যন্ত্রের ইনস্ট্রমেন্ট প্যানেলে সারি-সারি ডায়াল ও সুইচ বসানো। ড্রাইভার হাত বাড়িয়ে গোটা দুয়েক সুইচ টেনে। দিল। গিয়ার বদলে দিয়ে তার সামনের একটা সরু ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাল। বন্ড অনুভব করল যন্ত্রটা ঘুরছে। ইঞ্জিনের স্পন্দন দ্রুততর হল, তারপর চলতে শুরু করল।
মেয়েটা কাঁপা গলায় বলল, ওরা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে
বন্ড ঘুরে তার দিকে তাকাল। ঘুমের জন্য মেয়েটার শুকনো চুলগুলো বিশৃঙ্খল, সোজা কাঁধ পর্যন্ত নেমে কুকড়ে গেছে ভেতরদিকে। হালকা ধূসর স্বর্ণাভ চুল বৈদ্যুতিক আলোয় রূপালি দেখাচ্ছে। ঠোঁটের দু পাশ এবং চোখের চারদিক ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
বন্ড চাপা গলায় বলল, মনে হয় ডক্টর নো-র সঙ্গে দেখা করতে চলেছি। অত ভয় পেয়ো না, হানি। এ লোকগুলো ক্ষুদে গুণ্ডা ছাড়া আর কিছু নয়। তার সঙ্গে দেখা হলে তুমি কিন্তু কিছু বোলো না। আমি আমাদের দুজনের হয়ে বলব। তুমি তো ভারি সুন্দর করে চুল আঁচড়াও। চুল ছোট করে না ছেটে ভাল করেছ। এ রকমটা আমার খুব ভাল লাগে।
মেয়েটার মুখে হাসি দেখা গেল, এরকম সময়ে কি করে ওসব কথা তোমার মাথায় আসে? তবে আমার চুল তোমার ভাল লেগেছে শুনে খুশি হলাম। সপ্তাহে একবার আমি নারকেল তেলে চুল ধুই। নিজের অন্য জীবনটার কথা মনে পড়তে তার চোখে অশ্রু চকচক করে উঠল। চাপা গলায় বলল, আমি ঠিক থাকতে চেষ্টা করব। তুমি অন্তত যতক্ষণ পাশে থাকবে–ভয় পাব না।
বন্ড সরে মেয়েটার কাছ ঘেঁষে বসল। শৃঙ্খলাবদ্ধ হাত দুটো চোখের সামনে এনে পরীক্ষা করল আমেরিকার হাতকড়া। সে তার বাঁ হাতটাকে কুঁচকে হাতকড়ার গোল বন্ধনী থেকে বের করবার চেষ্টা করল। কিন্তু অসম্ভব, কোন সুবিধে হল না।
লোক দু জন তাদের দিকে পেছন করে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বসে আছে। তারা জানে বন্দী দুজন সম্পূর্ণ বশে এসে গেছে। বন্ডের পক্ষে কোন বিপদের সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। জায়গাটা এত ছোট যে বন্ড দাঁড়াতে পর্যন্ত পারবে না। যদি বন্ড দরজাটা খুলে পানিতে ঝাঁপ দেয় তাহলে? তাহলে দরজা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢোকার স্পর্শ পেয়ে গাড়ি থামিয়ে দেবে। তারপর হয় তাকে পানির মধ্যেই সিদ্ধ করে দেবে কিংবা তুলে নেবে। এদের বুদ্ধি যদি একটু কম হত তাহলে বন্ডের পক্ষে তাদের মাথায় আঘাত করে অজ্ঞান করে দেওয়া অসম্ভব ছিল না। কিন্তু লোক দুটো কাজ জানে। এরা পেশাদার গুণ্ডা, অথবা এদের শিখিয়ে পড়িয়ে এতটা দক্ষ করা হয়েছে।
