বন্ড বলল, ঠিক আছে, কোয়ারেল। খাবারের ব্যাপারটা তোমার ওপরেই ছেড়ে দিচ্ছি। তার অস্ত্র ও ভেজা প্যান্ট নিয়ে যে পথে এসেছিল সে পথেই ফিরে অগভীর পানিতে নেমে গেল। একটা শুকনো কঠিন বালির জায়গা খুঁজে বার করল। তারপর শার্ট খুলে পানির মধ্যে শুয়ে পড়ল। সে এক মুঠো বালি খুঁজে বার করে সাবানের মত গায়ে ঘষল। তারপর সেই নিঃসঙ্গ নীরবতায় আরামে শুয়ে রইল।
ক্রমশ কতকগুলো ফ্যাকাশে তারা দেখা গেল। এই তারাগুলো দেখেই তারা গতরাত্রে এই দ্বীপে এসেছিল। সে যেন এক বছর আগেকার কথা। অভিযান বটে একটা! কিন্তু পরিশ্রমটা অন্তত সার্থক হয়েছে। তার কাছে এখন অনেক প্রমাণ, অনেক সাক্ষী, যার ওপর নির্ভর করে সে গভর্নরের কাছে গিয়ে ডক্টর নোর কীর্তিকলাপ সম্পর্কে একটা রীতিমত অনুসন্ধানের দাবী করতে পারে।
কয়েকজন লোকের ওপর কেউ অত সহজে মেশিনগান চালায় না। অনুপ্রবেশকারীদের ওপরেও নয়। সোসাইটির ভাড়া নেওয়া জায়গায় অনুপ্রবেশ করেছে। তাদের সম্পত্তি নষ্ট করেছে আর সম্ভবত একজন ওয়ার্ডেনকে খুনও করেছে। এ বিষয়েও অনুসন্ধান প্রয়োজন যখন সে একটা ডেপরে এবং একদল নৌসেনা সঙ্গে নিয়ে সোজা রাস্তায় এ দ্বীপে এসে হাজির হবে, তখন কি উত্তর খুঁজে পেতে পারে সে? ডক্টর নোর এই বিচিত্র হেয়ালির অর্থ কি? কি লুকোচ্ছেন তিনি? কিসের ভয় তাঁর? গোপনীয়তা কি তার কাছে এতই আবশ্যক যে তার জন্য তিনি খুনের পর খুন করে যাবেন? কে এই ডক্টর নো?
বন্ড তার ডান দিকে পানির মধ্যে ছপছপ আওয়াজ শুনতে পেল। মেয়েটার কথা ভাবল সে। কে এই হানিচাইল রাইডার? বন্ড ভাবল এ খবরটা অন্তত আজ রাত শেষ হবার আগেই তাকে জানাতে হবে। স্যাঁতসেঁতে প্যান্টটা পরে নিল বন্ড। বালির ওপর বসে রিভলবারটা খুলল। স্পর্শের সাহায্যে প্রতিটি অংশ এবং প্রতিটি গুলি শার্ট দিয়ে মুছে শুকনো করল। তারপর অংশগুলো জুড়ে ফেলল। গুলি ভরে সেটাকে কোমরবন্ধনীর তলায় খাপের ভেতর খুঁজে দিল। আবার খোলা জায়গায় ফিরে এল।
অন্ধকারে হানি এসে তাকে তার পাশে টেনে বসাল। বলল, এসো, ভীষণ খিদে পেয়েছে আমাদের। একটা বাসন ধুয়ে মুছে আমি তার মধ্যে বরবটির দানাগুলি ঢেলেছি, প্রত্যেকের জন্য দু মুঠো বরবটি আর একটা করে ক্রিকেট বলের মত পাউরুটি আছে। ভেব না যে তোমাদের খাবার খেতে আমার খারাপ লাগছে, কারণ তোমরা না থাকলে যা করতে হত তার চেয়ে অনেক বেশি খাঁটিয়ে নিচ্ছ তোমরা, নাও, হাত বাড়াও।
মেয়েটার পাকামি শুনে বন্ড হেসে ফেলল। বন্ড ভাবল মাথাটা সরু দেখাচ্ছে এই চুল শুকিয়ে নিয়ে আচড়ালে কেমন লাগবে? তার অপরূপ সোনালি গায়ে পরিষ্কার কাপড় উঠলে কেমন দেখাবে? মেয়েটা ভাঙা নাকটাকে ঠিক করে নেয়নি কেন? ছোট্ট একটা অস্ত্রোপচার লাগবে। তারপর সে জ্যামাইকার শ্রেষ্ঠা সুন্দরী হবে।
তাদের কাঁধে কাঁধে ছোঁয়া লাগল। বন্ড হাত বাড়িয়ে মেয়েটার কোলের ওপর চিৎ করে রাখল। সে হাতটা তুলে একরাশ ঠাণ্ডা বরবটির দানা তার হাতে ঢেলে দিল।
হঠাৎ সে মেয়েটার শরীরের অদ্ভুত জান্তব গন্ধ পেল। গন্ধটা এমন মাদকতাময় যে তার দেহ মেয়েটার দিকে সরে গেল।
মেয়েটা হাসল লজ্জা, পরিতৃপ্তি আর স্নেহের হাসি। মা-মা গলায় বলল, নাও, ধর। তারপর ভর্তি হাতটা তুলে নিয়ে বন্ডকে ফিরিয়ে দিল।
.
