আগন্তুক কয়েক মিনিট ধরে মেয়েটির মুখ পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর একটা হাত নেমে এসে মেয়েটির থুতনির নিচ থেকে চাদরটাকে আস্তে করে পায়ের নিচে নামিয়ে দিল। সে হাত মানুষের হাত নয়–ধাতব বৃন্তের ওপর লাগানো একটা বিচিত্র ইস্পাতের সাঁড়াশি। বৃন্তের অপরদিকে কালো সিল্কের কিমানোর হাতার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। একটা কৃত্রিম হাত।
আগন্তুক অনেকক্ষণ নগ্ন দেহটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বুকের আলো এদিক-ওদিক সরিয়ে দেহের প্রতিটি অংশ পর্যবেক্ষণ করলেন। আবার বেরিয়ে এল ইস্পাতের থাবা। চাদর দিয়ে আবার ঢেকে দিল মেয়েটার শরীর। তারপর বুকের আলো নিভিয়ে শান্তভাবে সামনের দরজা দিয়ে পাশের ঘরে এলেন। সেখানে বন্ড ঘুমোচ্ছে।
আগন্তুক বন্ডের পাশে বেশি সময় নিলেন। বালিশের মধ্যে ডুবে যাওয়া গাঢ় রঙের কেমন যেন নিষ্ঠুর ধাচের মুখটার প্রতিটি খাঁজ পর্যবেক্ষণ করলেন। ঘাড়ের কাছের নাড়ির স্পন্দনের গতি মাপলেন। তারপর চাদর সরিয়ে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন গুনলেন। বন্ডের বাহু ও উরুর পেশীর স্ফীতি দেখলেন। তার সমতল পেটের দিকে তাকিয়ে তার পেশির গূঢ় ক্ষমতা আন্দাজ করলেন। এমন কি ডান হাতের খোলা তালুর আয়ু ও ভাগ্য রেখা পর্যন্ত পরীক্ষা করলেন।
সবশেষে, ইস্পাতের থাবাটা দেহের ওপর চাদর টেনে দিল। আর এক মিনিট সুদীর্ঘ মানুষটি ঘুমন্ত বন্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিঃশব্দে করিডোরে বেরিয়ে গেলেন। মৃদু শব্দ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
.
এসো, আমার ঘরে এসো
পাহাড়ের ভেতর ঠাণ্ডা অন্ধকার ঘরটা বৈদ্যুতিক ঘড়িতে তখন সাড়ে চারটে।
পাহাড়ের বাইরে ক্র্যাব-কীর ওপর দিয়ে অসহ্য গরম ও দুর্গন্ধে ভরা আর একটা দিন কেটে গেছে। দ্বীপের পূর্বদিকে নানারকম পাখির ঝাঁক বাসা তৈরি করে অথবা অগভীর পানিতে মাছ ধরে চলেছে। গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত এই ভয়াবহ ড্রাগনটা এসে তাদের ওপর চড়াও হয়েছে, তাদের ডিম পাড়বার জায়গা ও বাসা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। তাদের অনেকেই আর এ বছর ডিম পাড়বে না। অনেকে অন্য কোন জায়গায় উড়ে চলে যাবার চেষ্টা করবে, আর তার চেয়েও বেশি মারা যাবে সেই অদ্ভুত হিস্ট্রিরিয়া রোগে পাখিদের আড্ডায় শান্তি ও নির্জনতার অভাব হলে যে স্নায়ুবিক ব্যাধির উৎপত্তি হয়।
দ্বীপের অপরপ্রান্তে বিশাল গুয়ানেরা ও অসংখ্য গুয়ানে পাখি আরেকটি স্বাভাবিক দিন অতিবাহিত করেছে। এই পাখিরা সারাদিন ধরে গোগ্রাসে মাছ খেয়েছে। এবং প্রত্যেক গুয়ানে রাতে এক আউন্স করে মূল্যবান সার জমা করেছে। তাদেরও একটা বাসা বাঁধার সময় আছে। কিন্তু তাদের কেউ বিরক্ত করেনি। তারা এখন বাসা বাঁধতে ব্যস্ত। কিছুদিনের মধ্যে মেয়ে পাখিরা তিনটি করে ডিম পাড়বে, যার থেকে গড়ে দুটি করে নতুন পাখি জন্ম নিয়ে দ্বীপের মালিকের সম্পত্তি বৃদ্ধি করবে।
