ডক্টর নো অবিচলিত কণ্ঠে বললেন, সৌন্দর্য ও মায়া ছাড়া কিছু নয়, মিঃ বন্ড। শিল্প, অর্থ, মৃত্যু আর জীবনটাও মায়া। আপনার কথার প্যাঁচ আমাকে বিচলিত করতে পারবে না। আমি দর্শন, নীতিশাস্ত্র ও তর্কশাস্ত্র পড়েছি। কিন্তু এসব নিষ্ফল তর্ক ছাড়া কিছু নয়। আসুন, আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে যাই। আমি বলছিলাম আমার ক্ষমতার উন্মাদনার কথা, অথবা আপনার ভাষায় ক্ষমতার স্বপ্নের কথা। আর মিঃ বন্ড, দয়া করে ভাববেন না, যে আপনার সঙ্গে আধঘণ্টা কথা বলবার ফলে আমার জীবনধারা বদলে যাবে। বরং আপনি আমার উদ্দেশ্য সাধনের, কিংবা বলা যাক, আমার বিভ্রান্তির ইতিহাস শোনায় আর একটু মন দিন।
বলে যান। বন্ড এক ঝলক মেয়েটার দিকে তাকাল।
ডক্টর নো সদয়কণ্ঠে বললেন, আমি চেষ্টা করব যাতে আপনারা ক্লান্ত না হন। তথ্যের চেয়ে ঘটনাই বেশি। আকর্ষণীয়, তাই না? ডক্টর নো তাকালেন কালো কাঁচের দেওয়ালের অপরদিকে একটি সুন্দর টিউলিপ শামুকের ওপর। শামুকটি দেওয়ালের মাঝামাঝি উঠে এসেছে। একঝাক ছোট ছোট রূপালি মাছ অন্ধকার ভেদ করে চলে গেল। ছাদের অনেক ওপরে তারারা আরো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে আকাশে।
ডক্টর নো বললেন, আমি ছিলাম এক জার্মান ধর্মযাজক ও একজন সান্তবংশীয়া চীনা মহিলার একমাত্র সন্তান। আমি জন্মেছিলাম পিকিং-এ, অনাবৃত দারিদ্রের মধ্যে, বাবা-মা-র এক অবাঞ্ছিত বোঝ। আমার মায়ের এক পিসিমা অর্থের বিনিময়ে আমাকে মানুষ করে তোলেন। বুঝতে পারছেন মিঃ বন্ড, স্নেহ ভালবাসার স্বাদ আমি পাইনি, বাবা মার যত্নও না। আমি সাংহাই গেলাম জীবিকার জন্য। কুখ্যাত টং দলের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। ষড়যন্ত্র, চুরি, খুন, সম্পত্তিনাশ–এ সবই আমার বড় ভাল লাগত। এ যেন আমার পিতার প্রতি বিদ্রোহের মত, যিনি চিরকাল আমাকে বঞ্চনা করেছেন।
তারপর গোলমাল বাধল। আমাকে সরানো দরকার হয়ে পড়ল। আমার মাথার দাম ছিল। টং দলের লোকেরা আমাকে খুন করতে চাইল না। আমাকে চালান করে দিল। আমেরিকায়। আমি নিউইয়র্কে বাসা বাধলাম। আমার সঙ্গে ছিল আমেরিকার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী টং দলের অন্যতম হিপ সিং দলের প্রতি লেখা এক সাংকেতিক পরিচয়পত্র। জানি না কি ছিল সেই চিঠিতে, কিন্তু দেখামাত্র তারা আমাকে এক ব্যক্তিগত কেরানির পদে নিল।
যথাসময়ে, ত্রিশ বছর বয়সে আমার পদোন্নতি হল কোষাধ্যক্ষ গোছের একটি পদে। আমার হাতে দশ লক্ষ ডলারেরও বেশি অর্থ এসে গেল। এই টাকার ওপর আমার লোভ হল। তারপরেই শুরু হল দ্বিতীয় দশকের শেষের দিকে সেই বিরাট টংদের গৃহযুদ্ধ। নিউইয়র্কের দুই বিশাল টং দল,আমার নিজের দল হিপ সিং ও তাদের প্রতিদ্বন্দী অন লী অঙ সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দু পক্ষের শত শত লোক মারা পড়ল। তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হল। শুরু হল নির্যাতন, নরহত্যা ও লুটপাটের রাজত্ব। আমি সানন্দে তাতে যোগ দিলাম। তারপর রায়ট দমনকারী পুলিশবাহিনী এসে পড়ল। দলের বড় কর্তারা সব ধরা পড়লেন।
