একটু থেমে ডক্টর নো বললেন, মিঃ বন্ড আমি বলেছিলাম যে এই চৌদ্দ বছর ধরে আমার ভাগ্যাকাশে কোন মেঘসঞ্চার হয়নি। কিন্তু এক টুকরো মেঘ সেখানে ছিল। ভেসে বেড়াচ্ছিল দিগন্তের ঠিক নিচে। আপনি জানেন সেটা কি? একটা পাখি, হাস্যকর পাখি যার নাম রোজেট শুনবিল। সে সবের বিবরণ দিয়ে আপনাকে ক্লান্ত করব না, মিঃ বন্ড। কিছু কিছু ঘটনা আপনার নিশ্চয় জানা আছে। পাখিদের ওয়ার্ডেন দুজন মাইল কয়েক দুরে দীঘির একপাশে থাকত। তাদের খাবার-দাবার ও জিনিসপত্র আসত কিউবা থেকে একটি লঞ্চ করে। ঐ লঞ্চেই নিয়মিত তারা তাদের রিপোর্ট পাঠাত। মাঝে মাঝে আমেরিকা থেকে পক্ষী বিশেষজ্ঞরা ঐ লঞ্চে করে আসতেন ও কিছুদিন ওয়ার্ডেনদের কুটিরে কাটিয়ে যেতেন। এই নিয়ে আমি একটুও মাথা ঘামাতাম না। জায়গাটা আমার এলাকার বাইরে। সুতরাং তাদের দেখা-সাক্ষাৎ অসম্ভব ছিল। প্রথম থেকেই আমি অভোবন সোসাইটিকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি যে, তাদের প্রতিনিধির সঙ্গে আমি দেখা করব না।
আর তারপর কি হল জানেন? একদিন বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মত সেই লঞ্চে করে আমার জন্য একটি চিঠি এল। রোজেট শুনবিল নাকি সহসা পৃথিবীর এক বিচিত্রতম পাখি হয়ে উঠেছে। চিঠিতে অড়োবন সোসাইটি নেহাৎ ভদ্রতা করে আমাকে জানালেন যে এই দ্বীপে তাদের ভাড়া নেওয়া জায়গায় একটা হোটেল তৈরি করবে। সারা পৃথিবীর পক্ষী প্রেমিকরা এখানে এসে থাকবেন এই পাখিদের পর্যবেক্ষণ করবার জন্য। অনেক বাগাড়ম্বর সঙ্গে সেই চিঠিতে তিনি জানালেন যে ক্র্যাব-কী বিশ্ববিখ্যাত হতে চলেছে।
মিঃ বন্ড, ডক্টর নো-র মাপা হাসিতে বিদ্রুপের ছোঁয়া, কল্পনা করতে পারেন? এত বছরের পরিশ্রমে আমি যে গোপনীয়তা অর্জন করেছি, ভবিষ্যতের যে কর্মসূচি স্থির করেছি–সব কিছু নষ্ট হতে চলেছে একদল বুড়ি ও তাদের পাখির জন্য।
আমি তাদের ভাড়ার দলিল পরীক্ষা করলাম। বিরাট টাকার বিনিময়ে ঐ জায়গাটা কিনে নেবার প্রস্তাব জানিয়ে চিঠি দিলাম। তারা প্রত্যাখ্যান করলেন। সুতরাং আমি ঐ পাখিদের পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলাম। আর সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পেলাম। খুব সোজা উপায়।
মানুষ চিরকাল এই পাখি শিকার করে এসেছে। এদের বড় শত্রু মানুষই। শুনবিল পাখিরা খুব ভীতু প্রকৃতির। আমি ফ্লোরিডায় তোক পাঠিয়ে একটা জলাভূমির বগী কিনে আনালাম। এই গাড়ি খনিজ তেল খোঁজবার কাজে ব্যবহার করা হয়। যে কোন জলাভূমিতে চলাফেরা করতে পারে। গাড়িটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে সম্পূর্ণ বদলিয়ে ফেললাম ভয় দেখাবার জন্য ও আগুন ছাড়াবার জন্য–শুধু পাখিদের নয়, মানুষকেও কারণ, ওয়ার্ডেন দুজনকে সরানোর