বন্ড কিন্তু মনে সব ঠিক করে নিল। তাসেরা হারের কথা মনে করে না, অবশ্য জেতার কথাও না। সে আরো। তিনবার ব্যাংকার হয়ে খেলে গেল, জিতেও গেল এবং প্রত্যেক বারও আরো দশ লক্ষ করে জমা করে রাখল। সেই ছোট্ট ইংরেজ মহিলাটি এতক্ষণ খেলাটি অন্য জনের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এবার তার আসরে নামার পালা। সেই সময় বংকো বলল, বন্ড কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, সে বুঝতে পারল যে এখন ভদ্রমহিলা জিতে যাবে। এবং মহিলাটি জিতে গেল, সামান্য অসম্মানভাবেই–তাঁর পয়েন্ট ছিল এক আর বন্ডের হাতে তিনটি সায়েব মানে একে বারে শূন্য।
টেবিলের চারপাশে যেন মনে হল স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল সবাই। তাহলে এবার চাকাটা ঘুরে গেল। তারপর হিংসার গুঞ্জনের মধ্যে দিয়ে এক ফুট উঁচু ঝিনুকের চাকতির স্তূপটাকে বন্ডের দিকে এগিয়ে দিল–বন্ডের হাতের টাকাটা যার মূল্য ছেচল্লিশ লক্ষ ফ্রা যা প্রায় তিন হাজার পাউন্ড থেকেও বেশি হবে। বন্ড তখন যে পরিচালনা করছে তার দিকে একটা হাজার নতুন ফ্ৰা দামের চাকতি ছুঁড়ে দিল–ক্যাসিনোর প্রাপ্য কি এটা। নিয়ম অনুযায়ী পরিচালক ধন্যবাদ জানিয়ে দিল এবং যথারীতি খেলা চলতে থাকল।
একটা সিগারেট ধরাল জেমস বন্ড। এখন কোন দিকে তার নজর নেই, নজর নেই কোন খেলার উপর সঞ্চালিত জুতার উপর। যাই হোক অনেক টাকা পাওয়া গেল। অনেক বেশি টাকা তাই একটু বেশিই সাবধান হওয়া দরকার। একটু মুখ বুজে খেলতে হবে। তবে আবার অতিরিক্ত সাবধানতা নয়, বেশি কিপটেপনাও নয়। আজকের রাতটা খুবই সুন্দর। মাত্র মাঝ রাত্রি হয়ে গেছে। এর মধ্যে ঘরে ফিরে যাওয়া ভাল নয়। তবে তাই হোক। ব্যাংক যদি কাছে আসে তবেই সে খেলবে, তবে অন্যজনের উপর বংকো বলা হবে না, তা একবারেই নয়। এবার গরম হয়ে উঠল তাসগুলিও, তার একভাবে জিতে যাওয়া এইটা লক্ষণ। এবার মনে হয় অন্যরাও এই ভাবেই জিতে যেতে পারে, আর তাদের তাড়া করা মানেই নিজের হাতটা পুড়িয়ে ফেলা। বন্ড ঠিকই ভেবে নিয়েছিল। লিল্ পাঁচ নম্বরের চেয়ারটাতে বসে আছে– বস্ত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন। ভদ্রলোকের ব্যবহার নিতান্তই একেবারে অভদ্র গোছের, হেঁড়ে গলা করে কথা বলে যাচ্ছেন। সিগারেটও খাচ্ছেন একটা অ্যাম্বার আর সোনা দিয়ে তৈরি হোল্ডারের সাহায্য। তাসগুলিকে খুব বিশ্রীভাবে কচলাচ্ছেন, ঠিক মেয়েদের মতন। অতি বিচিত্রিত চিমটেতুল্য তার আঙুলগুলি দিয়ে এবং তাসের টেবিলে তা খুব জোরে ছুঁড়ে ফেলছিলেন। এবার যখন ভদ্রলোকের হাতে খেলা এল তখন তিনি খুব দ্রুত তিনটি বাজি জিতে গেলেন ও তারপর তাকে আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারল না। বন্ড তার প্ল্যান মত চুপ করে বসে আছে আর ব্যাংকটা বাড়তে বাড়তে ভদ্রলোক ছয় বার জিতবার পর গিয়ে দাঁড়াল কুড়ি হাজার নতুন ফ্রা মানে কুড়ি লক্ষ পুরানো ফ্রা-এ। টেবিলের খেলোয়াড়রা আবার সাবধান হয়ে উঠল। কেউ এখন আর টাকা ছাড়তে পারছে না।
