কোয়ারেল বলল, ওরা স্রোত বেয়ে আসবে, ক্যাপ্টেন। ওরা জানে যে আমরা যদি বেঁচে থাকি তবে নদীর উৎসের দিকে ছাড়া যাওয়ার রাস্তা নেই। খুব সম্ভবত বোটটা একটা ডিঙি নিয়ে নদী বেয়ে আসবে। তারপর কুকুর আর লোজন নামবে তার থেকে।
হানি বলল, আমাকে খোঁজবার সময়ওতো ওরা ঠিক তাই করে। এতে ভয়ের কিছু নেই। একটা বাঁশের নল কেটে নিতে হবে। ওরা কাছাকাছি এসে পড়লে পানির তলায় ডুবে ঐ নলের সাহায্যে নিঃশ্বাস নেবে, যতক্ষণ না ওরা চলে যায়।
বন্ড কোয়ারেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তুমি বরং নলগুলো জোগাড় কর, আর আমি একটা ঘন ঝোঁপ খুঁজে বার করি।
কোয়ারেল অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়ল। স্রোত ঠেলে এগিয়ে গেল বাশবনের দিকে। এ পর্যন্ত বড় মেয়েটার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে রেখেছিল। এবার মেয়েটি বলল, আমার দিকে না তাকানোর জন্য তোমাকে অত সাবধান হতে হবে না। তুমি নিজেই তো বললে, এরকম সময় ওসব কথা মনে আনতে নেই।
বন্ড ঘুরে তার দিকে তাকাল। মেয়েটার ছেঁড়া শার্ট নেমে এসেছে পানি পর্যন্ত। তার নিচে অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তার সাদা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সুন্দর মুখটা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
বন্ড যা চাইছিল তা পেয়ে গেল। ঘন, গভীর ঝোঁপঝাড়ের দেওয়ালের মধ্যে একটা ফাটল। একটুও পানি ভাঙে না যেন, বলে সে পানি কেটে ভেতরে ঢুকে গেল মাথা নিচু করে। প্রণালীটা দশ গজ লম্বা। তাদের পায়ের তলার কাদা আরো নরম, আরো গম্ভীর হতে লাগল। তারপর একটা শক্ত শেকড়ের দেওয়াল উঠে গেছে। তারা আর যেতে পারল না।
মেয়েটি কাঁপা গলায় বলল, এবার আসল লুকোচুরির খেলা।
হ্যাঁ ঠিক বলেছ। বন্ড নিজের রিভলভারটির সম্বন্ধে ভাবছিল। এতক্ষণ পানিতে ভিজবার পর এটা থেকে গুলি বেরোবে কিনা। এটা দিয়ে কটা কুকুর আর ক জন লোক ঘায়েল করতে পারবে সে। মেয়েটার সঙ্গে দেখা হয়ে বড় বাজে ব্যাপার হল। যুদ্ধের সময় একটা মেয়ে থাকা মানেই শত্রুর সামনে বাড়তি লক্ষ্যবস্তু এনে দেওয়া, যেটাকে সারাক্ষণ আড়াল করতে হবে।
বন্ডের পানি তেষ্টা পেয়েছে। সে একটু পানি তুলে নিয়ে চেখে দেখল মাটির গন্ধ মেশানো লবণাক্ত পানি। মন্দ নয়, আরেকটু খেল। মেয়েটা বাধা দিল, বেশি পানি খেও না, কুলকুচি করে ফেল, নইলে জ্বর এসে যাবে।
নদীর মধ্যে কোন এক জায়গা থেকে কোয়ারেল শিস দিল। বন্ড তার জবাব দিয়ে পানি কেটে সেদিকে এগিয়ে গেল। ঝোঁপের যে সব শেকড়ে তাদের গায়ের ঘষা লেগে থাকতে পারে, কোয়ারেল সেগুলোকে ধুয়ে দিল। আমাদের গায়ের গন্ধ ধুয়ে দিচ্ছি। এক মুঠো বাঁশের টুকরো বার করে কেটে ঠিক করল। বন্ড তার রিভলভার ও বাড়তি কার্তুজগুলো ঠিকঠাক করে নিল। স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল যাতে পানি আর ঘোলা না হয়।
কুকুরের ডাক কানে যেতে তারা স্বস্তিই পেল।
.
