যাই হোক, আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যাক। একজন বুদ্ধিমান শ্রোতা পাওয়া আমার খুবই আনন্দের বিষয়। আজ আমি আপনাকে পৃথিবীর এক বিচিত্রতম মানুষের জীবনকাহিনী বলব। আপনিই প্রথম মানুষ যিনি এই গল্প শুনবেন। আমার জীবনে আপনিই বোধহয় একমাত্র মানুষ, যিনি এই গল্পের মূল্য বুঝতে পারবেন এবং শেষ কথাটির গুরুত্ব বুঝতে দেওয়ার জন্য একটু থেমে বললেন, অন্য কাউকে জানার সুযোগ পাবেন না। শেষ মন্তব্যটা অবশ্য মেয়েটির পক্ষেও খাটে।
এবার ব্যাপার বোঝা গেল। জ্যামাইকাতে যখন স্পষ্টতঃই তাকে খুন করবার চেষ্টা করেছিল তখন থেকে বন্ডের মনে এ সন্দেহ জেগেছিল। সে সন্দেহ তার দৃঢ় হল স্পনডাউ মেশিনগানের গুলি তার দিকে ছুটে আসবার সঙ্গে সঙ্গে। সে আনন্দাজ করেছিল যে, এই ভদ্রলোক একজন হত্যাকারী। বুঝেছিল যে তাকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হবে। চিরকালের মত এবারও তার বিশ্বাস ছিল যে সে জিতবে–অন্তত ড্রাগনের অগ্নিবর্ষণের মুখোমুখি হওয়ার আগে পর্যন্ত। তারপর থেকেই তার খটকা লেগেছে। তার পক্ষে এই মানুষটি বেশি শক্তিশালী, অত্যন্ত বেশি প্রস্তুত।
বন্ড বলল, মেয়েটার এসব শোনবার কোন দরকার নেই। আমার সঙ্গে ওর কোন সম্পর্কও নেই। গতকাল সমুদ্রতীরে দেখা হয়েছে। মেয়েটা জ্যামাইকান। মর্গান হারবারে থাকে। ওর পেশা ঝিনুক কুড়ানো। আপনার লোকেরা ওর নৌকা ভেঙ্গেছে তাই ওকে আমাদের সঙ্গে আসতে হয়েছে। আপনি বরং ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন, কাউকে কিছু বলবে না, প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিন।
হানি অত্যন্ত রেগে বলল, একশোবার বলব আমি। সবাইকে বলে দেব। আমি তোমার সঙ্গেই থাকব। এখান থেকে নড়ছি না।
বন্ড বলল, তোমাকে আমার কোন প্রয়োজন নেই।
ডক্টর নো মৃদুকণ্ঠে বললেন, ওসব বীরত্ব দেখিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। এ দ্বীপে একবার এলে কেউ ফিরে যেতে পারে না। বুঝতে পেরেছেন? একজনও নয়। সামান্য এক জেলেও নয়। এটা আমার নীতি। আমার সঙ্গে তর্ক করতে বা ধাপ্পা দিতে চেষ্টা করবেন না। তাতে কোন ফল হবে না।
বন্ড ডক্টর নো-র মুখটাকে ভালভাবে দেখল। তাতে কোন রাগ বা স্পর্ধার চিহ্ন নেই কেবল এক রাজসিক ঔদাসীন্য। সে কাঁধ ঝাঁকালো। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, ঠিক আছে, হানি। ওটা আমার মনের কথা নয়। তুমি চলে গেলে আমার খুবই খারাপ লাগত। এবার শোনা যাক, এই উন্মত্ত লোক কি বলতে চান।
মেয়েটা খুশি হয়ে ঘাড় নাড়ল। যেন তার প্রেমিক তাকে সিনেমা হল থেকে বার করে দেবে বলে শাসাচ্ছিল। এখন নরম হয়েছে।
