হানি প্রিয়ে, তুমি ঘুমোও দেখি। ওরকম করে শুতে পারলে ভালই হত, কিন্তু আজ নয়। তাছাড়া একটু পরেই কোয়ারেলের জায়গায় পাহারা দিতে হবে।
হুঁ, বুঝেছি। অসন্তুষ্ট গলায়, জ্যামাইকা ফিরে যাবার পর।
হতে পারে।
প্রতিজ্ঞা করো। নইলে আমি ঘুমোবই না।
হ্যা, হ্যাঁ, একশোবার প্রতিজ্ঞা করছি। এবার ঘুমোও।
চাপা কণ্ঠস্বরে, এইবার তাহলে তুমি আমাকে দাসখৎ লিখে দিলে, মনে থাকে যেন তুমি প্রতিজ্ঞা করেছ। শুভরাত্রি প্রিয় জেমস্।
শুভরাত্রি, প্রিয়ে হানি।
.
ভয়ঙ্করের আগমন
কে যেন উত্তেজিতভাবে বন্ডের কাঁধ চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল সে।
কোয়ারেল ভয়ার্তকণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল, কি একটা পানির ওপর দিয়ে আসছে। নিশ্চয়ই সেই ড্রাগনটা।
মেয়েটার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সে আশাঙ্কার সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?
বন্ড বলল, তুমি ওখানেই থাক, হানি। কোথাও যেও না। আমি এক্ষুনি ফিরে আসছি। বলে সে ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে দৌড় মারল। ছুটে চলল বালির ওপর দিয়ে পাহাড়ের বিপরীত দিকে। কোয়ারেল তার পেছন পেছন এল।
খোলা জায়গাটার কুড়ি গজ দূরে বালুচরের শেষ প্রান্তে পৌঁছল তারা, প্রান্তিক ঝোঁপগুলোকে সরিয়ে বন্ড তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল।
কি ওটা? আধ মাইল দূরে পানির ওপর দিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে অদ্ভুত চেহারার একটা কিছু। জলন্ত কমলারঙের চোখের মাঝখানে কালো মনি, তাদের মাঝখানে, যেখানে মুখটা থাকা উচিত, সেখানে লক্-লক্ করছে একগজ লম্বা একটা নীল আগুনের শিখা। তারাদের ধূসর আলোয় দেখা যাচ্ছে কেমন একটা গম্বুজের মত মাথা আর একজোড়া বাদুড়ে ডানা। জিনিসটা গর্জন করে চলেছে, তার তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছে গভীর ধক-ধক্ শব্দ। পানি কেটে এগিয়ে আসছে ঘণ্টায় দশ মাইল বেগে।
কোয়ারেল বলল, সর্বনাশ ক্যাপ্টেন! ঐ সাংঘাতিক জিনিসটা কি?
বন্ড উঠে দাঁড়াল। বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না। একটা ট্রাকটার ধরনের জিনিসকে বিদঘুঁটে করে সাজানো হয়েছে। ওটা ডিজেলে চলছে, সুতরাং তুমি ড্রাগনের কথা ভুলে যেতে পার। এবার দেখা যাক, বন্ড আপন মনেই বলল, পালিয়ে লাভ নেই, দানবটা আমাদের চেয়ে জোরে চলতে পারে। আমরা জানি ঝোঁপজাড় বা জলা ওকে আটকাতে পারে না। দাঁড়িয়েই লড়াই করতে হবে। এর কোন জায়গাটা দুর্বল হবে? চালকদের কেবিন? অবশ্য সুরক্ষিত থাকবে, ঠিক তা জানা নেই। কোয়ারেল ওটা দুশোগজের মধ্যে এলেই তুমি গম্বুজটা লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করবে। লক্ষ্য স্থির করে গুলি করবে। পঞ্চাশ গজের মধ্যে এলে আমি হেড লাইট দুটোর দিকে গুলি ছুঁড়ব। এ জিনিসটা ট্র্যাক্টারের মত চাকায় চলছে না, নিশ্চয়ই বড় ধরনের চাকা আছে। সম্ভবত এরোপ্লেনের চাকা। সেগুলোর দিকেও আমি গুলি চালাব। এখানেই থাক তুমি। আমি দশ গজ দূরে থাকব। ওরা পাল্টা গুলি চালারে মেয়েটাকে আড়াল করতে হবে। ঠিক আছে।
বন্ড হাত বাড়িয়ে কোয়ারেলের বিশাল কাঁধে চাপ দিল, আর বেশি ঘাবড়িয়ো না। ড্রাগনের কথা ভুলে যাও। এটা ডক্টর নো-র তৈরি একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। ড্রাইভারদের মেরে আমরা গাড়িটাকে দখল করে নেব, তারপর ওটাতে চড়ে পূর্ব উপকূলের দিকে ফিরে যাব। কি বল?
