনের দিকে ঝুঁকে কনুই দুটো টেবিলের ওপর এমনভাবে রাখল যাতে লাইটারটা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যায়। মেয়েটার দিকে হেসে বলল, আশা করি আমি যা যা অর্ডার দিয়েছিলাম তা তোমার ভাল লেগেছে?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। রান্নাটা চমৎকার হয়েছিল। মেয়েটা বোধহয় এখনো উৎসবের মেজাজেই আছে। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল বন্ড। বুকের ওপর দু হাত জড়ো করল। লাইটার চলে এল বাঁ দিকের বগলে। খুশির হাসি হেসে বলল, এরপর কি ডক্টর নো?
এবার আমরা নৈশভোজের পরবর্তী অনুষ্ঠান শুরু করতে পারি, মিঃ বন্ড। পাতলা হাসিটা একবার দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল। আপনার প্রস্তাব আমি সব দিক দিয়ে বিবেচনা করে দেখেছি। এ প্রস্তাব মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
বন্ড বলল, কাজটা ভাল করলেন না।
না, মিঃ বন্ড। আমার সন্দেহ হচ্ছে যে আপনি আমাকে লোভ দেখাচ্ছেন। আপনার মত লোকেরা ঠিক ওভাবে কাজ করে না। আপনাদের কাজ হল নিয়মিত সদর দপ্তরে রিপোর্ট পাঠানো। এটা আমার জানা আছে। কিন্তু আপনি যা। বললেন সে ধরনের কাজ গুপ্তচরেরা করে না। আপনি বোধহয় সম্প্রতি বড় বেশি রহস্য কাহিনী পড়ছেন। না, মিঃ। বন্ড, আপনার কাহিনী আমি সত্যি বলে মেনে নিতে পারছি না। আর যদি তা সত্যি হয়, তার প্রতিফলের মুখোমুখি। হতে আমি রাজি আছি। আমি যা করতে চলেছি সে পথ থেকে সরে আসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার অনেক বড় ক্ষতি হবে তাতে। ধরুন যদি পুলিশ বা সৈন্যরা এসে পড়ে, প্রশ্ন করে সেই লোকটি বা সেই মেয়েটি কোথায়? আমি বলব, আমি কিছু জানি না। দয়া করে এখান থেকে চলে যান। আমার গুয়ানেরায় আপনারা উপদ্রবের সৃষ্টি করছেন। কি প্রমাণ আছে আপনাদের হাতে? সার্চ ওয়োরেন্ট আছে? নেই? মহাশয়গণ, বৃটিশ আইন অত্যন্ত কড়া। আপনারা বাড়ি যান আর আমাকে আমার প্রিয় পাখিদের নিয়ে শান্তিতে থাকতে দিন।
বুঝতে পারছেন মিঃ বন্ড? এবার ধরা যাক সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা যদি ঘটে–অর্থাৎ আমার চরদের মধ্যে কেউ একজন যদি সব ফাঁস করে দেয়, যদিও সে সম্ভাবনা খুব কম (মিস চুং এর আশ্চর্য দৃঢ়তার কথা তার মনে পড়ল)। তাতে আমার কতটুকু এসে যাবে? আপনাদের দুজনকে মারবার জন্য আমার অপরাধের বোঝা কতটুকু আর বাড়বে। মিঃ বন্ড, মানুষকে একবারের বেশি ফাঁসি দেওয়া যায় না।…আর কিছু বলবার আছে? কোন প্রশ্নঃ বাকি রাতটা আপনাদের ভাগ্যে অনেক পরিশ্রম আছে। সময়ও কমে আসছে। আর আমার খানিকটা ঘুমিয়ে নেওয়া দরকার। একমাস পর আগামীকাল আমার জাহাজ আসছে। মাল তোলার দেখাশুনা আমাকেই করতে হবে। সারাদিন জেটির ধারে কাটবে। বলুন মিঃ বন্ড।
