সত্যি বলছ? মেয়েটার গলায় উত্তেজনার আভাস, তোমার কি মনে হয় আমি আবার সুন্দর হতে পারব? আমি জানি আমার শরীরের কিছু-কিছু অংশ ঠিকই আছে। কিন্তু আয়নার দিকে তাকালে আমার ভাঙা নাকটা ছাড়া কিছুই দেখতে পাই না। আমি জানি অন্য যে সব লোকেদের শরীরে বিকৃতি থাকে, তাদের ঠিক এইরকম মনে হয়।
বন্ড অধৈর্যভাবে বলল, তোমার মোটেই কোন বিকৃতি নেই। আজেবাজে কথা বলো না। আর তাছাড়া ছোট্ট একটা অস্ত্রোপচার করে এটাকে ঠিক করে নেওয়া যায়। একবার আমেরিকা যেতে পারলে এক সপ্তাহের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেয়েটা রেগে বলল, সেটা কি করে করব শুনি? আমার মাটির তলার ঘরে একটা পাথরের নিচে মোটে পনেরো পাউন্ড লুকানো আছে। আর আছে তিনটে স্কার্ট, তিনটে শার্ট, একটা ছোরা আর একটা মাছ ধরবার জাল। ঐ অপারেশনের কথা আমার সব জানা আছে। পোর্ট মারিয়া-র ডাক্তারবাবু আমার জন্য খোঁজখবর নিয়েছিলেন। খুব ভাল লোক তিনি। আমেরিকায় চিঠি লিখেছিলেন। জান, পুরো অপারেশনটা করাতে, হাসপাতালে আর যাতায়াতের খরচ ইত্যাদি নিয়ে, প্রায় পাঁচশ পাউন্ড লাগে? হতাশ গলায় বললে সে, আমি কোত্থেকে অত টাকা পাব বল?
বন্ড ইতিমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছিল এ ব্যাপারে কি করা যেতে পারে। আপাতত সে নরমভাবে বলল, আমার ধারণা, উপায় একটা হয়ে যাবে। কিন্তু যাই হোক, তোমার গল্পটা চালিয়ে যাও। ভারি অদ্ভুত গল্প। আমারটার চেয়ে অনেক বেশি বিচিত্র। তোমার ধাই-মা মারা যাওয়া পর্যন্ত বলেছিলে। তারপর কি হল?
মেয়েটা আবার বলতে লাগল, তুমিই তো বার বার থামিয়ে দিচ্ছ আমাকে। আর যা বোঝে না তা নিয়ে কথা বলতে যেও না। সবাই বোধহয় বলে যে তুমি দেখতে যুবা সুন্দর, বোধহয় তুমি যে মেয়ের দিকে হাত বাড়াও তাকেও পাও। জেনে রাখ, যদি তুমি ট্যারা, গন্নাকাটা বা আর কিছু হতে, কেউ তোমার দিকে ফিরে তাকাত না। সত্যি বলতে কি, মেয়েটার গলায় হাসির রেশ, আমার ইচ্ছে হচ্ছে বাড়ি ফিরে যাবার পর আমাদের গ্রামের ডাইনীকে দিয়ে এমন এক মন্ত্র পড়াব তোমার ওপর, যাতে তোমার ঐরকম একটা কিছু হয়ে যায়। তারপর অনেকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবে জুড়ে দিল, তাহলে আমাদের দুজনকে অনেকটা একরকম দেখাবে।
বন্ড হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করল। বলল, আমার অবশ্য আলাদা মতলব আছে। কিন্তু আগে তুমি তোমার গল্প শেষ কর।
