বন্ডের পকেটের মধ্যে নিজস্ব দশ লক্ষ –তবে পুরান ফ্রা–মানে মোট সাতশ পাউন্ডের মত। বন্ড সব সময় পুরানো ফ্রতে নিজস্ব সম্পত্তির হিসেব করত–তাতে নিজেকে খুব ধনী বলে মনে হল। অন্য দিকে অফিসের খরচ সে চালায় নতুন ফ্র থেকে তাতে খরচগুলি বেশ কমসম দেখায়। তবে হেডকোয়ার্টার্সের প্রধান হিসাবরক্ষক সাহেব বোধহয় সেগুলিকে অনেক বেশি মনে করত। দশ লক্ষ ফ্রা। আজ রাতে সে হয়েছে লক্ষপতি। তাই কাল ভোরে থাকতে পারবে কি?
বন্ড হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ দেখল, আরে ঐ তো আমার দেখা সেই ল্যাসিয়া গাড়িটা। ওটা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সিঁড়ির নিচের মোরাম বিছানো স্থানটার উপর। আর ডোরা কাটা ওয়েস্ট কোট ও সবুজ অ্যাপ্রনধারী একজন। কর্মচারি তার কাছ থেকে দুটো সুইকেস নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলেছে, যেখানে যাতায়াত করে সেই দরজার দিকে।
তা বটে।
গাড়ি রাখার জায়গায় বন্ড অজস্র অনেক মূল্য দিয়ে গাড়ির সারিতে নিজেরটিকে পার্ক করে রেখে দিল। এখন সেই কর্মচারিকেই ডেকে বলল তার মালপত্র উঠিয়ে আনতে ও রিসেপশন-ডেস্কের দিকে চলে গেল। ম্যানেজার সাহেব সুনিপুণভাবে কেরানীটিকে পার করে বন্ডকে সাদরে সম্বোধন জানালেন–একগাদা সোনা বাঁধানো দাঁতের বিকাশ আন্তরিকভাবে। অবশ্য একইভাবে তিনি মনে মনে ঠিক করে নিলেন অবিলম্বে পুলিশের প্রধান কর্তাকে বন্ডের আসার খবর জানিয়ে বাহাদুরি করতে হবে।
ভাল কথা মশিয়ে মরিস, বন্ড বলল, যে ভদ্রমহিলাটি এই সবে সাদা বর্ণের ল্যাসিয়াতে করে পৌঁছে গেলেন, তিনি কে হবেন? তিনি কি এখানেই থাকবেন ঠিক করেছেন?
প্রিয় কমান্ডার সাহেব এটাই ঠিক। উৎসাহের তোরে ম্যানেজারটি আর দুটো দাঁত বের করে ফেললেন। এই ভদ্রমহিলা অনেক পুরোন খদ্দের আমাদের। দক্ষিণ ফ্রান্সের খুব বড় ব্যবসায়ী ওর বাবা। এ মহিলাটির নাম হল ল্য কতে তেরেসা ডি ভিকেনাজা। এর সম্পর্কে মনে হয় কাগজে পড়ে থাকবেন। মাদাম ল্য কতে হলেন সেই ধরনের একজন মহিলা, কি বলব, একটু গোপনে, তিনি নিভৃতভাবে হেসে ফেললেন, যারা জীবনটাকে যাকে বলে সম্পূর্ণ ভোগ করে যেতে চান।
ধন্যবাদ, তাই নাকি। তা এই সিজনটা আপনার কেমন কাটল? খুব গল্প গুজব করতে করতে ম্যানেজার স্বয়ং বন্ডকে লিফটে করে নিয়ে গেল সাদা ও ধূসর বর্ণের ঘরে। ওখানে চাদরটা আবার গোলাপী রং-এর, আর বন্ডের এই ঘরটার কথাই মনে পড়ে গেল। তারপর আরো কিছু সৌজন্য বিনিময়ের পর ঘরে জেমস বন্ড ছাড়া আর কেউ থাকল না। বন্ড একটু হতাশ হয়ে পড়ল, মেয়েটিকে যেন একটু অধিক উচ্চ মনে হল–চিত্রতারকা বা অন্য কোন মেয়ে, যারা জনগণের সম্পত্তিতে পরিবর্তিত হয়েছে–তাদের বন্ড ঠিক পছন্দ করত না, তার ভাল লাগল নিঃসঙ্গ মেয়েদের। যাদের তিনি নিজে সনাক্ত করতে পারেন, আপন করে নিতে হবে। সে বলে দিত যে এর পেছনে হয়ত উন্নতির বিপরীত কোন মনোবৃত্তি কাজ করছে। হয়ত