লোক দুজন কোন কথা বলছিল না। তারা কি রকম চালাকি করেছে, কোথায় যাচ্ছে, কিংবা তারা যে এত ক্লান্ত এসব নিয়ে কোন বকবক করল না। পাকা হাতে তাদের কাজ সেরে গাড়ি চালাল দক্ষ ও শান্তভাবে।
বন্ড এখন বুঝতে পারছিল না যে এ যন্ত্রটা কি হতে পারে। কালো আর সোনালি রং এবং অন্য সব বিচিত্র সাজগোছের তলায় একটা ট্র্যাক্টার জাতীয় গাড়ি, কিন্তু কোন জাতের তা বন্ডের জানা নেই বিরাট মসৃণ করে তৈরি চাকাগুলো বন্ডের প্রায় দ্বিগুণ উঁচু। চাকাগুলো কঠিন রাবারের তৈরি অথবা নরম রাবারে ঠাসা। পুরো জিনিসটাকে ড্রাগনের আকৃতি দেবার জন্যে দু পাশে সোনালি কালো লোহার ডানা লাগানো, রেডিয়েটারের সামনে ধাতুর তৈরি ড্রাগনের মাথা, আর হেড লাইটের কেন্দ্রে কালো রঙের ছোপ, যাতে সে দুটোকে চোখের মত দেখায়। এছাড়া বিশেষ কিছু নেই। কেবল কেবিনের ওপরটা পুরু লোহার গম্বুজে ঢাকা ও তার সামনে আগুন ছোড়বার যন্ত্র। জিনিসটা বন্ড যা ভেবেছিল তাই–ভয় দেখানো ও আগুন লাগানোর জন্যে তৈরি একটি বিচিত্র সজ্জার ট্রাক্টার। স্পষ্টতঃই এই দ্বীপে চলাফেরার পক্ষে এ জাতের গাড়ি সর্বশ্রেষ্ঠ। এই বিরাট চওড়া চাকাগুলো ঝোঁপঝাড়, জলাভূমি বা অগভীর দীঘির পানির ভেতর দিয়ে চলতে পারে।
বন্ড মুগ্ধ হল। এরকম পেশাদারি পাকা কাজ তার ভাল লাগে। ডক্টর নো নিশ্চয়ই একজন পরিশ্রমী ও যত্নবান লোক। ডক্টর নো-র গুপ্ত রহস্যের মুখোমুখি আসবে সে। আর তারপর? এত তথ্য সংগ্রহের পর তাকে অবশ্য আর দ্বীপের থেকে ফেরত দেওয়া হবে না। নিঃসন্দেহে তাকে হত্যা করা হবে। আর মেয়েটার কি হবে? বস্তু কি তার নির্দোষিতা প্রমাণ করে তাকে মুক্ত করতে পারবে? কিন্তু মুক্তি পেলেও এই দ্বীপ থেকে মেয়েটাকে আর বেরোতে দেবে না। বাকি জীবনটা তার এখানেই কাটাতে হবে। ডক্টর নো বা তার কোন অনুচরের রক্ষিতা হয়ে।
গাড়ির ঝাঁকুনিতে বন্ডের চিন্তায় বাধা পড়ল। তারা দীঘি পেরিয়ে এসেছে। পাহাড় থেকে যে রাস্তাটা কুটির পর্যন্ত নেমে গেছে সেই রাস্তা ধরে চলেছে। গাড়ি চড়াই বেয়ে উঠতে লাগলে, কেরিনটা হেলে গেল একটু। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারা পৌঁছে যাবে।
ড্রাইভারের সঙ্গীটি ঘাড় বেঁকিয়ে তাদের দেখল। বন্ড তার দিকে খুশির হাসি হেসে বলল, এই সাফল্যের জন্য তুমি নির্ঘাত একটা মেডেল পাবে।
বেগুনে রঙের ফোলা ঠোঁট দুটো বিকৃত হয়ে ঘৃণা ফুটে বেরোল, তোর-মুখটা বন্ধ কর।
মেয়েটা বন্ডকে ঠেলা মেরে বলল, ওরা এরকম বিশ্রী ব্যবহার করছে কেন? এত রাগ কেন আমাদের ওপর
বন্ড হেসে বলল, বোধহয় আমরা ওদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম বলে। এখনো ভয় কাটেনি। কারণ আমরা ওদের দেখে তেমন ভয় পাচ্ছি না। এই মেজাজটা বজায় রাখতে হবে।
