হঠাৎ বন্ড দেখতে পেল কালো কাঁচের দেওয়ালের পেছনে কি যেন একটা নড়ছে। সে দেওয়ালটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নীল কালো অন্ধকার ভেদ করে এক ঝাক রূপালি ছোট মাছ ছুটে পালাল, তাদের পেছন পেছন তাড়া করছে। বড় একটা মাছ। দেয়ালটা পেরিয়ে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল। এ আবার কি? মাছ পোষবার চৌবাচ্চা? বন্ড আকাশের গায়ে কালপুরুষকে দেখতে পেল। এবার ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে। তাদের সামনে সমুদ্র, মাথার ওপর রাত্রির আকাশ। এই দিকের দেওয়ালের সবটা সুদৃঢ় অভঙ্গুর কাঁচে তৈরি। আপাতত তারা সমুদ্রের কুড়ি ফুট গভীরে, আরো গভীরে তাকিয়ে আছে।
বন্ড আর মেয়েটা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের চোখের সামনে দেখা দিল একজোড়া ভাটার মত চোখ। এক মুহূর্তের জন্য একটা বিরাট মাথা ও শরীরের দ্যুতি দেখা গেল। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। একটা বড় গ্রুপার মাছ? একঝাঁক রূপালি আনচোভি মাছ তাদের সামনে একটু থামল ঘোরাফেরা করল, তারপর একছুটে পালিয়ে গেল।
বন্ড দেওয়াল বেয়ে এগিয়ে গেল। এই অলস, চিরপবির্তনশীল চলমান ছবির জগতে বাস করার কল্পনা তাকে মুগ্ধ করেছে। অজস্র রকমের মাছ খেলা করে বেড়াচ্ছে কালো পানির বুকে। একটা লম্বা কালো ছায়া কাঁচের দেওয়ালের মাঝামাঝি এসে থামল। তারপর মন্থর গতিতে এগিয়ে চলল।
যেন তার মনের কথা বুঝতে পেরেই দেওয়ালে কোন জায়গা থেকে অত্যুজ্জ্বল দুটো চওড়া আলোর রেখা তীরের মত পানি ভেদ করে এগিয়ে গেল। খানিকক্ষণ তারা এদিক-ওদিক খুঁজল, তারপর একসঙ্গে গিয়ে পড়ল সেই অপসৃয়মান ছায়ার ওপর। দেখা দিল বারো ফুট লম্বা বিবর্ণ ধূসর রঙের টর্পেডোর মত একটা হাঙ্গর। পরিষ্কার দেখা। গেল মাছটাকে। বন্ড স্পষ্ট দেখল তার সোনালি পুঁতির মত চোখদুটো কৌতূহলের সঙ্গে আলোর উৎসের দিকে ঘুরে গেল। তার কানকো খুব আস্তে ধুকপুক করছে। স্থির হয়ে ভেসে রইল কিছুক্ষণ। শেষে চমৎকার একটা বাঁক নিল, ল্যাজটা সামনে চলে এল এবং সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে পলকের মধ্যে অদৃশ্য হল হাঙ্গরটা।
সার্চ লাইট দুটো নিভে গেল। বন্ড আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। ভেবেছিল ডক্টর নো-কে দেখবে। কিন্তু এখনো ঘরটা নির্জন। আবার পানির দিকে তাকাল বন্ড। দিনের আলোয় সমুদ্রটাকে কেমন দেখাবে? ঝড়ের সময় বোধহয় সমুদ্রের ঢেউ। নিঃশব্দে এই কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ে। সন্ধ্যেবেলা ও জায়গাটা কেমন দেখায়, যখন ঘরের ওপর দিকটা সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল আর তার নিচের পানি অন্ধকার? এই বিচিত্র পরিকল্পনা যার মাথায় এসেছে তিনি না জানি কত বিচিত্র মানুষ। কারিগরি বিদ্যার কি অসাধারণ প্রয়োগ এই ঘরটা। কি করে তৈরি করা হয়েছে এটা? প্রথমে নিশ্চয় পাহাড়ের তলায় অনেক ভেতরে এই ঘরটি তৈরি করা হয়েছে। তারপর স্তরে স্তরে পাথর সরিয়ে সমুদ্রের পানি এ পর্যন্ত নিয়ে। আসা হয়েছে। কিন্তু এ কাঁচটা কত মোটা? কারা তৈরি করেছে। এই দ্বীপে কি করে আনা হল? কতজন ডুবুরীকে এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল? আর, হে সৃষ্টিকর্তা, না জানি কত টাকা লেগেছে এটা শেষ করতে।
দশ লক্ষ ডলার।
গভীর গমগমে কণ্ঠস্বর, কথায় একটু আমেরিকান টান। বস্ত আস্তে, অনেকটা নিরুৎসুক ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল।
ডক্টর নো এসে দাঁড়িয়েছেন ডেস্কের পেছনে। প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে মৃদু হাসি।
আশা করি আপনারা ভাবছিলেন যে এ জায়গাটা তৈরি করতে কত খরচ পড়েছে। আমার অতিথিরা সাধারণত এ ঘরে ঢোকার পর সবাই পনেরো মিনিট এ কথাই ভাবেন।
আপনারাও বোধহয় সেই চিন্তাই করছিলেন?
