হানি কাঁপা হাসি হেসে, পায়ের তলায় কার্পেট থাকলে তো ভারি আরাম লাগে।
বন্ড তার হাতে চাপ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ক্রীম রঙের দরজায় টোকা মারল।
দরজা খুলে গেল। বন্ড ভেতরে ঢুকল। পরক্ষণেই একেবারে থেমে গেল। মেয়েটা বন্ডের পেছনে আসছিল। সে ধাক্কা খেল বন্ডের সঙ্গে। বস্ত বুঝতে পারল না। শুধু দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।
ডক্টর নো (পার্ট ২)
বিলাসবহুল কারাগার
সামনের আশ্চর্য রিসেপশন রুমটার সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র নিউইয়র্কের গগনচুম্বি অট্টালিকার ওপর অবস্থিত কোন বৃহত্তম শিল্প সংস্থার সভাপতির অভ্যর্থনা কক্ষের। দৈর্ঘে প্রস্থে চমৎকার, প্রায় চারশ বর্গফুট। গাঢ় লালরঙের দামী কার্পেটে সমস্ত মেঝে ঢাকা। আর দেওয়ালে ও ছাদে হালকা ছাইরঙ। দেগা-র আঁকা ব্যালে নাচিয়েদের ছবির রঙিন লিথোগ্রাফিক প্রতিলিপি দেওয়ালে সারি সারি সাজানো। সুন্দর কারুকার্য করা সবুজ সিল্কের আবরণে ঢাকা আধুনিক ধাঁচের বৈদ্যুতিক বাতি ঘরটার আলো জোগাচ্ছে।
বন্ডের ডানদিকে একটা চওড়া মেহগনি কাঠের ডেস্ক। তার ওপর সবুজ চামড়ার আবরণ। মানানসই জিনিসপত্র ও অত্যন্ত দামী মডেলের ইন্টারকম সাজানো আছে ডেস্কের ওপর। ঘরের হাওয়াটা পরিষ্কার, ঠাণ্ডা আর একটা মৃদু দামী সুগন্ধে ভরপুর।
ঘরে দু জন মহিলা। ডেস্কের পেছনে একটা ছাপানো ফর্ম-এর ওপর কলম উঁচিয়ে বসে আছে একটি দক্ষ চেহারার চীনে মেয়ে। তার চোখে কানা-উঁচু চশমা ও মাথায় ছোট করে ছাঁটা কালো চুল। চোখে মুখে ফুটে বেরোচ্ছে। রিসেপশনিস্টদের চির অভ্যস্ত অভ্যর্থনার হাসি-উজ্জ্বল, সহৃদয়, কৌতূহল।
দরজা খুলে আছেন অন্য একজন গিন্নীবান্নি চেহারার মহিলা। বয়েস প্রায় পঁয়তাল্লিশ। দেখে মনে হয় তার গায়েও চীনা রক্ত আছে। তার গোলগাল চেহারার দেখে একটু করুণাময়ী বলে মনে হল। চৌকো পাশনের পেছনে চোখ দুটো উজ্জ্বল-যেন এক গৃহকত্রী অতিথি আপ্যায়নের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। দু জনের পরনেই ধবদবে সাদা পোশাক, সাদা মোজা ও সাদা সোয়েডের জুতো।
বন্ড যতক্ষণ এই দৃশ্য হাঁ করে হজম করছে, দরজার কাছের মহিলাটি ততক্ষণে মৃদুকণ্ঠে চিরাচরিত অভ্যর্থনা বাক্য উচ্চারণ করে গেলেন–যেন তারা ঝড়-বাদলার দাপটে কোন-এক ভোজসভায় এসে পৌঁছতে দেরি করে ফেলেছে।
আহা, বেচারা। আমরা কিন্তু একদম জানতাম না তোমরা কখন পৌঁছবে। বারবার বলা হচ্ছিল যে তোমরা আসছ। প্রথমবার কথাটা শুনলাম গতকাল বিকেলে, তারপর শুনলাম নৈশভোজের আগে, আর সবশেষে মাত্র আধঘন্টা আগে জানলাম যে প্রাতঃরাশের সময় এসে পড়বে তোমরা। খুব খিদে পেয়েছে বোধহয়। যাক এদিকে এসে সিস্টার রোজ কে ফর্মটা ভর্তি করতে একটু সাহায্য কর আর তারপর তোমাদের সোজা ঘুমোতে পাঠিয়ে দেব। তোমরা খুবই ক্লান্ত।
