পানির তলায় কাদার ওপর মাথা রেখে বন্ড বাঁ হাতে তার নাক টিপে ধরে আছে আর ঠোঁট দিয়ে চেপে আছে নলটিকে। সেবার তাদের খুঁজে পায়নি। এবারেও কি তারা বেঁচে যেতে পারবে? অনুসন্ধানকারীটি যদি এই ঘোলা গাঢ় খয়েরী ছোপ দেখতে পায়, তবে কি সে পানির মধ্যে গুলি বা ছোরা চালাবে? কি রকম অস্ত্র থামবে তার হাতে? বন্ড ঠিক করল এবার সে ঝুঁকি নেবে না। তার কাছাকাছি পানির মধ্যে নড়াচড়ার লক্ষণ পেলেই সে উঠে গুলি চালাবে। দেখা যাক কি হয়।
শুয়ে শুয়ে বন্ড তার প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে তুলল। কি অসহ্য। আর তার চেয়েও বেশি পাগল করে তুলেছে। চিংড়ি মাছের মৃদু ঠোকর। তবে মেয়েটার মাথা থেকে এ বুদ্ধিটা ভালই বেরিয়েছে।
হঠাৎ বন্ড সিটিয়ে গেল। একটা রবারের বুট তার পায়ের ওপর এসে পড়ল এবং পরক্ষণেই সরে গেল। লোকটা কি তার পা-কে একটা গাছের ডাল ভেবেছে। সে ঝুঁকি নিতে চাইল না। মুখ থেকে বাশের নলটা ফেলে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
বন্ড এক পলকের জন্য দেখতে পেল তার মাথার ঠিক ওপরে একটা বিশাল শরীর এবং একটা ছুটে আসা রাইফেলের কুঁদো। সে মাথা বাঁচাবার জন্য বাঁ হাত তুলে ধরল। হাতে এসে লাগল একটা জোর আঘাত। একই সঙ্গে বন্ডের রিভলভারের নল লোকটার ডানদিকের বুক স্পর্শ করল, ট্রিগার টানল সে।
লোকটার শরীরের বিরুদ্ধে রিভলভারের বিস্ফোরণের ধাক্কায় বন্ডের কব্জি প্রায় ভেঙে গেল। কিন্তু লোকটাও সঙ্গে সঙ্গে কাটা কলাগাছের মত পানির ভিতর ছিটকে পড়ল। ডুবে যাবার আগে বন্ড দেখতে পেল তার শরীরের একপাশে বিরাট গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছে। গামবুট পরা পা জোড়া একবার সজোরে নড়ে উঠল আর পানির ওপর ভেসে উঠল একটা মুখ–চীনে নিগ্রোর মুখ। চোখদুটো উল্টে গেছে। নির্বাক বিস্ফারিত মুখ গহ্বর থেকে পানি বেরিয়ে আসছে। তারপর আবার মাথাটা ডুবে গেল। আর কিছুই দেখা গেল না, রইল শুধু কাদামাখা অনেকটা ফেনা আর পানির ওপর রক্তের ছোপ।
বন্ড নিজেকে একবার ঝুঁকিয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। কোয়ারেল আর মেয়েটা তার পাশে দাঁড়িয়ে। তাদের শরীর থেকে অজস্রধারে পানি ঝরে পড়ছে। কোয়ারেলের মুখে হাসি কিন্তু মেয়েটা মুখে হাত চেপে আতংকভরা চোখে তাকিয়ে আছে রক্তরাঙা পানির দিকে।
বন্ড বলল, আমি দুঃখিত, হানি। এটা করা ছাড়া উপায় ছিল না। লোকটা আমাদের গায়ের ওপর এসে পড়েছিল।
এসো, যাওয়া যাক। ঝোঁপঝাড়ের সুড়ঙ্গ পেরিয়ে খোলা নদীতে পৌঁছানোর আগে তারা থামল না।
