ডিজেল দুটোর ধকধক আওয়াজ আরও স্পষ্ট হল। বোটটার উঁচলল অগ্রভাগ দেখা দিল। তারপর দশ গজ পালিশ করা নির্জন ডেক, কাঁচের ওয়াইনড় শীল্ড সাইরেন ও ভোলা রেডিওর মাস্তুল লাগানো একটা নিচু কেবিন। স্ট্রিয়ারিং হুইলের পেছনে বসা লোকটিকে এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল। বন্ড চিনল, ব্রিটিশ মোটর টপেডো বোট। গত যুদ্ধের উদ্ধৃত্ত মাল।
বোটের পিছনে দাঁড়িয়ে লোক দুটি হলদে চামড়ার নিগ্রো। পরনে খাকি হাফপ্যান্ট ও শার্ট, কোমরে চওড়ার বেল্ট। মাথায় খড়ের তৈরি বেসবল খেলবার টুপি। পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল তারা। একজনের হাতে লম্বা তার লাগানো লাউডস্পীকার, আর অন্য জনের সামনে ত্রিপদের ওপর বসানো একটা মেশিনগান।
প্রথম লোকটি লাউডস্পীকার নামাল। একটা বাইনোকুলার তুলে সমস্ত বেলাভূমিটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তাদের মৃদু কথাবার্তার শব্দ শোনা গেল।
বাইনোকুলারের একজোড়া চোখ পাথুরে জমি থেকে সমস্ত বালিটার ওপর দিয়ে ঘুরে গেল। এবার তাদের কথাবার্তা এক পর্দা উঁচুতে উঠল। লোকটি মেশিনগানওয়ালাকে দূরবীন দিল। সে চট করে একবার দেখে নিয়ে দূরবীন ফেরত দিল। পর্যবেক্ষকটি চালককে চেঁচিয়ে কিছু নির্দেশ দিল। কেবিন ক্রুজারটি থেমে গিয়ে অল্প পিছিয়ে এল। এবার বোটটা বন্ড আর মেয়েটির ঠিক সামনে। গভীর পানিতে ভাসছে। পর্যবেক্ষক আবার দূরবীন তুলে তাকাল পাথরগুলোর দিকে, যার ফাঁকে মেয়েটার নৌকোটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। মেশিনগানওয়ালা আরেকবার দূরবীনটা নিয়ে সেদিকটা দেখে নিল, ওদের মধ্যে কি কথাবার্তা হল এবং নিশ্চিতভাবে ঘাড় নাড়ল।
বন্ড ভাবল হয়ে গেল আমাদের। লোকদুটো যথেষ্ট ওস্তাদ। এবার প্রথম লোকটা লাউডস্পীকার মুখের কাছে তুলে গর্জে উঠল। তার গলা, ঠিক আছে, বন্ধুগণ, সোজা বেরিয়ে এসো। আমরা গুলি চালাচ্ছি না।
শিক্ষিত লোকের গলা–কথায় একটু আমেরিকান টান। শোন বন্ধুগণ, একটু চটপট কর। আমরা দেখতে পেয়েছি কোনপথে তোমরা তীরে উঠেছে। তোমাদের নৌকাটাকে দেখেছি আমরা। ধীরে সুস্থে হাত দুটো মাথার ওপর তুলে বেরিয়ে এসো। তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না।
বন্ড মেয়েটার শার্টের হাতা ধরে টানল। ফিসফিসিয়ে বলল, কাছে সরে এসো, তাতে গুলি লাগার সম্ভাবনা কম।
বন্ড অনুভব করল মেয়েটার উষ্ণ শরীর। বালি খুঁড়ে ঢোকবার চেষ্টা কর। যতটা ঢুকতে পার ততটাই লাভ।
আবার লাউডস্পীকারের শব্দ, ঠিক আছে দোস্ত। তাহলে দেখ এ জিনিসটাকে শোভাবর্ধনের জন্য আনা হয়নি। ভেসে এল স্পনডাউ মেশিনগানের তীব্র কটকট শব্দ। যেটা বন্ড শেষবার শুনেছিল আর্ডেনস-এর রণক্ষেত্র জার্মান শিবির থেকে। অনেকটা মাথার ওপর দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেল। তারপর সব নিস্তব্ধ।