বেশ। মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এবার একটু পিছিয়ে যাওয়া দরকার। আখের ক্ষেতেই ঐ অঞ্চলের যাবতীয় সম্পত্তি, আর পুরনো বাড়িটা হচ্ছে তাদের ঠিক মাঝখানে। তা, বছরে দুবার আখ কেটে মাড়াইয়ের কলে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময়ে ক্ষেতের সব জন্তুজানোয়ার আর পোকামাকড়দের বাসা ভেঙ্গে যায়। তাদের অনেকে মরে যায় আর অন্যেরা ভয়ের চোটে পালায়। পালিয়ে এসে ঢোকে পুরনো বাড়িটার আনাচে কানাচে।
এদের মধ্যে ছিল বেজী, সাপ, বিছে। আরো অনেক কিছু। আমার ধাই-মা এদের খুব ভয় পেত। আমি কিন্তু মাটির তলায় গোটা দুয়েক ঘরে ওদের জন্য বাসা মত বানিয়ে দিলাম। ওরা হয়ত বুঝতে পারল যে আমি ওদের যত্ন করছি। আর ওদের বন্ধু বান্ধবদের খবর জানাল। কারণ তারপর তারা দল বেঁধে এসে ঢুকতে লাগল সেই ঘর দুটোতে। যতদিন আখ বড় হচ্ছে, তারা সেখানেই বসবাস করত। আখ বড় হলেই আবার সদলবলে মাঠে ফিরে যেত।
যতদিন তারা আমাদের সঙ্গে থাকত, আমার বেঁচে যাওয়া খাবার ওদের খাওয়াতাম। তারাও বেশ ভাল ব্যবহার করত, কেবল একটু বুনো গন্ধ বার করতে আর মাঝে সাজে নিজেদের মধ্যে মারামারি করত। কিন্তু তারা আর তাদের বাচ্চারা আমার বেশ পোষ মেনে গিয়েছিল। আমি যা বলতাম তাই করত। তারপর অবশ্য আখকাটা লোকগুলো ব্যাপারটা জেনে গেল। গলায় সাপ জড়িয়ে ঘুরে বেড়াতেও আমাকে দেখেছিল তারা। তাতে ভয় পেয়ে ওরা আমাকে ডাইনী বলে ধরে নিল। আর আমাদের ধারে কাছে ঘেঁষত না। একটু থেমে মেয়েটা আবার বলল, এইভাবেই আমি জানোয়ার আর পোকামাকড়দের বিসয়ে এত কিছু জেনেছি। বন্ডের দিকে তাকিয়ে বলল, এদের সম্পর্কে কিছু না জেনে তুমি খুব ভুল করেছ।
সত্যিই তাই, বন্ড বলল, ওরা বোধহয় মানুষজনের চেয়ে অনেক ভাল আর অনেক মজার।
মেয়েটা চিন্তিতভাবে বলল, তা জানি না, লোকজনের সঙ্গে আমার তেমন আলাপ নেই। যে ক জনকে আমি চিনি তারা খুবই খারাপ লোক। তবে আমার মনে হয় ভাল লোকও আছে। একটু থামল, আসলে আমি ঐ জন্তু জানোয়ারদের মত মানুষদেরকে পছন্দ করবার কথা কোনদিন ভাবিনি। অবশ্য ধাইমাকে ছাড়া। যতক্ষণ না… বলে সে লাজুক হেসে থেমে গেল।
যাই হোক। আমার পনের বছর বয়স পর্যন্ত আমার সুখেই ছিলাম। তারপর ধাইমা মারা গেলে অবস্থাটা জটিল হয়ে গেল। ম্যাডার বলে একটা লোক ছিল। সাংঘাতিক মানুষ। সে ক্ষেতের মালিকদের ওভারশিয়ার হিসেবে কাজ করে। প্রায়ই আমাকে দেখতে আসত। সে চাইত আমি পোর্ট মারিয়া-র কাছে তার বাড়িতে গিয়ে থাকি। আমি তাকে ঘেন্না করতাম। ক্ষেতের মধ্যে তার ঘোড়ার শব্দ পেলেই লুকিয়ে পড়তাম। একদিন রাত্রে সে পায়ে হেঁটে এল। আমি কিছুই শুনতে পাইনি। সে তখন মাতাল। মাটির তলায় ঘরটাতে সে আমার সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু করল। সে যা চাইছিল আমি তা করতে দিচ্ছিলাম না। জানো বোধহয়, প্রেম করবার সময় মেয়ে-পুরুষে যা করে।
