হানি চমকে ঘুরে দাঁড়াল, ওঃ তুমি! ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় আর উঠবেই না। আমি বেশ কয়েকবার ঘুরে এসেছি। ভেবেছি পাঁচটা বাজলে তোমাকে ডাকব। কিছু খাবার জোগাড় করতে পার?
নিশ্চয়ই। বন্ড তার খাটের পাশে গেল।
হানির কাছাকাছি আসতেই বন্ড তার কোমর জড়িয়ে ধরে সঙ্গে টেনে নিয়ে বসল। কলিংবেলগুলো পরীক্ষা করে রুম সার্ভিস লেখা ঘন্টাটা বাজাল। বলল, অন্য ঘণ্টাগুলোর কি হবে? সবাইকে ডেকে আনা যাক।
মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল, কিন্তু ম্যানিকিউরিস্ট জিনিসটা কি?
ঐ যারা নখের পরিচর্যা করে। ডক্টর নো-র সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, ভালভাবে সেজে গুঁজে নিতে হবে। আসলে কিন্তু বন্ডের মাথায় ঘুরছিল একটা কোন হাতিয়ার বাগাবার মতলব। একটা কাচি অন্তত খালি হাতের চেয়ে ভাল হবে।
বন্ড দুটো ঘণ্টা বাজাল। তারপর মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে ঘরটা দেখল। তারা যখন ঘুমোচ্ছিল, তখন একজন এসে বাসনপত্র সব নিয়ে গেছে। দেওয়ালে লাগানো সাইডবোর্ডে রাখা আছে পানীয়ের ট্রে। বন্ড ট্রে-টাকে দেখল। কোন কিছুর অভাব নেই। বোতলগুলোর মধ্যে থেকে উঁচিয়ে রয়েছে একজোড়া খাদ্য তালিকা। দুটো বিরাট আকারের পাতা জুড়ে অজস্র খাদ্যের নাম ছাপার অক্ষরে সাজানো। নিউইয়র্কের শ্রেষ্ঠ দুটি রেস্তোরাঁর খাদ্য তালিকাও এর চেয়ে সদৃশ্য নয়। বন্ড একটার ওপর চোখ বোলালো। যে সব খাবার হিমঘরে থাকলে নষ্ট হবার নয়, তার প্রতিটি রয়েছে। আর আছে সবরকম পানীয়। তালিকাটা রেখে দিল বন্ড। এই অপরূপ ফাঁদে খাবারদাবার সম্বন্ধে অন্তত কেউ নাক কুঁচকোতে পারবে না।
দরজায় টোকা পড়ল। ভেতরে ঢুকল সুন্দরী মে। তার পেছন পেছন আরো দুজন চীনে মেয়ে। তাদের সৌজন্যগুলো এড়িয়ে বন্ড হানিফাইলের জন্য চা আর মাখন-মাখানো টোস্ট আনতে বলল, আর বলল তার চুল আর নখ ঠিক করে দিতে। তারপর সে বাথরুমে চলে গেল। গোটা দুয়েক অ্যাসপিরিন খেয়ে নিয়ে ঠাণ্ডা পানিতে গা ধুয়ে নিল। আবার গায়ে কিমোনো চাপাল। বোকার মত দেখাচ্ছে।
ঘরে ফিরে আসতেই মে আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইল যে সে দয়া করে তার নিজের এবং মিসেস ব্রাইসের নৈশভোজের খাবার বেছে দেবে কিনা। অনেকটা নিরুৎসুক ভঙ্গিতে বন্ড নিজের জন্য ক্যাভিয়ের, গ্রীল করা ভেড়ার মাংসের কাটলেট ও স্যালাড, এবং এঞ্জেলস্ অন হর্সব্যাক তৈরি করতে বলল। আর হানিচাইল যখন নিজের খাবার বাছতে চাইল না, তখন তার জন্য তরমুজ, মুগীর রোস্ট আর গরম চকোলেট সুদ্ধ ভ্যানিলা আইসক্রিমের অর্ডার দিল।
পুলকিত হাসি হেসে মে বলল, ডক্টর জানতে চেয়েছেন যে পৌনে-আটটা বা আটটা নাগাদ আপনারা তার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন কিনা!
