ক্যাসিনো রয়েল গ্রন্থে বর্ণনা অনুযায়ী।
১ নতুন =১০০ পুরানো ঐ।
.
অপমানে
ক্যাসিনোর-প্রবেশ মুখে এসে বন্ড দাঁড়াল। যেন সে বিশেষ অনুভূতি দিয়ে লোকজন, উত্তেজনায় ঠাসা বিচিত্র দৃশ্যটি মনে মনে ছকে নিল, তারপরই ধীর পদক্ষেপে হেঁটে চলল–বারের প্রবেশ পথের ঠিক পাশে আছে বড় শমা দ্য ফেয়ার (ভর সুপন্ম সি তসল) খেলার টেবিলটির দিকে। Cherium defer (ফরাসীতে যার অর্থ রেলগাড়ি) এক ধরনের উচ্চদরের তাসের জুয়া। এ-খেলায় দুই পক্ষ–একজন ব্যাংকার ও অন্যজন যিনি ব্যাংকারের সঙ্গে খেলতে চায় (Banco বলে)। দুইজন খেলোয়াড় দুটি করে তাস নেয় (টেক্কা থেকে নয় অবধি প্রতিটি তাসের যত ফোঁটা, তত পয়েন্ট)। টেক্কার এক, সাতের সাত ইত্যাদি আর কি। দশ, গোলাম, বিবি, সাহেবের শূন্য পয়েন্ট। ঐ দুটি তাসের পয়েন্টের যোগফল হবে যার বেশি তারই জিত হবে। যোগফল যদি দশ বা তার অধিক হয় তবে পয়েন্ট হবে যোগফলের ডানদিকে অঙ্কটা অর্থাৎ দশে শূন্য, চৌদ্দর চার ইত্যাদি। দুইজন খেলোয়াড়ই আবার তাস টানতে পারে। তাস থাকে এক জুতার আকারের বাক্সে। সুবিধের জন্য বিভিন্ন মূল্যের প্লাস্টিকের চাকতি নিয়ে খেলা হয়। (অনুবাদক) একটি উঁচুদরের জুয়াখেলার প্রধান পরিচালক মশিয়ে পোল কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি বন্ডকে দেখতে পান এবং সাথে সাথে তাঁর কথামত একজন কর্মচারি বন্ডকে সাতনম্বর চেয়ারটির কাছে নিয়ে যায়। আসনটি বন্ডের জন্যই নির্দিষ্ট করা হয়েছিল এবং বন্ড তাতে গিয়ে বসে পড়ল।
তার জুতাটা টেবিলের অন্য প্রান্তে। ঠিক তিন নম্বর চেয়ারের দিকে। বেশ খোসমেজাজের সাথে বন্ড কতবার অন্যান্য খেলোয়াড়দের উপর চোখ রাখল। ক্যাসিনোর একজন কর্মচারি বন্ডের এক লক্ষ ট্র্যাকে খুচরা করে দশ হাজারের লাল রঙের চাকতির মত করে সাজিয়ে দিল। বন্ড সেগুলিকে চূড়োর মত করে সামনে রেখে দিল ও খেলা দেখতে শুরু করল। দেখতে পেল খেলার টেবিলের উপর ঝুলানো আছে সবুজ একটা আলো ও তার মাঝখানে একটা নোটিশ বোর্ড দেখা গেল। তাতে লেখা আছে যে, বাজির সর্বনিম্ন পরিমাণ হল দশ হাজার পুরানো ফ্রা, মানে প্রায়। চল্লিশ পাউন্ড বাজি রীতিমত উঁচু স্তরের বাজি।
টেবিলের পাশে দেখা গেল বিভিন্ন মানুষের এক বিচিত্র মিশ্রণ, যা এখানে প্রায়ই দেখা যায়। প্যাডওয়ালা ডিনার জ্যাকেট পরা লিল-এর তিনজন বস্ত্র ব্যবসায়ী। এক মহিলাকে দেখা গেল যে এক জোড়া হিরের গয়না পরে আছে, মনে হয় বেলজিয়াম। একজন ইংরেজ মহিলা যাকে দেখলে মনে হয় ক্রিসির মতন, একজন ভিলার মালিক–যিনি শান্ত ও সাফল্যের সাথে খেলে চলেছেন। আর দেখা গেল দু-জন কালো স্যুট পরা মধ্য বয়স্ক আমেরিকান। যাদের দেখলে খুব ফুর্তিবাজ ও রসবোধ আছে বলে মনে হবে। সেই সাথে বন্ড নিজেও। টেবিল ঘিরে রয়েছে দু-সারি দর্শক। ও নিরপেক্ষভাবে বসে আছে সব চৌখস জুয়াড়ী। তবে মেয়ে একটাও নেই।
