আপনি কি করে জানলেন ড্রাগন বলে কিছু নেই? দ্বীপের এদিকে কেউ থাকে না। একটা ড্রাগন তো এখানে থেকেও যেতে পারে। আর জন্তু-জানোয়ার সম্বন্ধে আপনি কতদূর জানেন মশাই? ছোটবেলা থেকে আমি সাপ আর পোকামাকড়দের সঙ্গে বাস করি। একলা। আপনি কি দেখেছেন একটা শিকারী মাকড়সা প্রেম করবার পর তার স্বামীকে খেয়ে ফেলে? বেজীর নাচ বা অক্টোপাসের নাচ দেখেছেন কখনো? একটা হামিং বার্ড-এর জিভ কতটা লম্বা হয় জানা আছে আপনার? কোনদিন সাপ পুষেছেন, যার গলায় একটা ঘন্টা বাধা থাকবে আর সেইটে বাজিয়ে রোজ সে আপনার ঘুম ভাঙাবে? কখন কাঁকড়া বিছের সানস্ট্রোক হতে দেখেছেন? দেখেছেন তখন তারা নিজের গায়ে হুল ফুটিয়ে আত্মহত্যা করে? জানেন আপনি এক ধরনের কাক এক মাইল দূর থেকে একটা মরা টিকটিকির গন্ধ পায়? হতাশ ভাবে বলল, উঃ, আপনি ঠিক ঐ আর সব শহুরে লোকগুলোর মত।
বন্ড বলল, দেখ হানি, তুমি তো সবই জানো। শহরে থাকা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। এইসব বিষয়ে আমি খুবই আগ্রহী। কিন্তু আমার জানা আছে, যেমন…। তোমার আগের অভিযানগুলোর চেয়ে এবারের আসাটা নিয়ে ঐ চীনে ভদ্রলোক অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। এবার তিনি চেষ্টা করবেন যাতে তুমি এই দ্বীপের থেকে আর ফিরে যেতে না পার। আর আমিও যাতে ফিরে যেতে না পারি।
মেয়েটি আগ্রহের সুরে, তাই নাকি? কিন্তু কেন? দিনের বেলাটা লুকিয়ে রাত্তিরে পালিয়ে গেলেই হল। সে একবার আমার পেছনে একটি কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল আর একবার প্লেন পর্যন্ত পাঠিয়েছিল। কিন্তু এখনও আমাকে ধরতে। পারেনি। তবে কি সে আসলে আপনাকে ধরতে চাইছে?
বন্ড বলল, তা বলতে পার, ব্যাপারটা সেই রকমই মনে হচ্ছে। মনে হয় চীনেটা আগে থেকেই জানত যে আমরা আসব। তোমার নৌকার পাল দেখে ভেবেছে ওটাই আমাদের নৌকা। আমি বরং আমার বন্ধুকে ডাকি, ওকে তোমার ভাল লাগবে। কেম্যান দ্বীপের লোক, নাম কোয়ারেল।
মেয়েটা বলল, দেখুন, আমি দুঃখিত যে…আমি তো এর কিছু জানতাম না।
বন্ড আশ্বাসের সুরে বলল, অবশ্যই তোমার পক্ষে এ সব জানা সম্ভব ছিল না। আমার মনে হয় না সে একটা ঝিনুক কুড়ানো মেয়েকে নিয়ে মাথা ঘামাত। কিন্তু আমার সম্বন্ধে লোকটির মনোভাব আলাদা। এখন সে তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আমাকে আটকে ফেলবে এবং তোমাকেও। দেখা যাক কোয়ারেল কি বলে? তুমি এখানেই থেকো।
বন্ড পাথুরে জায়গাটা চারদিক খুঁজে দেখল। তাকে খুঁজে বার করতে বন্ডের পুরো পাঁচ মিনিট সময় লাগল। দুটো বড় পাথরের খাঁজের মধ্যে সে শুয়েছিল। বন্ড আস্তে শিস্ দিল। বন্ডকে দেখতে পেয়ে কোয়ারেল চটপট উঠে দাঁড়াল। সুপ্রভাত ক্যাপটেন। খুব গভীরভাবে ঘুমুচ্ছিলাম।
স্বপ্নে সেই চীনে মেয়েটা আমার কাছে এসেছিল।
বন্ড হেসে বলল, আমার কাছে আর একজন এসেছে। বন্ড তাকে হানিচাইল, তার ঝিনুক, আর তাদের বিপদের কথা সব বলল, এখন এগারোটা বাজে, আমাদের নতুন একটা প্ল্যান তৈরি করতে হবে।
এই মেয়েটাকে পানির মধ্যে ফেলে দেবার মতলব নেই তো আপনার? আমাদের অভিযানে ওর জন্য কোন অসুবিধা হবে না বলেই…। হঠাৎ সে থেমে গেল। একটা হাত তুলে বন্ডকে চুপ করে থাকতে বলে সে খুব মন দিয়ে কি যেন শুনতে লাগল।
বন্ড নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনল। অনেক দুরে পুব দিকে অস্পষ্ট ঘড় ঘড় আওয়াজ।
কোয়ারেল এক লাফে উঠে দাঁড়াল, শিগগির ক্যাপ্টেন, তারা আসছে।
.
অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া
দশ মিনিট পরে উপসাগরটাকে দেখাচ্ছিল ফাঁকা এবং পরিষ্কার আয়নার মত স্থির। পানির বুকে ছোট ছোট ঢেউগুলো অলসভাবে পাক খাচ্ছিল। ফেলে দেওয়া ঝিনুকের স্তূপটা অপসারিত হয়েছে, বালির ওপর পায়ের ছাপও আর নেই। গাছের ডাল কেটে কোয়ারেল সৈকতটাকে ঝাট দিয়েছে। মেয়েটির নৌকা আরো ভেতরে পাথরের মধ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে সামুদ্রিক লতাপাতা দিয়ে ঢাকা হয়েছে।
কোয়ারেল উঁচু পাথুরে জায়গাটায় ফিরে গেল। বন্ড আর মেয়েটা উপুড় হয়ে শুয়ে রইল কয়েক ফুটের ব্যবধানে। সামুদ্রিক ঝোঁপটার আড়ালে। তারা দুজনে চুপ করে তাকিয়ে রইল নদীর বাঁকটার দিকে, যেটা ঘুরে শত্রুদের বোটটাকে আসতে হবে।
জোড়া ডিজেলের ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনে বন্ড অনুমান করল যে তটরেখার প্রতিটি খাঁজ ওরা খুঁজে দেখতে দেখতে আসছে। বোধহয় একটা বড় কেবিন ক্রুজার। কতজন ওটাতে থাকতে পারে? অনুসন্ধানের পরিচালনাই বা করছে কে? ডক্টর নো? মনে হয় না।
পশ্চিম দিকে এক ঝাঁক পাখি দেখা গেল। দ্বীপের অপর প্রান্তে যে গুয়ানে পাখিদের বসবাস আছে তার এই প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেল সে। পাখিগুলো ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে পানির মধ্যে ডুব দিল। পানটাকে ভেদ করল একঝাঁক গুলির মত। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিম দিগন্তে নতুন এক ঝাঁক পাখি দেখা গেল। তারপর আরেক ঝক, আবার এক ঝাক সবটা মিলিয়ে যেন একটা দীর্ঘ সারি। তারপর কয়েক একর সমুদ্র জুড়ে ডুব দিল। চেঁচামেচি মারামারি করে তারা পানির নিচে পাখা ডুবিয়ে আনচোভি মাছ খেতে লাগল। যেন একদল পিরানহা মাছ খাচ্ছে একটা ডোবা ঘোড়াকে।
মেয়েটা বন্ডকে আস্তে একটু ধাক্কা দিল। ঐ দেখুন, চীনে লোকটার মুরগীগুলো খাবার খাচ্ছে।
বন্ড দেখল অনুসন্ধানের জন্য লোক এসে পড়াতেও মেয়েটাকে তেমন উদ্বিগ্ন মনে হল না। তার কাছে এটা একটা লুকোচুরি খেলা ছাড়া কিছু নয়।