ড্রাগনের পায়ের ছাপ
অনুসন্ধানকারী দলটি দ্রুত নদী বেয়ে এগিয়ে আসছে। দু জন লোক, পরনে সাঁতারের হাফপ্যান্ট ও পায়ে উঁচু গামবুট। কুকুরগুলোর সঙ্গে তাল রেখে চলতে তাদের প্রায় দৌড়তে হচ্ছিল। বিশালকায় দুই চীনে নিগ্রো, তাদের কাঁধের সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বাধা পিস্তলের খাপ এসে পড়েছে ঘর্মাক্ত, অনাবৃত বুকের ওপর। তাদের সামনে একপাল বিরাট বিরাট ডোবারম্যান পিশার কুকুর উত্তেজিতভাবে ডাকতে ডাকতে সাঁতার কেটে এগোচ্ছে। তারা গন্ধ পেয়েছে, বন্ডদের পাগলের মত খুঁজছে।
একশালা কুমীরের গন্ধ পেয়েছে বোধহয়। সামনের লোকটা গোলমালের মধ্যে চিৎকার করে বলল। অন্য লোকটা উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে বলল, আমার মনে হয় ঐ শালা ইংরেজটার গন্ধ। বাজি রেখে বলতে পারি ঐ শালা ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে আছে। দেখিস শালা যেন আড়াল থেকে গুলি না করে। লোকটা খাপ থেকে অস্ত্র বার করে বগলের তলায় রাখল।
এবার তারা ঝোঁপঝাড়ের সুড়ঙ্গে ঢুকল। সামনের লোকটা এসে পড়ল সেই ফাটলটার কাছে। একটা কুকুরকে কলার ধরে সে ফাটলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। কুকুরটা একটা ব্যগ্র চাপা গর্জন করে ছপছপিয়ে এগিয়ে এল। লোকটা চোখ কুঁচকে দেখতে লাগল প্রণালীর দু-ধারের গাছের শেকড়ের গায়ে কোন আঁচড়ের দাগ আছে কিনা।
কুকুর এবং লোকটা প্রণালীর শেষ প্রান্তে পৌঁছল। সেখানে পানিটা চারদিকে আটকে গিয়ে একটা ছোট জলাশয়ের সৃষ্টি করেছে। লোকটা বিরক্তভাবে চারদিকে দেখে কুকুরটার কলার ধরে টানতে টানতে ফিরে চলল। মোটেই কুকুরটা যেতে চাইছে না। লোকটা চাবুক দিয়ে সজোরে পানির ওপর আঘাত করল।
দ্বিতীয় লোকটা ফাটলের মুখে অপেক্ষা করছিল। তারপর তারা আবার স্রোত বেয়ে এগিয়ে চলল, সামনে চলল কুকুরের দল।
পাঁচ মিনিট পরে ঝোঁপের মধ্যে সেই ছোট্ট জলাশয়টায় কোন স্পন্দন দেখা গেল না। তারপর এক কোণে, শেকড়বাকড়ের ভেতর থেকে জেগে উঠল পেরিস্কোপের মত একটা বাঁশের নল। তারপর ভেসে উঠল বন্ডের মুখ। সমস্ত কপালের ওপর ভেজা চুল লেপটে রয়েছে, যেন এক ভেসে ওঠা মৃতদেহের মুখ। পানির তলায় তার ডানহাতে রিভলবার তৈরি।
খুব মন দিয়ে শুনতে লাগল সে, চারদিক নিস্তব্ধ। কিন্তু নদীর দিক থেকে ভেসে আসা মৃদু শব্দটা কিসের? কেউ কি খুব আস্তে পানি কেটে চলেছে? বন্ড হাত বাড়িয়ে তার দু দিকে শেকড়ের তলায় শুয়ে থাকা শরীর দুটোকে স্পর্শ করল। মুখ দুটো পানির ওপর ভেসে উঠতেই বন্ড ঠোঁটে আঙুল রাখল। কিন্তু ততক্ষণে কোয়ারেল সশব্দে কেশে উঠে থুতু ফেলেছে। সব চুপচাপ। তারপর আবার সেই মৃদু শব্দটা শোনা গেল। কে যেন আসছে ছোট প্রণালীটা বেয়ে। বাঁশের নলগুলো আবার তিনটি মুখে ঢুকে পড়ল এবং মাথাগুলো আস্তে আস্তে পানির তলায় ডুবে গেল।