কোয়ারেল একটু হেসে বলল, ভাল কথা, ক্যাপ্টেন। আপনি যখন বলছেন তখন তাই হবে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা জানেন ওটা সত্যিই ড্রাগন কিনা!
বন্ড বালির ওপর দিয়ে ছুটে গেল। ঝোঁপগুলোকে ভেঙে ভেঙে এগিয়ে গেল যতক্ষণ না তার সামনে গুলি চালাবার। রাস্তা একেবারে পরিষ্কার হয়। তারপর আস্তে ডাকল, হানি।
এই যে জেমস্। কাছেই মেয়েটার গলা শোনা গেল।
সকালের মত বালি খুঁড়ে একটা গর্ত তৈরি কর। সবচেয়ে মোটা শেকড়গুলোর পেছনে। তারপর তার মধ্যে ঢুকে চুপচাপ শুয়ে থাক। গুলি চলতে পারে। ড্রাগন একটা স্রেফ রংকরা মোটর গাড়ি। ডক্টর নো-র কয়েকজন লোক ওটাকে চালাচ্ছে। ভয় পেও না, আমি কাছেই আছি। ঠিক আছে, জেমস, সাবধানে থেক।
বন্ড এক হাঁটু গেড়ে বসে ঝরাপাতার ওপর উঁকি মেরে দেখল ওরা মাত্র শ তিনেক গজ দূরে। হলদে হেড লাইট দুটো বালুচরের ওপর আলো ফেলছে। এখন তার মুখে নীল শিখা লক্লক্ করছে। আগুনটা বেরিয়ে আসছে ওটার লম্বা নাক থেকে নাকটা আবার একজোড়া হাঁ করা চোয়াল দিয়ে সাজানো আর সোনালি রং করা, যাতে সবকটাকে ঠিক ড্রাগনের মুখের মত দেখায়। আগুন ছোড়বার নল। পোড়া ঝোঁপগুলো এবং আহত ওয়ার্ডেনটির গল্পের রহস্য এখন পরিষ্কার হচ্ছে। কতদূর আগুন ছুঁড়তে পারে যন্ত্রটা?
বন্ডকে মানতে হল যে এই বস্তুটি যদি একটানা গর্জনের সঙ্গে দীঘির পানির ওপর দিয়ে এগিয়ে চলে তাহলে সত্যিই একটা ভয়াবহ দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। ডিজেল ইঞ্জিনের পরিচিত ধকধক শব্দটা কানে না গেলে হয়ত সে নিজেও ভয় পেত। স্থানীয় অধিবাসীদের বিরুদ্ধে এ যন্ত্রটা যে ভীষণ কাজ দেবে সন্দেহ নেই। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রধারী দু জন নির্ভীক মানুষের বিরুদ্ধে এটা কতক্ষণ দাঁড়াতে পারে?
সঙ্গে সঙ্গে কোয়ারেলের রেমিংটন রাইফেলের গর্জন শোনা গেল। ঠং করে একটা আওয়াজের সঙ্গে গম্বুজওয়ালা মাথাটা থেকে একরাশ আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরুল। আরেকটা গুলি চালাল কোয়ারেল, তারপর অনেকগুলো বুলেট। যন্ত্রটার মাথার চারিদিকে অজস্রবার আঘাত করল কিন্তু কিছুই হল না, ওটার গতি পর্যন্ত একটুও কমলো না। গড়িয়ে চলল একভাবে, কেবল একটু বেঁকে গেল, যেদিক দিয়ে গুলি আসছে সে দিকে।