আমি কিন্তু জানতে পেরেছিলাম পুলিশ কখন আমার দলের ওপর হানা দেবে। তার কয়েক ঘণ্টা আগে আমি দলের সিন্দুক ভেঙ্গে দশ লক্ষ ডলারের সোনা হাত করে অদৃশ্য হলাম। লুকিয়ে পড়লাম হালের্মের এক বিবরে।
বোকামি করেছিলাম। আমার উচিত ছিল আমেরিকা থেকে পালিয়ে পৃথিবীর সুদূরতম কোণে আত্মগোপন করা। নিউইয়র্কের সিং সি জেলের নিভৃত কক্ষ থেকে আমার দলের সর্দাররা হাত বাড়ালেন আমার দিকে। খুঁজে বের করলেন আমাকে। খুনীরা এল রাত্রির অন্ধকারে। অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে গেল। কিন্তু আমি বললাম না সোনা কোথায় লুকানো আছে। সারারাত নির্যাতন চলল। শেষে আমার কথা না পেয়ে, তারা আমার দু হাত কেটে ফেলে। তারপর আমার হৃৎপিণ্ডের ভেতর দিয়ে গুলি চালিয়ে চলে গেল।
কিন্তু তারা জানত না আমার হৃদপিণ্ড বুকের ডানদিকে অবস্থিত দশ লাখে বড়জোর একজন লোকের যা থাকে। আমি বাচলাম। আর সমস্ত সময় আমি ভাবলাম আর ভাবলাম–কি করে ঐ টাকা নিয়ে পালানো যায়? কিভাবে সঙ্গে রাখা যায়? কোন কাজে লাগানো যায়?
ডক্টর নো থামলেন। তার কপালের পাশে এক ঝলক রক্তিমাভা দেখা দিল। পুরানো স্মৃতি তাকে উত্তেজিত করে তুলেছে। বন্ড ভাবল, এইবার, এক্ষুনি লাফিয়ে পড়ে ভদ্রলোককে শেষ করে দেব? হাতের গ্লাসটা ভেঙ্গে তীক্ষ্ণ কাঁচের ফলার সাহায্যে।
চোখ দুটো খুলে গেল, আপনারা কি ক্লান্তি অনুভব করছেন? ঠিক তো? মনে হল এক মুহূর্তের জন্য আপনার মন বিক্ষিপ্ত হয়েছে।
না। সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল। বন্ড মনে মনে তার কাছ থেকে ডক্টর নো-র দূরত্ব মাপল, ভাল করে লক্ষ্য করল কিমানোর বাইরে বেরিয়ে আসা ঘাড়ের কাছের প্রাণবাহী জুগুলার শিরাটিকে।
বেগুনি রঙের পাতলা অধরোষ্ঠ বিভক্ত হল। গল্প বলা চলল, মিঃ বন্ড, তখন একটা স্পষ্ট ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমি গেলাম নিউইয়র্কের বৃহত্তম ডাকটিকিট বিক্রেতা সিলবারস্টাইন-এর কাছে। একটা খাম কিনলাম। সে খামে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দুলর্ভ কয়েকটি ডাকটিকিট। সবকটা জোগাড় করতে আমার কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল। কিন্তু যে কোন দামে সেগুলো কিনতে আমি রাজি ছিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল যাতে আমার সমস্ত টাকা আমি যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারি। সব টাকা আমি ঐ কটা ডাকটিকিটে খরচ করলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে। বুঝেছিলাম টাকার দাম পড়বে। দ্রব্যমূল্য বাড়বে। এ টিকিটগুলোর দামও বাড়বে।
