বন্ড বলল, আপনাকে অভিনন্দন জানাই। এই ঘরের কথা আমি জীবনে ভুলব না।
না, কিন্তু আমাদের অনেক কথা বলার আছে। সময়ও খুব কম। দয়া করে বসুন। কি পানীয় চাই বলুন? আপনাদের চেয়ারের পাশে সিগারেট আছে।
ডক্টর নো একটা উঁচু চামড়ায় মোড়া চেয়ারে বসল। মেয়েটা বসল তাদের মাঝখানে, একটু পিছিয়ে।
বন্ড তার পেছনদিকে চলাফেরার শব্দ পেল। বেঁটে, কুস্তিগীরের মত চেহারার এক চীনে নিগ্রো পানীয়ের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে। গোল মুখের কালো কুতকুতে চোখ দুটো একবার বন্ডের ওপর স্থির হয়ে সরে গেল।
ডক্টর নো বললেন, আমার দেহরক্ষী, অনেক কাজে ওস্তাদ এ লোকটি। এর হঠাৎ এসে পড়ার মধ্যে কোন রহস্য নেই। আমার সঙ্গে সর্বদাই একটা ওয়াকি-টকি-সেট থাকে। তার কিমানোর বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এর সাহায্যে আমি যখন ইচ্ছে একে ডেকে আনতে পারি। মেয়েটি কি পান করবে?
আপনার স্ত্রী বললেন না। বন্ড হানিচাইলের দিকে তাকাল। শান্তভাবে বলল, একটা কোকা-কোলা।
বন্ড একটু শান্তি অনুভব করল। এই বিচিত্র অভিনয়ে অন্তত মেয়েটার মাথা খারাপ হয়নি। বন্ড বলল, আর আমার জন্য একটা ভদ্কা ড্রাই মার্টিনি–সঙ্গে একটুকরো লেবু। বেশি নাড়া হয় না যেন। রাশিয়ান বা পোলিশ ভদ্কা হলেই ভাল।
ডক্টর নো-র মুখের হাসি একটু প্রসারিত হল। আপনিও মনে হচ্ছে এমন একজন মানুষ যার নিজস্ব চাহিদা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা আছে। এ ক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয় না যে সাধারণত এরকমটাই হয়? যদি কেউ সত্যি সত্যি কোন কিছু চায়, সে তা পেয়ে যায় আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে।
ছোটখাট জিনিসগুলো তাই পাওয়া যায়।
যদি বড়সড় ইচ্ছেগুলো পূর্ণ না হয়, তার অর্থ আপনার উচ্চাশা কম। একাগ্রতা চাই আর কিছু নয়। ক্ষমতা আপনা থেকেই এসে যায়। সুবিধেরা নিজেদের তৈরি করে নেয়। একজন মানুষ সমগ্র পৃথিবীকে স্থানচ্যুত করতে পারে, কেবল যদি সে ইচ্ছেটা তার থাকে। পাতলা ঠোঁটজোড়া বিরক্তির ভঙ্গিমায় কুঞ্চিত হল। কিন্তু এ সবই অনর্থক কথা। আমরা কথা বলছি, তার বদলে আসুন গল্প করা যাক। সেটা আশা করি আমাদের দুজনেরই পছন্দ হবে। মার্টিনি আপনার ভাল লাগছে? আপনার পাশে সিগারেট আছে আপনার বুকের ক্যান্সারকে পোষণ করবার পক্ষে যথেষ্ট। স্যাম, স্যাম, তুমি বোতলটা ভদ্রলোকের পাশে রাখ আর মেয়েটির পাশে আর এক বোতল কোকা-কোলা, এখন আটটা-দশ। ঠিক নটায় আমরা নৈশভোজে যাব।
ডক্টর নো চেয়ারে আর একটু সোজা হয়ে বসলেন। সামনের দিকে আরেকটু ঝুঁকে বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার, গুপ্তচর বিভাগের মিস্টার জেমস বন্ড। আসুন আমরা পরস্পরকে আমাদের সব গোপনীয় কথা বলি। আমি যে কিছুই লুকোচ্ছি না, তা প্রমাণ করবার জন্য আমার সব কথা আপনাকে জানাচ্ছি। তারপর আপনি আপনার কথা জানাবেন। ডক্টর নো-র কালো চোখ জ্বলে উঠল, কিন্তু আশা করি দু-পক্ষই সত্যি কথা বলবে। চওড়া হাতার ভেতর থেকে ইস্পাতের থাবা বেরিয়ে এল। একটু থামলেন, আমি সত্যি কথা বলব, কিন্তু আপনিও সে চেষ্টা করবেন। যদি মিথ্যে কথা বলেন, এ-দুটো, থাবাটা দিয়ে নিজের চোখের দিকে দেখালেন, তা ধরে ফেলবে।
ডক্টর নো ইস্পাতের থাবাটা শান্তভাবে চোখের সামনে এনে দুই চোখের মণির ওপর আঘাত করলেন।
দুটো মণি থেকে টুঃ করে শব্দ বের হল। এ দুটোকে, ডক্টর নো বললেন, কোন কিছুই এড়িয়ে যেতে পারবে না।
.