হ্যাঁ।
ডক্টর নো হাসি মুখেই তাদের দিকে এগিয়ে এলেন। ভঙ্গিটা ঠিক হাঁটার মত নয়, ঠিক যেন ভেসে এলেন। তাঁর অতি মসৃণ কিমানোর ওপর হাঁটুর ছাপ দেখা গেল না, কিমানোর লুটিয়ে পড়া প্রান্ত থেকে দেখা গেল না কোন জুতার লক্ষণ।
বন্ড প্রথমেই লক্ষ্য করল ভদ্রলোকের কৃশতা, ঋজুতা ও দৈর্ঘ্য। ডক্টর নো বন্ডের চেয়ে ছ ইঞ্চি প্রায় লম্বা। কিন্তু তার অবিচলিত ঋজুতার জন্য আরও লম্বা দেখাচ্ছে। মুখটাও লম্বাটে, সম্পূর্ণ কেশহীন মাথা থেকে ঢালু হয়ে এসে সরু চিবুকে শেষ হয়েছে–যেন একটা উল্টানো বৃষ্টির ফোঁটা। গায়ের রংটা গাঢ় অস্বচ্ছ হলদে।
ডক্টর নো র বয়স আন্দাজ করা অসম্ভব। মুখে একটাও বলিরেখা নেই। কপালটা তার টাকের মতই চকচকে মসৃণ। চোখের পাতা নেই। পলকহীন চোখ দুটি সোজা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এক জোড়া রিভলবারের নল। চাপা অধরোষ্ঠে সবসময় খেলে বেড়াচ্ছে এক টুকরো হাসি, সেই হাসিতে আছে কেবল নিষ্ঠুরতা ও কর্তৃত্ব। সব মিলিয়ে এই বিচিত্র, উড়ন্ত মূর্তিকে দেখে মনে হয় যেন এক বিষাক্ত কীট, ধূসর টিনের পাতে মোড়া।
ডক্টর নো তাদের তিন পা সামনে এসে থামলেন। ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক হল, আপনাদের সঙ্গে করমর্দন করতে পারার জন্য ক্ষমা করবেন। আমার সে ক্ষমতা নেই। জামার হাত দুটো বিভক্ত হল, একটাও হাত নেই আমার।
একজোড়া ইস্পাতের সাঁড়াশী তাদের সামনে বেরিয়ে এল। শিকারী মাকড়সার পাড়ার মত। তারপর আবার ফিরে গেল জামার হাতার অন্তরালে।
বন্ড বুঝতে পেরে তার পাশের মেয়েটা চমকাল।
চোখের কালো মণি দুটো মেয়েটার দিকে ঘুরে গেল। বর্ণহীন স্বর শোনা গেল, আমার দুর্ভাগ্য। চোখজোড়া আবার বন্ডের দিকে ফিরে এল, আপনি আমার মাছের চৌবাচ্চা দেখে বিস্মিত হচ্ছিলেন। লোকে পশু-পাখি পুষতে পছন্দ করে। আমার কাছে মাছ পোষাটা বেশি পছন্দের। আমার মনে হয়, এরা অনেক বেশি বিচিত্র ও বিভিন্ন। আশা করি এ বিষয়ে আপনাদের কোন দ্বিমত নেই।