বন্ড দেখতে পেল পাখির ঝাঁক আকাশে উঠল। গোলন্দাজটি মেশিনগানের নলে হাত দিয়ে দেখছে গরম হল কিনা। দু জনে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে আবার লাউডস্পীকার তুলে নিল।
ঠিক আছে দোস্ত। তোমাদের সতর্ক করেছিলাম, এবার মর।
বন্ড লক্ষ্য করল নলটা এবার নিচের দিকে নামল। পাথরের খাঁজে লুকানো নৌকাটার ওপর গুলি চলবে। বন্ড মৃদুকণ্ঠে মেয়েটিকে বলল, ঘাবড়িও না হানি। মাথা নিচু করে থাক। অল্পক্ষণের ব্যাপার। মেয়েটা বন্ডের হাত চেপে ধরল। বন্ড ডানদিকে ঘেষে মেয়েটার মাথা আড়াল করে নিজের মাথাটা বালির মধ্যে ডুবিয়ে দিল।
এবার গুলির আওয়াজ এল ভীষণ জোরে। শিসকেটে ঠিকরে যেতে লাগল বুলেটগুলো। আর সব কিছুর পেছনে শোনা যাচ্ছে মেশিনগানের কটাকট শব্দ।
বন্ড ভাবল, এবার আমাদের দিকে গুলি আসবে। মেয়েটা তাকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে, সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। বন্ড হাত বাড়িয়ে তাকে আরও কাছে টানল।
আবার গুলি বৃষ্টি শুরু হল। তটরেখা অতিক্রম করে শিস কেটে ছুটে আসতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। তাদের মাথার ওপরের ঝোঁপটা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে তাদের সর্বাঙ্গ ঢেকে দিল। ঠাণ্ডা হাওয়ার গন্ধ পেল বন্ড, অর্থাৎ তারা এখন খোলা জায়গায় শুয়ে। আর মিনিট খানেকের মধ্যে গুলি বর্ষণ থেমে গেল।
লাউডস্পীকারের চিৎকার শোনা গেল, আচ্ছা দোস্ত। এখন যদি শোনবার মত অবস্থা থাকে, তবে শোন যে, আমরা অল্পক্ষণের মধ্যেই মৃতদেহগুলো কুড়িয়ে নিতে আসছি। কুকুরগুলোও সঙ্গে থাকবে। আপাতত বিদায়।
ঝরাপাতার ভেতর দিয়ে বড় দেখল ডিজেলের মৃদু গর্জন করতে করতে বোটটি পশ্চিম দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বন্ড সাবধানে মাথা তুলল। শান্ত উপসাগর। সে মেয়েটাকে টেনে তুলল। মেয়েটি ভীতি বিহ্বল কণ্ঠে বলল, কি ভয়ানক! ওরা কেন এমন করল? আমরা মারা পড়তাম একটুর জন্য।
বন্ড ভাবল এই মেয়েটার জগৎ বড় ছোট, চন্দ্র, সূর্য, ঋতুচক্রের গণ্ডীতে আবদ্ধ। বিপুল ক্ষমতা আর বিপুল অর্থের জন্য উঁচু সমাজের লোকেদের লড়াইয়ের খবর এর জানা নেই।
সব ঠিক আছে হানি। ওরা একদল খারাপ লোক। আমাদের ভয় পায় ওরা। ওদের আমরা ঠিকই জব্দ করতে পারব। আর তুমি সাহসের পরিচয় দিয়েছ। এবার এসো, কোয়ারেলকে খুঁজি, তাছাড়া এবার কিছু খাওয়া দরকার। এইরকম অভিযানে তুমি কি খাও?।
তারা সৈকত বেয়ে পাথুরে জমিটার দিকে চলল। মেয়েটা নিচু গলায় বলল, এখানে অজস্র খাবার আছে। বিশেষ করে সী আৰ্চ্চিন, বুনো কলা ইত্যাদি। এখানে আসবার আগে আমি দু দিন ধরে কেবল খাই আর ঘুমাই। তাই এখানে এসে বিশেষ কিছু প্রয়োজন হয় না।