গুয়ানোর পাহাড়ের নিচে প্রায় একশ জন নিগ্রো স্ত্রী-পুরুষ শ্রমিক গুয়ানো খুঁড়ে চলেছে। আজকের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সকাল থেকে আরো পঞ্চাশ বর্গগজ গুয়ানো খুঁড়ে বের করা হয়েছে পাহাড় থেকে। ঐ জায়গাটাতে মার্শ গ্যাসের দুর্গন্ধ নেই, আছে কড়া অ্যামোনিয়ার গন্ধ। গরম হাওয়া সাদা-খয়েরী গুয়ানোর গুড়ো উড়িয়ে নিয়ে যায়। শ্রমিকদের চোখ, নাক ও কানের মধ্যে। কিন্তু শ্রমিকরা এই গন্ধ এবং ধুলোর অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে তাদের কোন অভিযোগ নেই।
দিনের শেষ ট্র্যাকটারটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে নেমে গেল কারখানার দিকে। বাঁশী বেজে উঠল। শ্রমিকরা কুড় ল কাঁধে ফেলে অলস গতিতে এগিয়ে চলল ঘরের দিকে। আগামীকাল পাহাড়ের অপরদিকে, মাসে একবার আসা। জাহাজটা এসে ভিড়বে সেই গভীর পানির জেটিতে। এই জেটি তারা দশ বছর আগে নিজের হাতে তৈরি করেছিল, কিন্তু তারপর আর তাকে চোখে দেখেনি।
কাল ছুটির দিন। ক্যান্টিনে টাটকা খাবারদাবার। নতুন জিনিসপত্র ও সস্তা গয়নাগাটি পাওয়া যাবে। প্রচুর মদ টানা চলবে, নাচ হবে, মারপিটও হবে। জীবনটা বড় সুখের।
যে চীনে নিগ্রোরা বন্ড, কোয়ারেল ও মেয়েটাকে ধাওয়া করেছিল, তাদের মত উচ্চপদস্থ কর্মচারিদের পক্ষে কালকের দিনটা সত্যিই আনন্দের। পাহারা ও মাল নামানোর কাজ ছাড়া তাদের অনেকেরই কালকে ছুটি। তারাও মদ খাবে, নাচবে। দীর্ঘ একমাস পরে কালকে পাহাড়ের ভেতর থেকে একদল মেয়ে আসবে। গতমাসের কয়েকটা বিয়ে আরও কয়েক মাস বা কয়েক সপ্তাহ চলবে, স্বামীদের মেজাজ অনুযায়ী। নতুন মেয়েদের মধ্যে থাকবে বয়স্কা মেয়েরা, যারা বাচ্চাদের শিশুকেন্দ্রে রেখে বাইরে আসছে, আর থাকবে একদল নতুন মেয়ে যারা এই প্রথম বাইরে আসছে। তাদের নিয়ে মারপিট হবেই সন্দেহ নেই। অনেক রক্ত ঝরবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবার একমাসের জন্য উপনিবেশ শান্ত হয়ে যাবে।
পাহাড়ের অনেক ভেতরে, ছকবাঁধা বাইরের জীবনের অনেক নিচে, নরম বিছানায় বন্ডের ঘুম ভাঙল। একটু টিপটিপে মাথাব্যথা ছাড়া শরীর সুস্থই লাগছে। মেয়েটার ঘরে চলাফেরার শব্দ হচ্ছে এবং আলো জ্বলছে। বন্ড খাট থেকে নেমে আলমারির দিকে গেল। হাতের কাছে যে কিমানোটা পেল টেনে বার করে পরে ফেলল। দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা খাটের ওপর এক বোঝা কিমানো রেখে দেওয়াল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা পরে দেখছিল। আপাতত তার গায়ে আকাশী রঙের কিমানোটা তার সোনালি গায়ের ওপর ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। বন্ড বলল, এইটাই ঠিক আছে।