মৃদু আফসোসের আওয়াজ করতে করতে তিনি দরজাটা বন্ধ করে তাদের ডেস্কের দিকে নিয়ে গেলেন। দুটো চেয়ারে তাদের বসিয়ে বকবক করে চললেন, শোন, আমি হলাম সিস্টার লিলি, আর ইনি সিস্টার রোজ। ইনি তোমাদের অল্প কয়েকটা প্রশ্ন করবেন। আচ্ছা, এবার একটা সিগারেট? বিচিত্রিত একটা চামড়ার কৌটো নিলেন। সেটাকে খুলে তাদের সামনের ডেস্কে রাখলেন। কড়ে আঙ্গুলটি দিয়ে দেখালেন, এগুলো আমেরিকান, এগুলো প্লেয়ার্স, আর এগুলো টার্কিশ। একটা দামী ডেস্ক লাইটার হাতে নিয়ে তিনি পাশে দাঁড়ালেন।
বন্ড একটা টার্কিশ সিগারেট নেবার জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ হাত দুটো প্রসারিত করল।
সিস্টার লিলি অস্ফুট আর্তনাদ করল, আরে তাই তো। ভদ্রমহিলাকে সত্যি বিব্রত দেখাল। সিস্টার রোজ, শিগগীর চাবি দিন। আমি বার বারবার বলেছি যে রোগীদের এরকম হাত বাঁধা অবস্থা যেন কখনো আনা না হয়। উঃ, ঐ বাইরের লোকগুলো এত বিশ্রী। ওদের একবার ভালোরকম ধমকানি দেবার সময় হয়েছে।
সিস্টার রোজ-ও মনে হল একই পরিমাণ দুঃখিত হয়েছে। হুড়মুড় করে ড্রয়ার হাতড়িয়ে একটা চাবি এগিয়ে দিল সিস্টার লিলির দিকে। অনেক বকবক আর অজস্র আপসোসের আওয়াজের সঙ্গে তিনি দুজোড়া হাতকড়া খুলে দিলেন। তারপর ডেস্কের পেছনে সে দুটোকে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেললেন-যেন খানিকটা নোংরা ব্যান্ডেজ।
ধন্যবাদ। বন্ড ভেবে পেল না এই পরিস্থিতিতে কি করবে। একটা সিগারেট নিয়ে ধরাল। একঝলক দেখে নিল হানিচাইল রাইডারের দিকে। সে বসে আছে, নার্ভাস ভঙ্গিতে চেয়ারের হাতল দুটো আঁকড়ে ধরে।
আচ্ছা, এবার সিস্টার রোজ দামী চেহারার লম্বা একটা ছাপানো কাগজের ওপর ঝুঁকে, আপনি একটু সাহায্য করলে আমি তাড়াতাড়ি এ-ব্যাপারটা শেষ করতে পারি। আপনার নামটা…
ব্রাইস, জন ব্রাইস।
মেয়েটি দ্রুত লিখে, স্থায়ী ঠিকানা?
অবধায়ক ও রয়্যাল জুলজিক্যাল সোসাইটি, রিজেন্টস পার্ক, লন্ডন, ইংল্যান্ড।
পেশা?
অনিথলজিস্ট (পক্ষীবিশেষজ্ঞ)।
ওরে বাবা, মেয়েটা হেসে তার দিকে তাকাল।
বানানটা বলবেন?
বন্ড বানান বলল।
অনেক ধন্যবাদ। এবার, আগমনের উদ্দেশ্য?
পাখি, আমি নিউইয়র্কের অভোবন সোসাইটির আরেকজন প্রতিনিধি। এই দ্বীপের কিছু অংশ তাদের ভাড়া নেওয়া আছে।
আচ্ছা, তাই বুঝি? বন্ড দেখল সে যা বলল ঠিক সেইগুলি লিখে নিল। শেষ অক্ষরটির পাশে জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিল।
আর, ইনি বোধহয় আপনার স্ত্রী? এঁরও কি পাখি সম্পর্কে কৌতূহল আছে?
