বন্ড তার স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলবার বাম বাহুর ওপর ভর দিয়ে রেখে লক্ষ্য স্থির করল। রেমিংটনের আওয়াজ ছাপিয়ে তার রিভলবারের তীব্র গর্জন শোনা গেল। একটা হেড লাইট চুরমার হয়ে নিভে গেল। অন্য হেড লাইটে পাঁচবার গুলি চালাবার পর সেটাও চুরমার হয়ে নিভে গেল। যন্ত্রটা কোন পরোয়া না করে সোজা কোয়ারেলের দিকে এগিয়ে চলল। বন্ড রিভলবারে নতুন গুলি ভরে সাজানো বাদুড়ে ডানা দুটোর তলায় ফোলা চাকাগুলোর দিকে গুলি চালাতে লাগল। এখন ওটা মাত্র ত্রিশ গজ দূরে। আর সে স্পষ্ট বুঝতে পারল সামনের চাকায় একটার পর একটা গুলি লেগেও কিছু হল না। বন্ড এবার ভয়ের শিহরণ অনুভব করল।
আবার গুলি ভরল। হতচ্ছাড়া যন্ত্রটাকে কি পেছন দিক থেকে ঘায়েল করা সম্ভব? সে কি দীঘির মধ্যে ছুটে গিয়ে ওটাতে চড়ে পড়বার চেষ্টা করবে। ঝোঁপের মধ্যে এক পা এগুতে গিয়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাকে।
সহসা ওটার নাক থেকে এক ঝলক নীল আগুন সগর্জনে ছুটে গেল যেখানটায় কোয়ারেল লুকিয়ে ছিল। বন্ডের ডানদিকের ঝোঁপগুলো থেকে এক ঝলক কমলা ও লাল রঙের আগুন ঝলসে উঠল, আর শোন গেল এক অপার্থিব চিৎকার। পরক্ষণেই তা স্তব্ধ হয়ে গেল। কাজ শেষ করে লকলকে আগুনের শিখাটা যন্ত্রের নাকের মধ্যে ফিরে গেল। এবার যন্ত্রটা ঘুরে তার নীল মুখ গহ্বর সোজা বন্ডের দিকে উদ্যত।
বন্ড দাঁড়িয়ে নিজের ভয়াবহ পরিণামের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। কোয়ারেলের কথা ভাববার সময় নেই। কল্পনার চোখে সে দেখতে পেল পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া, ঘোয়া ওঠা কোয়ারেলের মৃতদেহটা পড়ে রয়েছে গলিত বালির ওপর। এক্ষুণি সেও মশালের মত জ্বলে উঠবে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে মর্মান্তিক আর্তনাদ। তারপর হানি-র পালা। সৃষ্টিকর্তা। তাদেরকে এ কোথায় টেনে এনেছে। সে এ রকম মারাত্মক অস্ত্রধারী শত্রুকে আক্রমণ করবার মত উন্মাদ কি করে হল। যে দীর্ঘ তর্জনী জ্যামাইকাতে তাকে সাবধান করে দিতে চেয়েছিল, তাকে দেখেই কেন সে সতর্ক হয়ে যায়নি। বন্ড দাঁতে দাঁত ঘষল। শীগগীর কর হারামজাদারা, শেষ করে দে।
লাউডস্পীকারের কাংস্য-স্বর শোনা গেল, বেরিয়ে আয়, ইংরেজের বাচ্চা। মেয়েটাকেও নিয়ে আয়। চটপট কর, নইলে তোর বন্ধুর মত তোদেরকেও নরকের আগুনে পোড়াব। আদেশটা ভালভাবে বোঝানোর জন্য ছোট একটা আগুনের ঝলক তার দিকে ছুটে এল। বন্ড এক পা পিছিয়ে আত্মরক্ষা করল। পিঠে মেয়েটার স্পর্শ পেল। আমি না এসে পারলাম না, পারলাম না।
বন্ড বলল, ঠিক আছে, হানি। আমার পেছনে থাক।
বন্ড মনস্থির করল। তার সামনে অন্য কোন পথ খোলা নেই। মৃত্যু যদি আসেই, তা অন্তত এ মৃত্যুর চেয়ে বীভৎস হবে না। সে মেয়েটার হাত ধরে বালির ওপর বেরিয়ে এল।