বন্ড ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সেটা তিনটে বেজে বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বোধহয় চারটে। সহসা বন্ড ক্লান্তি অনুভব করল। সে একটু গোলমাল করে ফেলেছে। গুলির আওয়াজ অন্য লোকগুলো না শুনে থাকলেও তার অনুপস্থিতি ধরা পড়বে সবাই একত্র হলেই। তারা কি সঙ্গে সঙ্গে নিরুদ্দিষ্টের খোঁজে ফিরে আসবে? না, লোকটির অনুপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হতেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে। পরদিন সকালে তারা আসবে। কুকুরগুলো সহজেই খুঁজে পাবে মৃতদেহটাকে আর তারপর কি হবে? মেয়েটা বন্ডের জামার হাত ধরে টানল। রাগের সঙ্গে বলল, এবার আমাকে বলতেই হবে এসব কি হচ্ছে? কেন তোমরা সবাই সবাইকে খুন করতে চাইছ? আর তুমিই বা কে? রিভলভার নিয়ে কেউ পাখির খোঁজে আসে না।
বন্ড বলল, আমি দুঃখিত, হানি। আজ সন্ধ্যায় ক্যাম্পে তোমাকে সবকিছু বলব। তোমার নেহাৎ দুর্ভাগ্য যে আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছ। এই লোকগুলোর সঙ্গে আমার যুদ্ধ চলছে। তবে আর কাউকে আহত না করে এই দ্বীপ থেকে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার অন্য কোন ইচ্ছে নেই। আবার সোজা পথ ধরে এই দ্বীপে সার মত তথ্য আমার হাতে এসে গেছে।
তার মানে তুমি পুলিশম্যান নাকি? তুমি কি এই চীনেটাকে জেলে পুরতে চেষ্টা করছ?
অনেকটা তাই। তুমি ন্যায়ের দিকেই আছ। এবার তুমি একটা কাজের কথা বল। পাখিওয়ালাদের তাঁবুটা এখান থেকে কতদূর?
এক ঘণ্টার রাস্তা।
লুকোবার পক্ষে জায়গাটা কেমন? সেখানে কি আমাদের সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
সে চেষ্টা করলে তাদের বড় দীঘি বা নদীর ওপর দিয়ে আসতে হবে। ড্রাগনটা কিন্তু পানির ওপর দিয়ে চলতে পারে।
তা বেশ তো, আশা করি আজ তার ল্যাজে ফোঁড়া বা আর কিছু হয়েছে।
আচ্ছা, সবজান্তা মশাই। দেখা যাবে।
কোয়ারেল ছপছপিয়ে ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এল, তার হাতে রাইফেল। বলল, আরেকটা বন্দুক থাকলে ক্ষতি নেই। ক্যাপ্টেন, মনে হয় এটা কাজে লাগবে।
বন্ড বন্দুকটা হাতে নিল। আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর রেমিংটন কারবাইন, ৩০০; এ লোকগুলো উপযুক্ত অস্ত্রই ব্যবহার করে। সে বন্দুকটা ফিরিয়ে দিল।
বন্ডের চিন্তার যেন প্রতিধ্বনি শোনা গেল কোয়ারেলের কথায়। বলল, লোকগুলো চালাক আছে, ক্যাপ্টেন। এই লোকটা অন্যদের পেছন পেছন লুকিয়ে আসছিল, যাতে কুকুর চলে যাবার পর আমরা ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরোলেই ধরে ফেলতে পারে। মহা ধাড়ীবাজ ঐ ডাক্তার লোকটা।
যা তিনি যে এক আশ্চর্য মানুষ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এবার রওনা হওয়া যাক। হানি বলছে ক্যাম্পটা এখান থেকে একঘন্টার রাস্তা। নদীর বাঁ দিক ঘেষে যাওয়াই ভাল, যাতে আমরা পাহাড়ের আড়ালে থাকি। ওরা নিশ্চয়ই দূরবীনে নদীর ওপর নজর রাখছে। বন্ড হাতের রিভলবার কোয়ারেলকে দিল এবং সে সেটাকে পিঠের ভেজা ব্যাগে ভরে চলতে শুরু করল।
