মেয়েটা আরও ঘেঁষে এসে বলল, চেষ্টা করব।
রাস্তা ক্রমশ খাড়া হচ্ছে। লোহার পাতের ফাঁক দিয়ে ধূসর এসে পড়ছে। ভোর হচ্ছে। বাইরে ঝলসানো গরম, বিশ্রী হাওয়া, আর মার্শ গ্যাসের দুর্গন্ধে ভরা একটি দিন জন্ম নিচ্ছে। বন্ড কোয়ারেলের কথা ভাবছিল। সেই নির্ভীক দৈত্যটি, যে আজকের সূর্য ওঠা আর দেখতে পেল না। যার সঙ্গে তাদের এখন জলাভূমির ভেতর দিয়ে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার কথা ছিল। জীবন বীমাটার কথা মনে পড়ল। কোয়ারেল বুঝেছিল মৃত্যু আসছে। তবু বিনা দ্বিধায় সে বন্ডকে অনুসরণ করেছিল। তার ভীতির চেয়েও প্রবল ছিল বন্ডের ওপর আস্থা। বন্ড সে বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেনি। বন্ড কি মেয়েটিরও মৃত্যুর কারণ হবে।
গাড়ি থামল। ড্রাইভার একটা সুইচ টিপে পাশে রাখা মাইক্রোফোনটা তুলল। গাড়ির বাইরে লাউডস্পীকারের গর্জন শোনা গেল, সব ঠিক আছে। ইংরেজটাকে আর মেয়েটাকে ধরে এনেছি। অন্য লোকটা মারা গেছে। ঐ ক জনই ছিল। দরজা খোেল।
বন্ড দরজা খোলার আওয়াজ পেল। ড্রাইভার ক্লাচ দাবালো এবং তারা কয়েক গজ গড়িয়ে গিয়ে আবার থেকে গেল। লোকটা ইঞ্জিন বন্ধ করল। লোহার দরজাটা সশব্দে বাইরে থেকে খুলে গেল। এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঢুকল কেবিনে। কয়েক জোড়া হাত বন্ডকে চেপে ধরে রুক্ষভাবে টেনে নামাল সিমেন্টের মেঝের ওপর।
বন্ড উঠে দাঁড়াল। তার একপাশে পিস্তলের খেচা এসে লাগল। একটা গলা শোনা গেল। ঐখানে দাঁড়িয়ে থাক। কোন চালাকি নয়। লোকটা আরেকটা চীনে নিগ্রো, বন্ড দেখল। হলদে চোখ দুটো কৌতূহলের সঙ্গে তাকে পরীক্ষা করছে। বন্ড নিস্পৃহভাবে ঘুরে দাঁড়াল। অন্য একটা লোক মেয়েটাকে পিস্তলের খোঁচা মারছিল। বন্ড তীব্রকণ্ঠে বলল, মেয়েটার গায়ে হাত দিও না। হেঁটে এসে মেয়েটার পাশে দাঁড়াল। লোক দুটো চমকে গেছে বলে মনে হল।
একজন প্রহরী বলল, খবরটা পাঠিয়ে দিয়েছি। এদেরকে ভেতরে পাঠাবার আদেশ এসেছে। সব ঠিক ছিল তো?