জোর আওয়াজ হল। ঐখানেই থাম্। লক্ষ্মী ছেলে। আর ঐ খেলনা বন্দুকটা ফেলে দে। চালাকি করার চেষ্টা করিস না। নইলে কাঁকড়াদের জন্য রান্না করা খাবার বানিয়ে দেব।
বন্ড রিভলবার ফেলে দিল। বিদায় স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন, বেরেটা থাকলে এর চেয়ে বেশি কাজে লাগত না। মেয়েটা ফোপাচ্ছে। বন্ড তার হাতে চাপ দিয়ে বলল, মাথা ঠাণ্ডা কর হানি। যেমন করে তোক আমরা এ ফাঁদ থেকে পালাব। ডাহা মিথ্যে কথার জন্য বন্ড নিজেকে বিদ্রূপ করল।
একটা লোহার দরজা খোলার ধাতব শব্দ শোনা গেল। গম্বুজটার পেছন থেকে একটা লোজ পানিতে লাফিয়ে নামল। তারপর তাদের দিকে এগিয়ে এল তার হাতে পিস্তল। আগুনের নলটার সামনে থেকে সরে ছিল সে। লকলকে নীল আগুন তার ঘর্মাক্তমুখে আলো ফেলছিল। একজন চীনে নিগ্রো। বিশাল চেহারা, পরনে কেবল হাফপ্যান্ট। তার বাঁ হাতে একজোড়া হাতকড়া ঝুলছে।
লোকটা একগজ দূরে এসে দাঁড়াল। বলর, হাত দুটোকে সামনে বাড়িয়ে কব্জি দুটা এক কর। তারপর আমার দিকে এগিয়ে আয়। তুই আগে আয় ইংরেজের বাচ্চা। খুব আস্তে।
বন্ড কথা মত কাজ করল। লোকটার সামনে আসতেই লোকটা দাঁতে পিস্তলটা চেপে ধরে হাত বাড়িয়ে বন্ডের কব্জিতে হাতকড়া এঁটে দিল। নীল আগুনে ইস্পাতের মত মুখটার দিকে বন্ড তাকিয়ে দেখল। ভয়ংকর। ট্যারা একটা মুখ। লোকটা মুখ ভেংচে বলল, বুদ্ধ বেজন্মা কোথাকার।
বন্ড ঘুরে দাঁড়িয়ে বিপরীত দিকে হাঁটতে লাগল। সে কোয়ারেলের দেহটা দেখতে চায়। বন্ডের পেছনে পিস্তলের গর্জন শোনা গেল, পায়ের কাছি বালি ছিটকে উঠল। থেমে গেল সে। ঘাবড়িয়ো না। যে লোকটাকে তোমরা এইমাত্র খুন করলে তাকে দেখে এখুনি ফিরে আসছি।
লোকটা পিস্তল নামিয়ে কর্কশ কণ্ঠে হেসে বলল, ঠিক আছে। যা প্রাণে চায় কর। পুষ্পমাল্য-টাল্য না আনার জন্য দুঃখিত। চটপট ফিরে আয় নইলে মেয়েটাকে ঝলসে দেব। দুমিনিট।
বন্ড হেঁটে চলল ধোঁয়া ওঠা ঝোঁপগুলোর দিকে। সেখানে পৌঁছে তার চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। হ্যাঁ, ঠিক যে রকমটা সে কল্পনা করেছিল বরং তার চেয়েও ভয়ংকর, সে আস্তে আস্তে বলল, আমি দুঃখিত। কোয়ারেল। হাতকড়া বাঁধা দু হাতে খানিকটা ঠাণ্ডা বালি তুলে কোয়ারেলের দুই চক্ষুকোটরের দগ্ধাবশেষের মধ্যে ঢেলে দিল। তারপর ধীরপদে ফিরে এল।
লোকটা পিস্তলের ইঙ্গিতে তাদের সামনে যেতে বলল। তারা ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল যন্ত্রটার পেছনে। সেখানে ছোট চৌকো একটা দরজা। ভেতর থেকে কে যেন বলল, ভেতরে এসে মেঝেতে বসে পড়। কোন জিনিসে হাত দিসনা। যেন, আঙ্গুল ভেঙ্গে দেব। তারা লৌহযন্ত্রের ভেতর ঢুকল। চারদিকে তেল আর ঘামের বিশ্রী গন্ধ। কোনরকমে হাঁটু মুড়ে বসে থাকার জায়গা পেল। বন্দুকধারী তাদের পেছন পেছন উঠে দরজা বন্ধ করে দিল। একটা আলো জ্বালিয়ে ড্রাইভারের পাশে বসল। বলল, ঠিক আছে স্যাম। রওনা হওয়া যাক। আগুনটা বন্ধ করতে পার। গাড়ি চালানোর। পক্ষে যথেষ্ট আলো আছে।