ডক্টর নো বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন, মিঃ বন্ড। আমি সত্যিই এক উন্মাদ। ইতিহাসের প্রতিটি যুগান্তকারী মানুষই উন্মাদ ছিলেন। চিরকাল তারা উন্মত্তের মত নিজ নিজ উদ্দেশ্যে প্রতি ধাবিত হয়েছেন। যাবতীয় বড় বড় বৈজ্ঞানিক, শিল্পী, দার্শনিক, ধর্মগুরু,–সবাই উন্মাদ। অন্ধ একাগ্রতা ছাড়া আর কি তাঁদের প্রতিভাকে কেন্দ্রীভূত করতে, তাদের কর্মক্ষমতাকে কেবলমাত্র উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করতে পারে? মিঃ বন্ড, উন্মত্ততা প্রতিভার মতই অমূল্য। অপব্যয়িত কর্মক্ষমতা, বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারা, বিনষ্ট গতিবেগ, কাজ শেষ করবার পরবর্তী অলসতা–এ সবই সাধারণ মানুষের চিরন্তন দোষ। আমি এ সবের উর্ধ্বে। আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি এক উন্মাদ–মিঃ বন্ড, আমার উন্মত্ততা ক্ষমতার জন্যে। ক্ষমতাই আমার জীবনের মূলমন্ত্র। সেই জন্যেই আজ আমি এখানে। সেই জন্যেই আজ আপনাকে এখানে আসতে হয়েছে। এই দ্বীপের অস্তিত্ব ঐ একই কারণে।
বন্ড মদের গ্লাস শেষ করল। আবার ভর্তি করল। বলল, ভাববেন না যে আমি অবাক হয়েছি। অনেকেই ভেবে থাকে যে, সে ইংল্যান্ডের রাজা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, অথবা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। পাগলা গারদে এরকম অজস্র লোক আছে। আপনার সঙ্গে তাদের তফাৎ এই মাত্র যে, পাগলা গারদে বন্ধ না হয়ে আপনি নিজেই গারদ তৈরি করে নিজেকে বন্দী করেছেন। কিন্তু এ কাজ কেন করলেন আপনি? এই বন্দিশালায় বসে আপনার মাথায় ক্ষমতার রঙিন স্বপ্ন আসে কি করে?
মিঃ বন্ড, ক্ষমতার অর্থই হচ্ছে একাধিপত্য। ক্লাউসে উটটস-এর প্রথম নীতি ছিল, একটি সুরক্ষিত ঘাটি। তারপর আসে স্বাধীনতা। এই দুই মিলিয়ে করেছি আরো অনেক বেশি। পৃথিবীতে আর কারো একাধিপত্য এতদূর উঠতে পারে না। সাধারণ মানুষের জীবন বড় বেশি সামাজিক, অথচ গোপনে ছাড়া এ ক্ষমতা অর্জন করা যায় না। আপনি হয়ত রাজা এবং রাষ্ট্রপতিদের কথা বলবেন। কিন্তু তাদের ক্ষমতা কতটুকু? ঠিক যতটুকু প্রজারা তাদের হাতে দেবে। এই পৃথিবীতে আর কার হাতে আছে প্রজাদের জীবন মৃত্যু নির্ধারণের অধিকার? আমি ছাড়া অন্য কারো নাম করতে পারেন। আপনি স্ট্যালিনের সেই অধিকার ছিল। কিন্তু আজ তিনি নেই। কি করে আমি এই ক্ষমতা, এই একাধিপত্য অর্জন। করেছি জানেন? এই গোপনীয়তার জন্য। আমার সাফল্যের কারণ কেউ আমার কথা জানে না। কারো কাছে আমার। কৈফিয়ত দিতে হয় না।
বন্ড কাঁধ ঝাঁকাল, এ আপনার ক্ষমতার স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়, ডক্টর নো। একজনের হাতে গুলি ভর্তি রিভলবার থাকলে সে অনায়াসে প্রতিবেশীদের জীবন মৃত্যু নির্ধারণ করতে পারে। আপনার আগেও অনেকে গোপনে নরহত্যা করেছে অথচ ধরা পড়েনি। তবে তারা শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত শাস্তি পায়। কারণ তাদের চেয়ে অনেক বড় ক্ষমতা প্রয়োগ করে মানব সমাজ। আপনার ভাগ্যেও তাই আছে ডক্টর নো। বিশ্বাস করুন, আপনার ক্ষমতালিপ্স সম্পূর্ণ অলীক। কারণ ক্ষমতা জিনিসটা মায়া ছাড়া কিছু নয়।
