মেয়েটা বলল, তোমার জীবনে দেখি অনেক উত্তেজনা আছে। তোমার বৌ নিশ্চয়ই এই বাইরে থাকাটা পছন্দ করে না। তুমি আহত হতে পার ভেবে তার দুশ্চিন্তা হয় না?
আমি বিয়ে করিনি। আমার জীবনবীমা ছাড়া আমার সুস্থতা সম্পর্কে চিন্তা করবার কেউ নেই।
তোমার বোধহয় অনেক মেয়ে বন্ধু আছে?
স্থায়ী কেউ নেই।
আচ্ছা।
কোয়ারেল তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ক্যাপ্টেন, আপনার আপত্তি না থাকলে প্রথম রাতটা আমি পাহারা দিই। বালুচরের ওদিকের কোণে বসে থাকব। মাঝ রাত্তিরে এসে আপনাকে ডাকব। আপনি না হয় পাঁচটা পর্যন্ত পাহারা দেবেন। আর তারপরেই আমরা রওনা হব। আলো ফোটবার আগেই এ জায়গা থেকে বেশ কিছু দূরে চলে যেতে হবে।
আমার আপত্তি নেই। তেমন কিছু দেখলে আমাকে জানিয়ে দিও। বন্দুক ঠিক আছে তো?
চমৎকার আছে। ভাল করে ঘুমোও মিস্ কিছুটা দ্ব্যর্থক ভাবেই বলল, তারপর চলে গেল।
কোয়ারেলকে আমার ভাল লাগছে, মেয়েটি বলল, তুমি কি সত্যিই আমার সম্বন্ধে জানতে চাও?
নিশ্চয়ই জানতে চাই। কিছু বাদ দিয়ে বল না যেন।
বাদ দেওয়ার কিছু নেই। আমার পুরো জীবন কাহিনী একটা পোস্টকার্ডের পেছনে লেখা যায়। প্রথমত আমি কখনো জ্যামাইকার বাইরে পা বাড়াইনি। জন্মাবধি আমি থাকি জ্যামাইকার উত্তর উপকূলে, মর্গানুস হার্বারের কাছে বো ডেজার্ট নামে একটা জায়গায়।
বন্ড হাসল, আশ্চর্য ব্যাপার, আমিও তো আপাতত ওখানেই আছি। তোমাকে তো ওদিকে দেখিনি। তুমি পানির মগডালে বাস কর নাকি?
ও। তুমি বোধহয় সমুদ্রের ধারের বাড়িটা নিয়েছ। আমি থাকি বড় বাড়িটাতে।
কিন্তু ওটার তো আর কিছুই নেই। আখের ক্ষেতের মাঝে স্রেফ একটা ধ্বংসস্তূপ।
আমি থাকি বাড়িটার মাটির তলায় ভাড়ার ঘরে। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন থেকে আমি ঐ ঘরে আছি। বাড়িটায় যখন আগুন লাগে তখন আমার বাবা-মা পুড়ে মারা যান। তাদের সম্বন্ধে আমার কিছু মনে নেই। প্রথমদিকে আমি ওখানে আমার নিগ্রো ধাইমার কাছে থামতাম। আমার পনের বছর বয়সে ধাইমা মারা যান। গত পাঁচ বছর আমি একাই থাকি।
হে সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু তোমাকে দেখাশোনা করবার মত কি কেউ ছিল না? তোমার বাবা মা কি কিছু টাকা পয়সা রেখে যায়নি?