মনে হবে, আরেকটু হীন হয়ে বলতে গেলে যে সব বিখ্যাত মেয়েদের পাওনাটাও নেহাতই কঠিন বলে তার এই মনের ভাব। উপরে নিয়ে এল তার দুমড়ানো সুটকেসটা। বন্ড অতি ধীর ভাবে নিজের জিনিস পত্র সব গুছিয়ে নিয়ে বেয়ারাকে বলল এক বোতল টাই টিনজার ব্লা দ্য ব্লাজ মদ আনাতে। রয়েলে চিরকাল। বন্ড এই পানীয়টাই খেয়ে থাকে। বোতলটা এল খুব ঠাণ্ডা সাদা পাত্রে। বন্ড তাড়াতাড়ি সিকি বোতল শেষ করে বাথরুমে ঢুকে গেল। তারপর ভীষণ ঠাণ্ডাপানিতে গোসল করে নিল। শ্যাম্পুর রাজা পিনো এলিবক্সার দিয়ে মাথাটা পরিষ্কার করে নিল। তারপর ডিপ নীল রঙের ট্রপিক্যাল উস্টেড ট্রাউজার্স, সাদা সী-আই ল্যান্ড সুতীর জামা, মোজা, আর কালো ক্যাজুয়াল জুতা পরে জানালার ধারে বসল। ফাঁকা জায়গাটা ওপারে, সে ভাবতে বসল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে–রাতে কোথায় বসে খাওয়া যায় এবং কি খাবে?
তবে ঠিক ভোজন রসিক যাকে বলে বন্ডকে তা অবশ্য বলা যায় না। যখন সে ইংল্যান্ডে থাকত নেহাৎ অতি সাধারণ খাবার দিয়েই সে দিন চালিয়ে নিত। কিন্তু বিদেশে যখন থাকত বা বেড়াতে যেত খাওয়ার সময় টুকুকে মনে হত কিছুক্ষণের ছুটির মতন। সারা দিন সে উৎসাহ নিয়ে গাড়ি চালাত, পথে কত বিপদের কাছ থেকে সরে যাওয়া বা পাশ কাটানো, সারাদিনের একটা চিন্তা যে তার গাড়ির যন্ত্রগুলি সব ঠিক আছে কিনা–এই সব কিছু থেকে কিছুক্ষণের বিরতি। ইটালীর সীমানায় ভেন্টিমিগলিয়া থেকে তিন দিনে এই লম্বা পথটা অতিক্রমেই সে দেখেছিল পেটুক টুরিস্টদের পকেট হাতাবার সব অজস্র ফাঁদ। দেখে দেখে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবে ঠিক এই জন্যই আপাততঃ সে টাইটিনজারে মৃদু চুমুক দিয়েই এই অঞ্চলের সব ভোজনালয়ের সব খুঁটিনাটি, মনে মনে বিচার করে স্থির করতে চেষ্টা করছিল যে কোথায় খাবে আর কি কি খাবারের কথা বলে দেবে।
তবে শেষ অবধি বন্ড তার প্রিয় রেস্তোরাঁগুলির একটিতে যাবে বলেই মনে মনে ঠিক করে নিল। অতি সাধারণ বলে মনে হল একটি রেস্তোরাঁ, অজায়গায় মানে এতে পলস স্টেশনের বিপরীত দিকে অবস্থিত। সে তার পুরানো বন্ধু মশিয়ে বেকো-কে ফোন করে একটা টেবিল একদম নিজের করতে অর্ডার দিয়ে দিল। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে মোটরগাড়ি চালিয়ে নিয়ে ক্যাসিনোতে ফিরে আসছিল। তার পেটের ভিতর তখন গজগজ করছে টারবট মাছের পোচ্, মুসলিন সস্ এবং তার জীবনের সেরা অর্ধেক পাজি পাখির রোস্ট। খুব উৎসাহিত বলে মনে হচ্ছে বন্ডকে। তার মেজাজকে খুশি করে দিয়ে তিনটি কাপ কফির সাথে ১৯৫৩ সালের বোতল মুতোন রথ চাইল্ড এবং মাত্র এক গ্লাস দশ বছরের পুরানোনা চ্যালভাডোস্ মদ। ফুর্তির সাথে ক্যাসিনোর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে বন্ড কেমন যেন খুব নিশ্চিন্তভাবে বুঝে যাচ্ছে যে আজ রাতটা তার জীবনে খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
