এই সঙ্গে আমি নিজের চেহারা বদলাচ্ছিলাম। আমার প্রতিটি চুল উপড়ে ফেলা হল, মোটা নাক সরু হল। অধরোষ্ঠ প্রসারিত হল, ঠোঁট দুটো চিরে পাতলা করা হল। বেঁটে হওয়া সম্ভব নয় তাই আমি আরও লম্বা হলাম-জুতো উঁচু। গোড়ালি ওয়ালা ব্যবহার করে ও সপ্তাহ-পর-সপ্তাহ ট্র্যাকশনের সাহায্যে মেরুদণ্ড প্রসারিত করে। চলাফেরার ভঙ্গি বদলে ফেললাম। আমার যান্ত্রিক হাতের বদলে দস্তানার নিচে মোমের হাত ব্যবহার করতে শুরু করলাম। নতুন নাম নিলাম জুলিয়াস নো-আমার বাবার নাম অনুযায়ী জুলিয়াস আর তাঁকে এবং সব রকম কর্তৃত্বকে অস্বীকার করবার প্রতীক হিসাবে নো। চশমা ফেলে পরলাম কনট্যাক্ট লেন্স।
তারপর আমি চলে গেলাম মিলওয়াওকিতে। সেখানে একজনও চীনে থাকে না। ডাক্তারী পড়া শুরু করলাম। পড়াশুনার পরিবেশে নিজেকে লুকিয়ে ফেললাম–লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, ক্লাসঘর ও হোস্টেলের জগতে। আর সেখানে, মিঃ বন্ড, মানুষের দেহ ও মনের গবেষণায় ডুবে গেলাম। কেন? কারণ আমি জানতে চাইলাম আমার এই দেহ মনের ক্ষমতা কতদূর। ঠিক করেছিলাম এত সুরক্ষিত ঘাঁটি করব এবং সেখানে তপস্যায় নিমগ্ন থাকব। সেই ক্ষমতা মিঃ বন্ড, যার সাহায্যে সারাজীবন মানুষের কাছ থেকে যে ব্যবহার আমি পেয়েছি, তার প্রতিশোধ নিতে পারব,–জীবন মৃত্যু নির্ধারণের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও বিচার করবার ক্ষমতা এবং বাইরের কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়ার ক্ষমতা। কারণ মিঃ বন্ড, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুসের ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার সব মাধুর্য।
বন্ড বোতলটা টেনে এনে তৃতীয় গ্লাস পানীয় ঢাললো। হানিচাইলের দিকে তাকাল। মেয়েটা উদাস ভঙ্গিমায় বসে আছে যেন কিছু ভাবছে। বন্ডের দিকে তাকিয়ে হাসল।
ডক্টর নো সদয়কণ্ঠে বললেন, আপনাদের দুজনেরই বোধহয় খিদে পেয়েছে। একটু ধৈর্য ধরুন, আমি সংক্ষেপেই বলছি। আচ্ছা, আপনার মনে আছে আশা করি, যে আমার মিলওয়াওকিতে যাওয়া পর্যন্ত বলেছিলাম। যথাসময়ে ডাক্তারী পড়া শেষ করে আমি পৃথিবী পরিক্রমায় বেড়িয়ে পড়লাম। নিজের নামের আগে ডক্টর ব্যবহার করতাম, কারণ তাতে লোকের বিশ্বাস বাড়ে আর লোকেদের সন্দেহের উদ্রেক না করেও প্রশ্ন থেকে যায়। আমি ঘাটি করার মত জায়গা খুঁজছিলাম। জায়গাটা সমাগত যুদ্ধের রণক্ষেত্র থেকে দূরে থাকা চাই। একটা দ্বীপ হওয়া চাই, আর সেখানে ব্যবসায়িক উন্নতির সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকা চাই।
শেষ পর্যন্ত আমি এই ক্র্যাব-কী দ্বীপ কিনি। গত চৌদ্দ বছর আমি এখানেই বাস করছি। একটা বছর যথেষ্ট নিরাপদ ও ফলপ্রসূ হয়েছে, দিগন্তে কোন মেঘসঞ্চার হয়নি। পাখির নোংরা থেকে টাকা আনবার মতলব আমার ভাল লেগেছিল এবং আমি প্রচুর উৎসাহের সঙ্গে কাজ শুরু করি। আমার কাছে এ এক আদর্শ ব্যবসা বলে মনে হয়, গুয়ানোর চাহিদা কোনদিন কমবে না। পাখিগুলো সেবা-শুশ্রষার পরোয়া করে না। কেবল তাদের বিরক্ত না করলেই হল।