একটা পয়সাও না। জান, আমরা, মানে রাইডার-রা, জ্যামাইকার সবচেয়ে পুরনো পরিবারগুলোর অন্যতম। রাইডার পরিবারের আদিপুরুষ রাজা চার্লস-এর মৃত্যুদণ্ডের সই করেছিলেন আর সেই খাতিরেই তিনি ক্রমওয়েলের কাছ থেকে এই বো ডেজার্টের জমিটা পান। তিনিই এই বড় বাড়ি তৈরি করেন। তারপর থেকে আমাদের পরিবার মাঝে সাঝে এখানে বসবাস করত।
কিন্তু তারপর চিনির দাম পড়ে গেল। বোধহয় তখন থেকেই কষ্টেসৃষ্টে ব্যবসা চলছিল। আমার বাবার হাতে যখন সম্পত্তি আসে, তখন চারিদিকে দেনা ছাড়া আর কিছু ছিল না। তাই বাবা মারা যেতে সব সম্পত্তি বিক্রি হয়ে যায়। আমি তখন খুব ছোট। আমার ধাইমা খুব ভাল লোক ছিল। পাদরী ও উকিলেরা চাইছিল কেউ যেন আমাকে পুষ্যি নেয়। কিন্তু ধাইমা ঘরের যে সব আসবাবপত্র পুড়ে যায়নি সেগুলো এক করে আমাকে নিয়ে ঐ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থাকতে লাগল। কিছুদিন কেটে যাবার পর আর কেউ আমাদের ঘাটাতে আসেনি।
ধাইমা সেলাই করত, গ্রামের লোকেদের কাপড় কেচে দিত, আর কলাগাছ ইত্যাদির একটা বাগান ছিল। তার ওপর আমাদের পুরনো বাড়ি ঘেষে একটা রুটি গাছ ছিল। বাড়ির চারপাশে ছিল অজস্র আখ, নদীতে মাছ ধরবার ব্যবস্থা করা হল, যাতে আমরা রোজ মাছ পাই। সুতরাং সব আবার ঠিক হয়ে গেল। খাওয়া দাওয়ার কোন কোন অভাব হল না আমাদের। জ্যামাইকার লোকে যা খায় আমরাও তাই খেতাম।
কি জানি কি করে ধাইমা আমাকে লিখতে পড়তে শেখাল। আগুনের হাত থেকে একগাদা পুরনো বই বেঁচে গিয়েছিল। তার মধ্যে একটা এসাইক্লোপিডিয়া। আট বছর বয়সে আমি সেই বিশ্বকোষটা পড়তে শুরু করি। এর মধ্যে আমি A থেকে T পর্যন্ত পড়ে ফেলেছি। আমি বলতে পারি, অনেক বিষয়ে তোমার থেকে আমার বেশি জানা। আছে।
আমারও তাই মনে হয়। বন্ড অন্যমনে কল্পনা করছিল সেই বিচিত্র দৃশ্যটা–একটা রুক্ষচুলওয়ালা বাচ্চা মেয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বক্ক্ করতে করতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তার ওপর নজর রাখছে এক কড়ামেজাজের নিগ্রো বুড়ি আর মাঝে মাঝে মেয়েটাকে ডাকছে পড়াশুনা করবার জন্য। যদিও বুড়ি নিজেও জানে না বইয়ে কি হিজিবিজি লেখা আছে। বন্ড বলল, তোমার ধাইমা নিশ্চয়ই এক চমৎকার মানুষ ছিলেন।
অতি চমৎকার মানুষ। সহজ ভাষায় মেয়েটি বলল, ও যখন মারা যায়, ভেবেছিলাম আমিও মরে যাব। সব যেন ফুরিয়ে গেল। তার আগে পর্যন্ত আমি একটা বাচ্চার মত ছিলাম। হঠাৎ আমাকে বড় হয়ে উঠে নিজের সবকিছু করে নিতে হল। পুরুষেরা চেষ্টা করল আমাকে ধরতে এবং ক্ষতি করতে। তারা আমার সঙ্গে প্রেম করতে চায়। তখন আমি দেখতে খুব সুন্দর ছিলাম।
বন্ড গম্ভীরভাবে বলল, আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে তুমি একজন।
এই নাক নিয়ে বোকার মত কথা বল না।
তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না। বন্ড মেয়েটাকে বিশ্বাস করাবার মত কথা খুঁজতে লাগল, অবশ্যই দেখা যাচ্ছে তোমার নাকটা ভাঙা। কিন্তু আজ সারাদিনের আমার তা চোখেই পড়েনি। একজন লোকের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখ পড়ে তার চোখের ওপর বা ঠোঁটের ওপর। কারণ ঐ দুই জায়গাতেই থাকে মুখের যাবতীয় অভিব্যক্তি। একটা ভাঙা নাক কোনভাবেই এক বাকা কানের চেয়ে বড় ব্যাপার নয়। নাক কান হচ্ছে মুখটাকে সাজানো গোছানোর জন্য। কারো নাক-কান হয়ত অন্যদের চেয়ে সুন্দর। কিন্তু তা বলে মুখের অন্যান্য অংশের মত গুরুত্বপূর্ণ নয়। তোমার নাকটা যদি তোমার আর সব কিছুর মত সুন্দর হত, তাহলে তুমি জ্যামাইকার সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে হতে পারতে।
