সামনে কোয়ারেলকে দেখে বন্ড মেয়েটার কাঁধ থেকে হাত নামাল। ততক্ষণে দু জনে পৌঁছে গেছে সেখানে। দেখা গেল মেয়েটার নৌকা বুলেটের আঘাতে প্রায় দু টুকরো হয়ে গেছে। মেয়েটা হতাশ হয়ে বলল, আমার নৌকা। আমি এখন ফিরব কিসে?
চিন্তার কিছু নেই, মিস, নৌকা হারানোর শোকটা বন্ডের চেয়ে কোয়ারেল বেশি বুঝতে পারল। ক্যাপ্টেন তোমাকে একটা কিনে দেবে। আর ফেরবার সময় তুমি আমাদের নৌকায় যেতে পারবে। ঐ ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে আমাদের নৌকাটা ঠিক আছে। কোয়ারেল বন্ডের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখতে পেল। বলল, ক্যাপ্টেন, দেখলেন তো লোকগুলো কেমন? ভীষণ শক্ত মানুষ ওরা, আর কাজ জানে। ঐ কুকুরগুলো পুলিশের কুকুর–নাম পিনশার। বিরাট জানোয়ার। আমার এক বন্ধু বলেছিল এদের কাছে নাকি কুড়িটারও বেশি ঐ জাতের কুকুর আছে। আমাদের চটপট মতলব ভাজতে হবে।
ঠিক আছে কোয়ারেল। কিন্তু আগে কিছু খেতে হবে। আর এই দ্বীপটাকে ভালভাবে দেখবার আগে আমাকে কিছুতেই ভয় দেখিয়ে তাড়াতে পারবে না। হানি আমাদের সঙ্গেই থাকবে। তোমার কোন অসুবিধা হবে না তো হানি? তারপর আমরা একসাথে ফিরব।
মেয়েটি দ্বিধার সঙ্গে তার দিকে তাকাল, এছাড়া অন্য কোন উপায়ও তো দেখছি না। মানে, তোমাদের অসুবিধা হলে আমার ভালই লাগবে। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তো? পাখিগুলো দেখে নিতে তোমার কত সময় লাগবে?
বন্ড বলল, বেশিক্ষণ নয়। আমি দেখতে চাই তাদের কি হয়েছে আর কেন হয়েছে। তারপরেই আমরা পালাব। বারটা। তুমি এখানেই অপেক্ষা কর। গোসলটা করে নিতে পার। ঘুরে বেড়িয়ে বালিতে পায়ের ছাপ ফেল না। এসো কোয়ারেল, আমরা বরং নৌকাটাকে আরো ভালভাবে লুকিয়ে রাখি।
সব কাজ শেষ করতে তাদের একটা বেজে গেল। বন্ড আর কোয়ারেল নৌকাটাকে বালি আর পাথর দিয়ে ভর্তি করে ঝোঁপের মধ্যে অগভীর পানিতে ডুবিয়ে দিল। তাদের পায়ের ছাপ সব মুছে দিল। সঙ্গে আনা খাবারের কিছুটা খেয়ে নিল তারা। মেয়েটা অল্প কিছু খেল। তারপর তারা পাথর ডিঙিয়ে নদীগর্ভের অগভীর পানিতে গিয়ে পড়ল। পানির ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল সমুদ্রতীর থেকে তিনশ গজ দূরে নদীর উৎসের দিকে।
ভীষণ গরম। উত্তর পূর্বদিক থেকে একটা রুক্ষ হাওয়া বইছে। কোয়ারেল বলল এটা গুয়ানেরার পক্ষে অতি প্রয়োজনীয়, সারা বছর ধরেই এই হাওয়াটা নাকি বয়।
নদীর মুখে খানিকটা বালিভর্তি জায়গা। তারপরেই একটা লম্বা, গভীর, নিস্তরঙ্গ জলাশয়। কাপড় না খুললে তারা ভিজে যাবে। বন্ড বলল, হানি, এ সময়ে লজ্জা করলে চলবে না। আমরা কেবল শার্ট পরে থাকব সূর্যের তাপের জন্য। আমাদের পিছু পিছু এসো।
মেয়েটির জবাবের অপেক্ষায় না থেকে পুরুষ দু জন তাদের প্যান্ট খুলে পিঠের ন্যাপস্যাকে পুরল।
