তারা এখন সোনা সরোবরের নিচে। আমি আমার সবচেয়ে পাকা তিনজন লোককে এ কাজে পাঠিয়েছিলাম। জ্যামাইকা আমার কয়েকজন চর আছে। তারা সংখ্যায় কম কিন্তু কাজে সুদক্ষ। জ্যামাইকায় ও কিউবার গোয়েন্দা বিভাগের কাজকর্মের ওপর কড়া নজর রাখে। ভবিষ্যতে আমি যা করতে চাইছি, তাতে এর প্রয়োজন অনেক। আপনাদের মিঃ স্ট্র্যাংওয়েজ সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। অনুসন্ধানও শুরু করেছিলেন। সৌভাগ্যবশত ততদিনে ভদ্রলোকের দৈনিক কর্মসূচি আমার জানা হয়ে গিয়েছিল। তাকে এবং মেয়েটিকে হত্যা করা নেহাৎ ছকে বাধা এক কাজ। একই উপায়ে আপনাকে শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনার ভাগ্য ভাল। অবশ্য রাজবাড়ির ফাইল থেকে জেনেছি আপনি কি জাতের মানুষ। আমি ভেবেছিলাম আপনি নিজেই এসে আমার ফাঁদে ধরা দেবেন। রাডার স্ক্রীনে আপনার নৌকা ধরা পড়তেই বুঝলাম যে এবার আর আপনি পালাতে পারবেন না।
বন্ড বলল, আপনার রাডারের কাজ তেমন ভাল নয়। দুটো নৌকা এসেছিল। আপনারা দেখেছেন এ মেয়েটির নৌকা। বিশ্বাস করুন, এ ব্যাপারে ওর কোন ভূমিকা নেই।
সে ক্ষেত্রে বলতে হবে মেয়েটির ভাগ্য খারাপ। ব্যাপার হচ্ছে যে, একটা ছোট এক্সপেরিমেন্টের জন্য আমার একজন শ্বেতাঙ্গ মেয়ে দরকার। আপনার বোধহয় মনে আছে মিঃ বন্ড যে, আমি একটু আগে বলছিলাম, মানুষ যা চায়। চাই পায়।
বন্ড চিন্তিতভাবে ডক্টর নোর দিকে তাকাল। ভাবল এই অদম্য মানুষটিকে দমিয়ে দেবার একটা চেষ্টা করা উচিত হবে কিনা। তার হাতে কোন তুরুপের তাস নেই। যে উপায়টুকু আছে তা সামান্য। তবু সে সহজ ও নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলল, আপনার কপাল মন্দ, ডক্টর নো। লন্ডনে আপনার নামে একটা ফাইল খোলা হয়েছে। এই কেস সম্পর্কে আমার ধারণা আর বিষাক্ত ফল, দানব মাকড়সা ও ভাঙা সানবীম গাড়ির প্রমাণ সব লিপিবদ্ধ হয়েছে। সেই সঙ্গে মিস চুং ও মিস তারোর নাম। জ্যামাইকায় একজনের উপর আমার নির্দেশ আছে যে তিনদিনের মধ্যে আমি ক্র্যাব-কী থেকে না ফিরলে সে আমার রিপোর্ট খুলবে ও সেইমত কাজ করবে।
বন্ড একটু থামল। ডক্টর নো-র মুখের ভাব অবিচলিত রয়েছে। ঘাড়ের কাছে জুগুলার শিরাটা একই তালে স্পন্দিত হচ্ছে। এতটুকু সামনের দিকে ঝুঁকে নরম গলায় বন্ড বলল, কিন্তু কেবলমাত্র এই মেয়েটির নিরাপত্তার জন্যই, ডক্টর নো, আমি আপনার সঙ্গে একটা রফা করতে রাজি আছি। আমাদের যদি আপনি নিরাপদে জ্যামাইকায় ফিরে যেতে দেন, তাহলে আপনাকে পালাবার জন্য আমি এক সপ্তাহ সময় দেব। আপনি এরোপ্লেনে চেপে আপনার সেই ডাক টিকিটের খাম পকেটে নিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
বন্ড হেলান দিয়ে বসে বললেন, কি মনে হয় ডক্টর নো?