প্রয়োজন হয়েছিল। তারপর গত-ডিসেম্বরের এক রাতে আমার জলাভূমির বর্গী ড্রাগনের আকৃতি নিয়ে সগর্জনে দীঘির ওপর দিয়ে এগিয়ে গেল। ওয়ার্ডেনদের কুটির ধ্বংস করা হল। আমি জানলাম দু জন ওয়ার্ডেনই নিহত হয়েছে। যদিও পরে জানা গেল যে তাদের একজন জ্যামাইকায় পালিয়ে যেতে পেরেছিল, এবং সেখানেই কয়েকদিন পরে মারা যায়। পাখিদের বাসা বাঁধবার জায়গা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। সম্পূর্ণ সফল হলাম। আতঙ্কজনিত হিস্টিরিয়া রোগে মারা গেল হাজার হাজার শুনবিল।
কিন্তু তারপর আমার জায়গায় একটা প্লেন নামানোর দাবি করা হল। ঐ ব্যাপারে নিয়ে নাকি তদন্ত হবে। আমি ভাবলাম রাজি হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একটা দুর্ঘটনার ব্যবস্থা করা হল। প্লেনটা যখন মাটিতে নেমে আসছে ঠিক তখন একটা লরী যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্লেনটার ওপর পড়ল। ধ্বংস হল বিমানটি। লরীর সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলা হল। মৃতদেহ কটি শানে কফিনে ভরে দুর্ঘটনার খবর পাঠান হল। আমি যা আশা করেছিলাম তাই হল, আরও তদন্তের জন্য একটি ডেস্ট্রয়ার এসে উপস্থিত হল। তার ক্যাপ্টেনকে সসম্মানে অভ্যর্থনা জানালাম আমি। তাদেরকে কুটিরের ধ্বংসাবশেষ দেখানো হল। আমার লোকেরা অভিমত প্রকাশ করল যে ওয়ার্ডেন দুজন নির্জনতার জন্য ক্ষেপে গিয়ে পরস্পর সঙ্গে মারপিট করেছে। একজন মারা গেছে, অন্যজন কুটিরে আগুন লাগিয়ে তার মাছ ধরবার নৌকাতে চেপে পালিয়েছে। বিমান অবতরণ ক্ষেত্রটা পরীক্ষা করলেন তাঁরা। আমার লোকেরা জানাল প্লেনটা অত্যন্ত জোরে নেমে এসেছিল। ফলে মাটি ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চয় চাকাগুলো ফেটে যায়। মৃতদেহগুলি হস্তান্তরিত করা হল। এই দুঃখজনক ঘটনার জন্য আমরা সমবেদনা জানালাম, অফিসাররা সন্তুষ্ট হলেন। জাহাজ চলে গেল। আবার সবকিছু শান্ত হয়ে গেল।
ডক্টর নো আস্তে করে কাশলেন। তাঁর চোখ বন্ডের ওপর থেকে মেয়েটির দিকে সরে গিয়ে আবার ফিরে এল। বন্দুগণ, এই আমার গল্প, যে দীর্ঘ বিচিত্র কাহিনী বলতে চলেছি, তার প্রথম পরিচ্ছেদ। আমার গোপনীয়তা আমি ফিরে পেলাম। রোজেট শুনবিলও আর রইল না। তাই কোন ওয়ার্ডেনও আর আসবে না। অভোবন সোসাইটি এবার আমার ঐ জায়গাটি কিনে নেবার প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখবেন। আবার যদি তারা কোন আজে বাজে কাজ শুরু করেন, তাদের ভাগ্যে আবার দুর্ঘটনা নেমে আসবে। এই ঘটনা সতর্ক করে দিয়েছে। আমার গোপনীয়তার আর কোন ব্যাঘাত ঘটতে দেব না।
আশ্চর্য! বন্ড বলল, আশ্চর্য এক ইতিহাস। তাহলে এই জন্যেই স্ট্র্যাংওয়েজকে সরাতে হয়েছিল। তাকে আর সে মেয়েটিকে আপনি কি করেছেন?
