নদীর পশ্চিম উপকূলে তারা বাঁশঝাড় আর ঝোঁপের ছায়া পাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু গা ঝলসে দেওয়া গরম হাওয়ায় ছিল দুর্দান্ত ঝাঁপটা। সূর্যের চোখ ধাঁধানো আলোয় বন্ডের চোখ টকটকে লাল হয়েছে আর হাতে যেখানে রিভলভারের ধাক্কা লেগেছিল সেখানে অসহ্য যন্ত্রণা। সে ভাবছিল কতক্ষণে ঘুমানো সম্ভব হবে।
আর মেয়েটা। সে তো রাতে একেবারেই ঘুমোয়নি। বন্ড আর কোয়ারেলকে সারারাত ধরে পাহারা দিতে হবে। আবার আগামীকাল রওনা হতে হবে ঝোঁপঝাড় ভেদ করে দ্বীপের সেই পূর্বপ্রান্তে নৌকাটার দিকে। তারপর আবার রাত্রিবেলা প্রত্যাবর্তনের পালা। সে হেঁটে চলল আর মনে পড়ল M এর সূর্যের আলোয় ছুটি উপভোগ করবার মন্তব্যটা।
হঠাৎ কোয়ারেল থেকে গেল। তার চোখের দৃষ্টি কুকুরের মত সামনের জলাভূমির ওপর স্থির নিবদ্ধ। সামনের কাদার ওপর দুটো গভীর সমান্তরাল দাগ। তাদের মাঝামাঝি আরেকটা অস্পষ্ট দাগ দেখা যাচ্ছে। পায়ের দাগ। কিছু একটা নেমে এসেছিল পাহাড়ের দিক থেকে…জলাভূমি পেরিয়ে চলে গিয়েছিল দীঘির দিকে।
মেয়েটি বলল, ড্রাগনটা গিয়েছিল ঐখান দিয়ে।
কোয়ারেল বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকাল।
বন্ড পদচিহ্ন ধরে কিছুটা এগিয়ে গেল। ছাপের বাইরের দিকটা যথেষ্ট মসৃণ ও ভেতরদিক বাঁকানো। গাড়ির চাকায় এরকম দাগ হতেও পারে, কিন্তু দাগগুলো খুব বড়–চওড়ায় অন্তত দু ফুট। মাঝখানের দাগটা একই আকৃতির, তবে মাত্র তিন ইঞ্চি চওড়া, মোটরের চাকার দাগের মতই। বেশ টাটকা ছাপ। একেবারে সরলরেখায় সামনের দিকে চলে গেছে, আর পথে যে সব ঝোঁপ ছিল সেগুলো এমন পিষে গেছে, যেন একটা ট্যাংক গড়িয়ে গিয়েছে।
বস্তু বুঝতে পারল না কি ধরনের গাড়ির চাকা এ রকম দাগ সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য যদি সেটা আদৌ গাড়ি হয়ে থাকে। মেয়েটা কনুইয়ের ধাক্কা দিয়ে বলল, বলেছিলাম না। তখন সে কেবল চিন্তিতভাবে বলল, দেখ হানি, এটা যদিও ড্রাগন না, তবে এমন কোন জিনিস যা আগে কখনও আমি জীবনে দেখিনি।
আরেকটু এগিয়ে মেয়েটা জামার হাত ধরে টেনে চাপা গলায় বলল, ঐ দ্যাখ। যে পথ দিয়ে পদচিহ্নটা চলে গেছে, তারই পাশের একটা ঝোঁপের দিকে আঙুল দেখাল সে। ঝোঁপটা পুড়ে কালো হয়ে গেছে, একটাও পাতা নেই। মাঝখানে একটা পাখির বাসার দগ্ধাবশেষ দেখা যাচ্ছে। সে ওটার ওপর নিঃশ্বাস ফেলেছিল।
বন্ড ঝোঁপটার কাছে এগিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করল। সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ঠিক এই ঝোঁপটাকে পোড়ানো হল। কেন? অদ্ভুত ব্যাপার।
পায়ের ছাপটা ঘুরে দীঘির দিকে এগিয়ে গেছে। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেছে দীঘির পানিতে। বন্ড চাইছিল চিহ্নগুলোকে আরো অনুসরণ করতে। কিন্তু লতাপাতার আড়াল থেকে বেরোল চলবে না। তারা হেঁটে চলল।