একমাত্র সমস্যা ছিল শ্রমিকদের নিয়ে। তখন ১৯৪২ সাল। কিউবা ও জ্যামাইকার সাদাসিধে মজুররা তখন আখ কেটে সপ্তাহ দশ শিলিং রোজগার করত। তাদের একশ জনকে আমি বারো শিলিং দেবার লোভ দেখিয়ে দ্বীপে আনলাম। পঞ্চাশ টাকা টনে গুয়ানো বেচে প্রচুর লাভ হল আমার। তবে একটা শর্ত রইল বেতন বাড়ানো হবে না। আমার দ্বীপের লোকেদের সভ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তারা জানতে পারল না শ্রমিকদের মজুরি কত বেড়েছে। তাদের কড়া হাতে শাসন করতে হয়েছিল, তার ফল হল যে তারা আমার এই মজুরিতেই খুশি।
এক ডজন চীনে নিগ্রোকে তাদের পরিবার সুদ্ধ নিয়ে এলাম ওভারশিয়ারের কাজ করবার জন্য। তাদের বেতন ছিল প্রতি সপ্তাহ এক পাউন্ড করে। লোকগুলো কাজের আর বিশ্বাসী। এক-এক সময় তাদেরকে নির্দয়ভাবে শাসন করতে হত। তবে কিছুদিনের মধ্যে তারা বশে এসে গেল। দ্বীপের লোকসংখ্যা বাড়তে লাগল। কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার ও স্থপতিকেও নিয়ে এলাম। পাহাড় খোঁড়ার কাজ শুরু হল। মাঝে মাঝে উঁচু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিশেষজ্ঞের দল নিয়ে আসতাম। তারা অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে মেশবার সুযোগ পেতেন না। যতদিন না কাজ শেষ হত তারা থাকতেন পাহাড়ের ভেতরের দিকে আর তারপর জাহাজে করে ফিরে যেতেন। পাহাড়ের অন্দরমহলের বৈদ্যুতিক আলো, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা আর লিফট তাদেরই তৈরি। তারা এই ঘরটাকেও বানিয়েছেন।
প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও জিনিসপত্র আসত পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে। অন্দরমহলের বাইরেটা এক ভুয়া স্যানাটোরিয়ামের মত করে তৈরি করা হল। কোন ভাঙা জাহাজের নাবিক বা জ্যামাইকার রাজ্যপাল যদি হঠাৎ এসে পড়েন, তাহলে তাদের চোখে ধুলো দেবার জন্যে। আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, অতিথিদের উপাদেয় অভ্যর্থনা দেবার ক্ষমতা আমার আছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য এক সুচিন্তিত সতর্কতা।
তারপর দিন কাটতে লাগল। পাহাড়ের ওপর জমলো আরও অনেক পাখির নোংরা, আর তার নিচে তৈরি হয়ে চলল আমার দুর্গ। অতি দুরূহ কাজ, মিঃ বন্ড। কিন্তু গত বছরের শেষে আমার কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এক গোপন, সুরক্ষিত ঘাটি আমি তৈরি করতে পেরেছি। এখন আমি পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য তৈরি। সে অধ্যায়ের উদ্দেশ্য বহির্জগতের ওপর আমার ক্ষমতা প্রয়োগ করা।