.
যন্ত্রণার সীমারেখা
বন্ডের পেছনে একটা শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল, খাবার দেওয়া হয়েছে।
চট করে পেছন ফিরল বন্ড সেই দেহরক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে আরেকটি লোক, চেহারায় যেন তারই যমজ। তারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল পেশীবহুল শরীর, দু-হাত কিমানোর হাতার ভেতর ঢোকানো। তাকিয়ে আছে ডক্টর নোর দিকে।
নটা বেজে গেল দেখছি। ডক্টর নো আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। আসুন। আরো অন্তরঙ্গ পরিবেশে গল্প করা যাবে। আপনাদের অনেক অনুগ্রহ যে এত ধৈর্যের সঙ্গে এতক্ষণ আমার কথা শুনলেন।
সাদা পোশাক পরা লোক দু জনের পেছনে খোলা জোড়া দরজা। ডক্টর নো-র পেছন পেছন বন্ড ও মেয়েটি এসে পড়ল মেহগনির প্যানেল দেওয়া এক অষ্টভুজ কক্ষে। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা রূপার তৈরি ঝাড়লণ্ঠন জ্বলছে। তার নিচে তিনজনের জন্য সাজানো খাবার টেবিল। রূপা আর কাঁচের তৈরি বাসনগুলো থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে। পায়ের নিচের ঘন নীল কার্পেটে পা ডুবে যায়। ডক্টর নো বসলেন মাঝখানের উঁচু চেয়ারটাতে। মেয়েটিকে তার ডানদিকের চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করলেন। তারা বসে সাদা সিল্কের ন্যাপকিনের ভাজ খুলল।
তাদের শেষ ভোজের এই ফাপা অনুষ্ঠান আর এই সুন্দর ঘর যেন বন্ডের মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল। ইচ্ছে করল, এ সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার করতে আর এই সিল্কের ন্যাপকিনে ডক্টর নো-র গলাটা পেঁচিয়ে চাপ দিতে যতক্ষণ না ঐ হতচ্ছাড়া কালো চোখ দুটো থেকে কন্ট্যাক্ট লেন্স জোড়া ঠিকরে বেরিয়ে আসে।
দেহরক্ষী দুজন হাতে সাদা দস্তানা পরে দক্ষ হাতে পরিবেশন করে চলল। মাঝে মাঝে ডক্টর নো চীনে ভাষায় দু একটা নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
প্রথম দিকে ডক্টর নো খাওয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকলেন। ধীর গতিতে পরপর তিন পাত্র সুপ তিনি খেলেন। খাচ্ছিলেন। ছোট হাতওয়ালা একটা চামচের সাহায্যে। চামচটা তার সাঁড়াশি হাতের ফাঁকে ঠিকঠিক আটকে আছে। বন্ড চেষ্টা করছিল তার গোপন আতংক মেয়েটার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে। খুব সহজভাবে খাবার খেল। পান করল–যেন। তার কত খিদে পেয়েছে। মেজোরে সঙ্গে মেয়েটার সঙ্গে জ্যামাইকার গল্প জুড়ে দিল। কথা বলল ফুল, পাখি, ও জানোয়ারদের নিয়ে, যে সব বিষয়ে মেয়েটা স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে পারবে। মাঝে মাঝে টেবিলের নিচে মেয়েটার। পায়ে চাপ দিচ্ছিল। তাতে মেয়েটা খুব স্বচ্ছন্দ ও উচ্ছল হল। বন্ড মনে মনে ভাবল অভিনয়টা চমৎকার চলছে, তারা। যেন একজোড়া বাগদত্ত স্ত্রী-পুরুষ, নৈশভোজ খাচ্ছে এক বদরাগী কাকার বাড়িতে।