ঠিক সেই সময় মেয়েটিকে দেখা গেল। পরিচালকের পাশে এমন ভাবে দাঁড়াল যেন মনে হল মাটি খুঁড়ে বের হল। শুধু বই দেখতে পেল একজোড়া সোনালি হাত, অপরূপ সুন্দর অথচ সোনালি মুখে উজ্জ্বল নীল চোখ দুটি আর মাদকতা ভরা গোলাপী ঠোঁট। একটি সাধারণ সাদা পোশাক ও কাঁধের ওপর লুটিয়ে পড়া ঢেউ খেলানো সোনালি চুল। তারপরেই সে শুনে ফেলল, বংকো।
কয়েক মিনিটের জন্য সব চুপচাপ। মেয়েটির দিকে সবাই ফিরে তাকাল। তারপর সেই পরিচালক বাজির কথা ঘোষণা করলেন, আর লিল-এর দানবটি (অন্ততঃ বন্ডের এখন তাই মনে হচ্ছে) তার জুতা থেকে টেনে নিয়ে চারখানা তাস বার করে নিল। পরিচালক তখন মেয়েটির তাস দুটি লম্বা চিমটে দিয়ে তার দিকে সরিয়ে দিলেন।
মেয়েটি একটু সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকল তাস তুলে নেওয়ার এবং ক্ষণিকের জন্য যেন তার পোশাকের–এর মত গলাটা একটু ফাঁক হয়ে গেল। শোনা গেল একটা তাস দিন।
থেমে গেল বন্ডের বুক। মেয়েটার হাতে নিশ্চয় পাঁচের বেশি পয়েন্ট নেই। দানবটি তার তাস উল্টে দিল–সাত পয়েন্ট। এবার তিনি মেয়েটির জন্য একটা তাস বের করে অবজ্ঞা করে টেবিলে ফেলে দিলেন। যেন মনে হল একটা বোকা বোকা চেহারার বিবি।
মোলায়েম ভাবে পরিচালক তার চিমটের মত আঙ্গুলের প্রান্ত দিয়ে মেয়েটির অন্য দুটি তাস উল্টে দিলেন। মোট পয়েন্ট হল চার। হেরে গেল মেয়েটা।
মনে মনে বন্ড একবার গুঙিয়ে উঠে ফের তাকিয়ে দেখল মেয়েটির অবস্থা।
সে যা দেখল তো মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। প্রধান পরিচালককে মেয়েটি হঠাৎ কি যেন বলে বসল। আর সেই ভদ্রলোক বারে বারে মাথা ঝাঁকিয়ে চলছে। তার গাল দুটিতে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। টেবিল ঘিরে আছে নিস্তব্ধতা। সবাই যেন মনের মধ্যে লালায়িত হয়ে উঠেছে যে কিছু একটা কেলেঙ্কারির আশায়। একটা চাপ অস্তিরতা বাতাসে ছড়িয়ে আছে। এই সময় বন্ড শুনতে পেল প্রধান পরিচালক দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন, মাদাম খুব দুঃখিত, অসম্ভব। এখানে কিন্তু ধারের ব্যাপার কোন ভাবেই সম্ভব নয়।
সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রচণ্ড নোংরা কলরব যা ক্যাসিনো ভর্তি যত জুয়াড়ী ও অজস্র দর্শকদের মধ্যে সাপের মত লকলকিয়ে ছড়িয়ে পড়ল দ্রুতভাবে। দ্য গ্যামবিট অব শেম। এটা অপমানের বাজি, হায় সৃষ্টিকর্তা, বন্ড ভাবতে বসল মেয়েটা কি করেছে! ওর কাছে কোন টাকা নেই, আর যে কোন কারণেই হোক ক্যাসিনোতে তার পক্ষে কোন ধার পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার।