ভীমরুলের চাক
জেমস বন্ড চিন্তিতভাবে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিল। এখনও মিথ্যে কথা চালিয়ে যাওয়া অনর্থক। তার অভোবন সোসাইটির প্রতিনিধিত্বের গল্পটা নেহাৎ আষাঢ়ে। পাখি সম্বন্ধে যার জ্ঞান আছে, সে সহজেই মিথ্যেটা ধরে ফেলবে। তার গোপনীয়তার আবরণ শতছিন্ন হয়ে গেছে। এখন তার কাজ হল মেয়েটাকে বাঁচানো। প্রথমেই তাকে আশ্বস্ত করা দরকার।
বন্ড ডক্টর নো-র দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, কিংসটনের রাজ বাড়িতে আপনার নিযুক্ত চর, মিস্ তারো-র কথা আমার জানা আছে। এ তথ্যটা আমি যথাস্থানে রেকর্ড করে ফেলেছি। এ খবর আর গুপ্ত থাকবে না।
ডক্টর নো বিচলিত হলেন না। বন্ড আবার বলল, তবে কথাবার্তা যদি বলতেই হয়, তবে এসব নাটকীয়তা বাদ দেওয়াই ভাল। আপনি এক বিচিত্র মানুষ। কিন্তু নিজেকে বিচিত্রতর প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করবেন না। দুর্ভাগ্যবশত আপনি দুটো হাত হারিয়েছেন সে জায়গায় আপনার যান্ত্রিক হাত লাগানো, যা অনেক আহত সৈন্যকেই পরতে হয়। চশমা না পরে আপনি কনট্যাক্ট লেন্স পরেন। কলিংবেল না টিপে আপনি ওয়াকি-টকির সাহায্যে চাকরকে ডাকেন। এ ছাড়াও আপনার অনেক কায়দা জানা আছে।
কিন্তু ডক্টর নো, এসব সত্ত্বেও আপনি নেহাৎই একজন মানুষ। ঠিক আমাদেরই মতন আপনি খান, ঘুমোন এবং মলমূত্র ত্যাগ করেন। সুতরাং দয়া করে আপনার ঐ কায়দাগুলো আর দেখাবেন না। আমি আপনার গুয়ানো কারখানার শ্রমিক নই। আমি ওসব দেখে মুগ্ধ হব না।
ডক্টর নো মাথাটা একটু নামিয়ে বললেন, সাহসীর মতই কথা বলছেন আপনি, মিস্টার বন্ড। আপনার তিরস্কার আমি মেনে নিচ্ছি। এই বুদ্ধিহীনদের সঙ্গে থাকতে থাকতে কতকগুলো বিরক্তিকর চালচলন রপ্ত হয়ে গেছে। তবে, একে ভাঁওতা বলে ভুল করবেন না। কোন বস্তুকে কোন যন্ত্রের সাহায্যে বশে আনতে হয়, তা আমার জানা আছে। সবচেয়ে দুর্ভেদ্য বন্ডকে ঘায়েল করবার যন্ত্রও আমার আছে।