বন্ড ভদ্রভাবে জানাল যে সে পারবে।
অশেষ ধন্যবাদ, মিঃ ব্রাইস, পৌনে আটটার সময় আপনাকে ডাকতে আসব।
বন্ড ড্রেসিং টেবিলের দিকে হেঁটে গেল। সেখানে হানিচাইলের প্রসাধন পর্ব চলছে। হানি আয়নার ভেতর দিয়ে বন্ডের দিকে উৎসাহিত হাসি হাসল। বন্ড কেবল কড়া গলায় বলল, দেখ, তোমাকে যেন বেশি সং না সাজায়।
পানীয় ট্রে-র কাছে গিয়ে বন্ড কড়া এক গ্লাস বুর্বো আর সোডা ঢালল। তারপর সেটা হাতে নিয়ে নিজের ঘরে এল। হাতিয়ার জোগাড় করার মতলব এখানেই ইতি। কারণ ম্যানিকিওরিস্টের কাঁচি ইত্যাদি সব সরঞ্জাম কব্জির সঙ্গে চেন দিয়ে বাঁধা আছে। বন্ড বিছানায় বসে গ্লাসের পানীয়ও বিষণ্ণ চিন্তায় ডুবল।
মেয়ে দু জন কাজ শেষ করে চলে গেল। হানি তার দিকে তাকাল। বন্ড মাথা তুলল না দেখে সে চলে গেল নিজের ঘরে। বন্ড কিছুক্ষণ পরে মেয়েটার ঘরে ঢুকল। আরেক গ্লাস পানীয়ের জন্য দায়সারা ভঙ্গিতে, হানি, তোমাকে চমৎকার দেখাচ্ছে। গ্লাসটা শেষ করে নিজের ঘরে এসে আরেকটা বিঘুঁটে কালো রঙের কিমানো পরল।
যথাসময়ে দরজায় টোকা পড়ল। তারা দুজনে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরোল। এগিয়ে চলল নির্জন সুদৃশ্য করিডোর বেয়ে। লিফটের সামনে এসে থামল সে। অন্য একটি চীনে মেয়ে সাগ্রহে দরজা খুলে দিল। তারা লিফটে উঠল এবং দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ড লক্ষ্য করল লিফটটা ওটিস কোম্পানির তৈরি। এই বন্দিশালায় সবই একেবারে সর্বশ্রেষ্ঠ মানের। বন্ড একটা অজানা ভয়ের শিহরণ অনুভব করল। সে মেয়েটাকে বলল, আমি দুঃখিত হানি। মাথাটা বড় ব্যথা করছে।
বন্ড মেয়েটাকে বুঝতে দিল না যে, এই জমকালো অভিনয় তাকে দমিয়ে দিচ্ছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না যে। আসল গণ্ডগোলটা কোথায়। এই বিচিত্র পরিস্থিতি থেকে পালাবার কোন পথই নেই। বন্ডকে সবচেয়ে দমিয়ে দেয় এইরকম একটা অবস্থা, যখন তার সামনে আক্রমণ কিংবা আত্মরক্ষার সুযোগ নেই।
মেয়েটা বলল, আমি দুঃখিত জেমস্, আশা করি এক্ষুনি সরে যাবে। তুমি আমার ওপর রাগ করোনি তো?
না ডার্লিং, আমার শুধু নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। শোন আজ রাতের কথা বলাটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। মাথা ঠাণ্ডা কর, আর ডক্টর নো সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা করো না। ভদ্রলোকের মাথায় ছিট থাকতে পারে।
সে বলল, আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
দীর্ঘশ্বাসের মত শব্দ করে লিফট থেমে গেল। বন্ড বুঝতেই পারল না তারা কতটা নিচে নেমেছে–একশো ফুট না দুশো? দরজা আপনা থেকেই খুলে গেল। বন্ড বেরিয়ে এল সঙ্গে হানিকে নিয়ে। একটা বিশাল ঘরে।
লোকজন কেউ নেই। প্রায় ষাট ফুট লম্বা উঁচু ছাদওয়ালা ঘরটি। তিনদিক ছাদ পর্যন্ত বইয়ে ভর্তি। চতুর্থ দেওয়ালটা দেখে মনে হল গাঢ় নীল রঙের কাঁচে তৈরি। এ ঘরটা বোধহয় একাধারে পড়ার ঘর ও লাইব্রেরী। এককোণে একটা ডেস্ক ও মাঝখানে একটা টেবিল। এদিক-ওদিক কয়েকটা লাল চামড়ার চেয়ার সাজানো। কার্পেটের রঙ ঘন সবুজ। সারা ঘরে বৈদ্যুতিক আলো। একমাত্র অদ্ভুত ব্যাপার যে পানীয়ের ট্রে এবং সাইড বোর্ড লম্বা কাঁচের দেওয়ালটার ঠিক মাঝামাঝি রাখা হয়েছে আর ঘরের সবকটি চেয়ার টেবিল অর্ধবৃত্তাকারে খালি দেওয়ালটা ঘিরে সাজানো।