বেশ ধীর অথচ শান্ত ভাবে খেলা চলেছে। জুতাটা অতি মৃদুভাবে ঘুরে যাচ্ছে টেবিলটাকে। কোন ব্যাংকারই দু বারের বেশি কেউই নিজের কাছে ব্যাংক রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না। শ্যামা দ্য ফেয়ার খেলার এই এক মজার। পরপর। তিন বার হার হবে এটার কারো পক্ষেই ঠিক হবে না। অথচ না নিলে আবার জেতাও যাবে না, আর যতবার ব্যাংক বন্ডের কাছে আসে সে খুব বিবেচনা করে যে সেও খুব ভাল ছেলের মত দ্বিতীয় বার ও দ্বিতীয় জনকে ব্যাংক দেবে কিনা। প্রায় ঘন্টা খানেক খেলার পর সে নিজেকে বোঝাতে চাইল যে, এই একঘেয়েমিটা ভাঙ্গানো দরকার আর তখনই। তার হার হলে ক্ষতি নেই। আমরা তো কোন খেলার হার জিতের ধার ধারিনা, এবং প্রত্যেকবার, অন্যান্য খেলোয়াড়দের মতন তৃতীয় বাজিতেও সে হেরে যেতে লাগল।
জুতাটা টেবিলের অন্য স্থানে পৌঁছাল। বন্ড টেবিলে টাকাগুলি রেখে দিয়ে অন্য সব টেবিলের কাছ থেকে ঘুরে। এল–এই আশায় যাতে মেয়েটিকে সে দেখতে পায়। সেদিন বিকেল বেলায় যখন ল্যানসিয়া চড়ে বন্ডের পাশ কাটিয়ে সে চলে গিয়েছিল তখন বন্ড শুধু দেখতে পেয়েছিল মেয়েটার চুলগুলি খুব সুন্দর আর মুখটা পাশ থেকে খুব সরল ও ব্যক্তিত্বময় দেখাল। তবে এটা বন্ডের বিশ্বাস ছিল মেয়েটাকে একবার দেখলেই চিনে ফেলবে। যে জৈব আকর্ষণ মোটর রেস-এর সময় একসাথে বেঁধে ফেলেছিল দু জনকে ও তারই সাহায্যে, কিন্তু মেয়েটার চিহ্ন পর্যন্ত দেখা গেল না। টেবিলে আবার বন্ড ফিলে এল। খেলা পুনরায় শুরু হয়ে গেল। শুরুতেই বন্ড দৃঢ় ভাবে লি-এর ব্যবসায়ীদের একজনের ওপর বংকো বলল এবং সে জিতেও গেল। পরের বার বাজীর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে গেল। দু-হাজার নতুন ফ্রা মানে পুরানো ফ্রা-এর দুই লক্ষ। ব্যাংক আবার বন্ডের হাতে ফিরে এল।
বন্ড সেবারও জিতল এবং তার পরের বারও। আর এই হচ্ছে তৃতীয় বাজির বাধা। এটা যদি জিতে যায় তবে পরপর অনেক দান জেতার কথা। সর্বোচ্চ নয় পয়েন্ট পেয়ে আবার সে জিতে গেল। এবার ব্যাংকে আট লক্ষ ফ্ৰা (মানে বন্ডের হিসেব মত) আবার জিতে গেল বন্ড। অবশ্য বেশ কষ্ট করে। তার হাতে আছে ছয় পয়েন্ট অন্য পক্ষের পাঁচ।
এখন বন্ড অনেক সাবধানে খেলল যাতে হাতে কিছু টাকা থাকে। আর মোল লক্ষ ফ্রর ছয় লক্ষ সে সরিয়ে দিয়ে জমা করে রেখে বলল। বন্ড তার পরের বারেও জিতে গেল। এবার সে জমা দিল দশ লক্ষ ফ্রা, ব্যাংক আবার দশ লক্ষে গিয়ে ঠেকল আর তার হাতে রইল পুরো বোল লক্ষ ফ্রা। কিন্তু মুশকিল হল এত উঁচুতে নিয়ে খেলা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। টেবিলে সবাই শান্ত আছে ও এই ইংরেজ খেলোয়াড়টির সম্বন্ধে সবাই একটু সাবধান হলেন। সতর্ক হতে হল কারণ তার ঠোঁট জোড়ার কোণে এক অর্ধস্কুট হাসির ব্যাপারে। লোকটি তবে কে? ও কোথা থেকে এসেছে। কি করে সে? টেবিলের চারপাশে একটা মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। লোকটা এখনো অবধি ছয় বার জিতে গেছে। এবার মনে হচ্ছে এতগুলো টাকা জেতার পর অন্য কারো হাতে ব্যাংকটাকে চালান করে দিবে কি? নাকি আরো খেলবে? এবার নিশ্চয় তাসের ভাগ্য বদল হবে।