পানি কেটে চলল তারা। প্রথমে কোয়ারেল, তারপর বন্ড ও সবশেষে মেয়েটি। বন্ডের কোমর পর্যন্ত পানি। একটা বড় রূপালি মাছ পানি থেকে লাফিয়ে উঠেই আবার ডুব দিল। অন্যান্য মাছ এদিক ওদিক ছিটিয়ে পড়তে লাগল। টারপন মাছ। বলল কোয়ারেল।
নদী ক্রমশ ছোট হয়ে এল। দুদিকের ঝোঁপঝাড় পরস্পরকে স্পর্শ করল। কিছুক্ষণের জন্য তারা যেন একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে চলল। তারপর আবার নদীটা চওড়া হয়ে একটা গভীর আঁকাবাঁকা প্রণালীতে রূপ নিয়েছে। নদীগর্ভ কাদায় ভর্তি, প্রতি পদক্ষেপে তাদের পা বসে যেতে লাগল। বার বার তাদের থেমে পড়ে পা থেকে জোক ছাড়াতে হচ্ছে। বন্ডের। ঠাণ্ডা, শান্ত ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে হাঁটতে ভাল লাগল। দেখতে দেখতে অনেকটা দূরে এসে পড়ল তারা। এবার মার্শ গ্যাসের পচা ডিমের মত গন্ধ পাওয়া গেল। গাছপালার সংখ্যা কমে আসছে। নদী অনেক চওড়া হয়ে গেছে, পানি আরো অগভীর আর নদী গর্ভ আরো শক্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাঁক ঘুরে খোলা জায়গায় পৌঁছল। হানি বলল, এবার সাবধান হওয়া দরকার। আর এক মাইল এই রকম চলেছে, নদী সরু হয়ে মিশেছে বড় দীঘিটার সঙ্গে। তারই কাছে পাখিওয়ালা দুজন থাকত।
নদীর দু ধারে গাছের সারি। তারই ছায়ায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকাল তারা। নদীটা এঁকেবেঁকে দ্বীপের কেন্দ্রস্থলের দিকে চলে গেছে। দু ধারের নিচু বাঁশঝাড় আর সামুদ্রিক আঙুর গাছ তাদের অর্ধেকের বেশি আচ্ছাদন দিতে পারবে না। পশ্চিম কূল থেকে জমিটা প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর খাড়া উঠে গিয়ে দু মাইল দূরে একটা পাউরুটির আকার ধারণ করেছে। ঐটাই গুয়েনারা। পাউরুটির চুড়োটা সাদা, যেন বরফ জমেছে। সেখান থেকে গুড়ো গুয়ানোর ধোঁয়া উঠছে। বন্ড দেখল সাদা চুড়োর সামনে কালো ফুটকির মত কয়েকটি পাখি। তারা নামছে, উঠছে যেন একদল মৌমাছি মৌচাক ঘিরে উড়ছে। পাহাড়টার পাদদেশে কয়েকটি কুটির আর একটা কাঁচা রাস্তা। বোধহয় গুয়ানো বয়ে আনার জন্য।
বন্ড দাঁড়িয়ে দেখল দূরে পাখির নোংরার চকচকে পাহাড়টাকে। এই তাহলে ডক্টর নোর রাজত্ব। বন্ডের মনে হল পাণ্ডব বর্জিত জায়গা।
বন্ড পূর্বদিকে তাকাল। সেখানকার জলাভূমির ঝোঁপঝাড়গুলো আশ্রয় নেওয়ার পক্ষে আরও ভাল।
কোয়ারেলের ডাকে বন্ডের চিন্তা স্রোত বন্ধ হল। তারা আসছে, ক্যাপ্টেন।
কোয়ারেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে বন্ড দেখল দূরের কুটিরগুলো থেকে একটা বড় লরী বেড়িয়ে আসছে। বন্ডের চোখ লরীটাকে অনুসরণ করল যতক্ষণ না সেটা নদীর অপর প্রান্তে ঝোঁপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। বাতাসে ভেসে এল কুকুরের ডাক।