ড্রাইভারের সঙ্গীটি এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল বলে মনে হল। সে বললে, নিশ্চয়ই। তবে একটু গুলি চলেছিল। আললাগুলো ভেঙ্গে গেছে। চাকাতে কয়েকটা ফুটো হতে পারে। ছেলেগুলোকে এক্ষুনি কাজে লাগিয়ে দাও–সব মেরামত করতে হবে। এই দুজনকে ভেতর দিয়ে এসে ঘুম লাগাব। বন্ডের দিকে ঘুরে, ঠিক আছে, এবার চল। লম্বা বাড়িটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল সে।
বন্ড বলল, তুমি চল দেখি। ভদ্র ব্যবহার করতে শেখ। আর ঐ বাঁদরগুলোকে পিস্তল নামাতে বল, গুলি ছুটে যেতে পারে। চেহারা দেখে তো নেহাৎ বুদ্ধ বলে মনে হয়।
লোকটা কাছে সরে এল। অন্য তিনজনও এগিয়ে এল তার পেছন পেছন। তাদের লাল চোখে বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে। সামনের লোকটা একটা বিরাট ঘুসি পাকিয়ে বন্ডের নাকের নিচে ধরল। চাপা উত্তেজিত গলায় বলল, শুনুন সাহেব। আপনাদের মত লোককে কোন কোন সময় শেষের দিকে আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সৃষ্টিকর্তা করুন, এবার যেন তাই হয়। এবার পুরো একটা সপ্তাহ ধরে আমরা মজা মেরেছিলাম। আর মাইরী তোদেরকে যদি হাতে পাই…। লোকটার দুচোখে হিংসার আগুন। এবার ওর দৃষ্টি বন্ডকে পেরিয়ে মেয়েটার ওপর গিয়ে পড়ল। চোখ দুটো থেকে যেন লালা ঝরতে লাগল, বেগুনে ঠোঁট দুটোর ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এল গোলাপী জিভের আগাটুকু। প্যান্টের দু পাশের হাত দুটো ঘষে নিয়ে সঙ্গী তিনজনের দিকে তাকাল, কি বল দোস্ত? অন্য তিনজনও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মেয়েটার দিকে।
বন্ডের প্রবল ইচ্ছে হল পাগলের মত ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ দুহাতের আঘাতে মুখগুলো ভেঙে দিতে। তাতে যদি নিজেকে রক্তাক্ত হতে হয় সে-ও সহ্য হবে। সে বলল, ঠিক আছে। তোমরা হলে চারজন আর আমরা দুজন, তার ওপর দুহাত আমাদের বাধা। চল। তোমাদের কোন ক্ষতি করব না আমরা। আর বেশি বাড়াবাড়ি কোর না। ডক্টর নো সেটা নাও পছন্দ করতে পারেন।
নামটা শোনামাত্র লোকগুলোর মুখের চেহারা পাল্টে গেল। তিন জোড়া চোখ বন্ডের ওপর থেকে সরে তাদের নেতার দিকে চেয়ে বিস্ফারিত হল। সামনের লোকটি এক মিনিট ধরে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে আন্দাজ করতে চেষ্টা করল যে তাদের মালিকের ওপর বন্ডের কোন দখল থাকা সম্ভব কিনা। কি যেন বলবার জন্য মুখ খুলল। তারপর চেপে গেল। দুর্বল গলায় বলল, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, আমরা একটু ঠাট্টা করছিলাম। অন্যদের দিকে তাকিয়ে তাই না?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, একশ বার। বিড়বিড় করে বলল তারা।
সামনের লোকটি রুক্ষভাবে বলল, এদিকে এস্, মিস্টার। লম্বা ঘরটা দিয়ে এগিয়ে চলল সে।
মেয়েটার হাত ধরে বন্ড তাকে অনুসরণ করল। ডক্টর নো-র নামের গুরুত্ব বুঝতে পেরে সে খুশি হয়েছিল।
লোকটা ঘরের শেষে এক অমসৃণ কাঠের দরজার সামনে পৌঁছল। পাশের কলিং বেলটা দু বার টিপে দাঁড়িয়ে রইল। ক্লিক করে আওয়াজ হল, দরজাটা খুলল। দেখা গেল দশ গজ লম্বা কার্পেট বিছানো একটা পাথরের গলি। গলির অপর প্রান্তে সুন্দর ক্রীমরঙের দরজা।
লোকটা সরে দাঁড়াল। সোজা চলে যাও, মিস্টার। ঐ দরজায় টোকা দিয়ে। রিসেপশনিস্ট তোমাদের ব্যবস্থা করবেন।
বন্ড গলিতে ঢুকল, পেছনে মেয়েটা। তাদের পেছনের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বন্ড থেমে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, এবার কি