অজানা অরণ্যের গভীরে
রাত আটটা হবে, বন্ড ভাবল। ব্যাঙের একটানা ডাক ছাড়া সব চুপচাপ। দূরে, ভোলা জায়গায় এককোণে সে কোয়ারেলের শরীর দেখতে পেল। মৃদু ধাতব খুটখাট শব্দ শোনা যাচ্ছে। কোয়ারেল তার রেমিংটন রাইফেল খুলে পরিষ্কার করছে।
ঝোঁপের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের গুয়ানেরা-র হলদে আলোগুলো দীঘির কালো পানির ওপর বর্ণোজ্জ্বল রেখার সৃষ্টি করেছে। বেশ ঠাণ্ডা, বন্ডের জামাকাপড় গায়েই শুকিয়েছে। তিন মুঠো খাবারে তার পেট বেশ ভরে গেছে। দিব্যি আরাম ও স্বস্তি অনুভব করছে সে। ঘুম পাচ্ছে। কাল অনেকটা পথ যেতে হবে। হঠাৎ যেন জীবনটাকে সহজ এবং সুন্দর মনে হচ্ছে।
মেয়েটা তার পাশে ঘুমের থলির মধ্যে শুয়েছিল চিৎ হয়ে, দু হাতের ওপর মাথার ভর দিয়ে। তাকিয়েছিল তারায় ভরা চন্দ্রাতপটার দিকে। বন্ড কেবল তার সাদা মুখটা আবছা দেখতে পাচ্ছিল। মেয়েটা বলল, জেমস্ তুমি বলেছিলে যে, সব ব্যাপারটা আমাকে বুঝিয়ে বলবে। যতক্ষণ না বলবে আমি ঘুমব না।
বন্ড হেসে বলল, বলব, তবে যদি তুমিও সব বল। আমি তোমার সম্বন্ধে সব কিছু জানতে চাই।
আমার আপত্তি নেই। গোপন করবার মত আমার কিছুই নেই। কিন্তু আগে তুমি বলবে।
বেশ। আমি এক ধরনের পুলিশম্যান। পৃথিবীর কোথাও যদি এমন গোলমাল ঘটে যা নিয়ে মাথা ঘামানোর কেউ নেই, তাহলে সেখানে আমাকে পাঠানো হয়। তা, অল্প কিছুদিন আগে এখানকার রাজ্যপালের একজন কর্মচারি, স্ত্রাংওয়েজ আমার বন্ধু, হঠাৎ নিরুদ্দেশ হলেন। তার সুন্দরী সেক্রেটারিকেও পাওয়া গেল না। অধিকাংশ লোক ভাবল তারা দু জনে পালিয়েছে। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমি…
বন্ড সহজ ভাষায় পুরো গল্পটা তাকে বলল, শেষে বলল, তাহলে বুঝতে পার, হানি যে, এখন আমাদের তিনজনের সামনে কাল রাত্রে জ্যামাইকা ফিরে যাওয়া ছাড়া কোন সমস্যা নেই। তারপর রাজ্যপাল মশাই আমাদের কথা শুনবেন। অনুসন্ধানের জন্য সৈন্য পাঠাবেন। মনে হয় চীনেম্যানটির জেল হবে। উনি তা জানেন, আর সেই জন্যেই আমাকে আটকাবার চেষ্টা করছেন। ব্যস, এবার তোমার পালা।