পাউরুটির মত গুয়ানোর পাহাড়টার পেছনে দিনটা প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এমন সময় মেয়েটা ঝোঁপের ফাঁক দিয়ে আঙ্গুল তুলে দেখাল। বন্ড দেখল একটা লম্বা বালুচর নেমে গেছে দীঘির পানিতে। তার মেরুদণ্ড বেয়ে ঘন সামুদ্রিক আঙ্গুরের ঝোঁপ আর মাঝখানে অর্থাৎ দীঘি থেকে প্রায় একশ গজ দূরে একটা খড়ের কুটিরের ধ্বংসাবশেষ। রাত কাটানোর পক্ষে বেশ আকর্ষণীয় জায়গাটা। দু দিক পানির গণ্ডি দিয়ে সুরক্ষিত।
গরম হাওয়াটা থেকে গেছে। দীঘির নরম পানি যেন আহ্বান জানাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্গন্ধে ভরা নদী আর জলাভূমির কাদা ঠেলে হাঁটবার পর গায়ের নোংরা শার্ট খুলে, সর্বাঙ্গ ধুয়ে নিয়ে শুকনো কঠিন বালির ওপর একবার শুয়ে পড়তে পারলে কি স্বর্গীয় আনন্দই না পাব। তারা পৌঁছল বালুচরটা যেখানে শুরু হয়েছে, তারপর একটা সরু পথ বেয়ে চলতে লাগল। সেই খড় পাতার কুঁড়ে ঘরটার ধ্বংসাবশেষ যেখানে তারা সেখানে পৌঁছল। রহস্যময় বিরাট পদচিহ্নগুলো পানি থেকে উঠে এসে খোলা জায়গাটা ও আশেপাশের ঝোঁপের ওপর দিয়ে এমনভাবে চলে গেছে, বোঝা যায় বস্তুটি সেই জায়গাটি ছারখার করে দিয়ে গেছে।
প্রবালের চাঙড়া দিয়ে তৈরি একটা চুলা ভেঙে পড়ে আছে। কয়েকটা বাসনপত্র ও খালি টিন ছড়ানো। ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে কোয়ারেল শুয়োরের মাংস আর বরবটির দানার দুটো টিন আবিষ্কার করল। মেয়েটা পেল একটা কোঁচকানো ঘুমোবার থলে আর বন্ড খুঁজে পেল একটা চামড়ার মানিব্যাগ। তার মধ্যে পাঁচটা এক ডলারের নোট, তিনটে জ্যামাইকান পাউন্ড আর কিছু খুচরো পয়সা। ওয়ার্ডেন দু জন নিশ্চয়ই তাড়াহুড়ো করে পালিয়েছে।
জায়গাটা ছেড়ে আরেকটু এগিয়ে একটা উন্মুক্ত বালুময় জায়গায় পৌঁছাল তারা তিনজন। ঝোঁপের ভেতর দিয়ে তারা পানির ওপারে পাহাড়ের গায়ে আলো চিকমিক্ করতে দেখল।
বন্ড বলল, যতক্ষণ না আলো জ্বালাই ততক্ষণ আমরা নিশ্চিন্ত। প্রথমেই ভাল করে গোসল করতে হবে। হানি, তুমি এদিকটায় থাক, আমরা বালুচরের অন্যদিকে যাই। আধঘণ্টা পরে নৈশভোজের সময় আবার দেখা হবে।
মেয়েটা হাসল, তোমরা জামাকাপড় পরবে না, নাকি?
নিশ্চয়ই, বন্ড বলল, এবার প্যান্ট পরতে হয়। কোয়ারেল বললে, ক্যাপ্টেন, আলো থাকতে থাকতে আমি টিনগুলো খুলে ফেলি আর রাত্রের সব ব্যবস্থা করে নিই। পিঠের ব্যাগ খুলে, এই নিন আপনার প্যান্ট আর রিভলবার। রুটিগুলো দেখে ভাল মনে হচ্ছে না, তবে ভেজার বেশি কিছু হয়নি। খেতে ভালই লাগবে আর ভোরের আগে শুকিয়ে যাবে বোধহয়। টিনের খাবারগুলো এখন খেয়ে নিই। শুয়োরের মাংস আর পনীরটা কালকের জন্য রেখে দিই। কারণ কাল অনেকটা হাঁটতে হবে।
