মেয়েটি বলল, আপনি কে? এখানে কি করছেন? সুরে জ্যামাইকার টান।
আমি একজন ইংরেজ। পাখি সম্বন্ধে আগ্রহ আছে আমার।
মেয়েটি বলল, ও, কতক্ষণ ধরে আমাকে লক্ষ্য করছেন আপনি? এখানে এলেন কেমন করে?
দশ মিনিটের মত হবে। কিন্তু এবার তুমি যদি না বল তুমি কে তাহলে আমি আর একটা কথা বলব না।
আমি তেমন কেউ নই। জ্যামাইকায় থাকি, ঝিনুক কুড়োই।
আমি একটা নৌকায় এসেছি, আর তুমিও বোধহয়।
হ্যাঁ। আপনার নৌকাটা কোথায়?
আমার এক বন্ধু আছে। দুজনে মিলে সেটা গুল্মের ভেতর রেখেছি।
কিন্তু বালিতে তো কোন নৌকার চিহ্ন নেই?
আমরা সাবধানে কাজ করেছি। তোমারও সাবধানী হওয়া উচিত ছিল। নৌকায় পাল কি তুলে এসেছ না কি? নিশ্চয়ই, বরাবর তো তাই করি।
তাহলে তারা জেনে গেছে তুমি এখানে এসেছ। তাদের কাছে রেডার আছে।
এখনো ধরতে পারেনি। আপনার নাম কি?
বন্ড। জেমস বন্ড, আর তোমার নাম?
রাইডার।
রাইডার তো পদবী। নামটা কি?
হানিচাইল।
বন্ড হাসল।
হাসবার কি হল?
কিছু না। হানিচাইল রাইডার। সুন্দর নাম।
লোকে আমাকে হানি বলে ডাকে।
তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দিত হলাম।
পরিমার্জিত কথাটা শুনে মেয়েটির মনে পড়ল যে সে বিবস্ত্রা। লজ্জায় লাল হয়ে, আমি পোশাক পরে আসি। আমি গেলে কিন্তু একটি ঝিনুকও নেবেন না।
কোন চিন্তা কোর না। আমি পাহারা দিচ্ছি।
সৈকত ধরে কয়েক পা এগিয়ে বন্ড একটা ঝিনুক কুড়িয়ে নিল। জীবন্ত ঝিনুক-দুটি অংশ এঁটে বন্ধ রয়েছে। গোলাপী রঙ। কজার দু ধারে সরু শুড় বেরিয়ে আছে।
ঝিনুকগুলোর দিকে তাকিয়ে বন্ড ভাবল, মেয়েটি কি সত্যিই ঝিনুক সংগ্রহ করতে এসেছে? জায়গাটা মারাত্মক, মেয়েটি একা। আবার বলছিল, এখনো তো ধরেনি। মেয়েটির রাণীর মত ব্যবহার আর আক্রমণের কায়দা বড় সুন্দর। থাকে কোথায় মেয়েটি তার বাবা মা কে? কেমন যেন অবহেলিত মেয়েটি।
বন্ড মেয়েটির পায়ের আওয়াজে ফিরে তাকাল। ওর পোশাক শতছিন্ন বিবর্ণ। হাতা ছেঁড়া বাদামি রঙের শার্ট আর হাঁটু পর্যন্ত নামা ছেঁড়া, জোড়া তালি দেওয়া একটা স্কার্ট। একটা ক্যানভ্যাসের ব্যাগ তার কাঁধে ঝোলানো।
মেয়েটি এসেই বালির ওপর বসে ঝিনুক কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে লাগল।
বন্ড বলল, এ ঝিনুক কি তেমন পাওয়া যায় না?
আপনি যদি প্রতিজ্ঞা করেন কাউকে বলবেন না, তাহলে বলতে পারি।
প্রতিজ্ঞা করলাম।
বেশ, তাহলে বলি : এই ঝিনুকগুলো সহজে পাওয়া যায় না, আর বেশ দামী। এইরকম এক একটা ঝিনুক পাঁচ। ডলারে বিক্রি হয় মায়ামিতে। সেখানেই, আমি এগুলো বেচি। এদের বলে ভেনাস এলিগানস্। বা দ্য এলিগ্যান্ট– ভেনাস। আজ সকালে আমি ওদের আড্ডা আবিষ্কার করেছি। অবশ্য আপনি সে জায়গা খুঁজে পাবেন না। অনেক। গভীরে লুকানো আছে, আর আজই সবচেয়ে ভালগুলো তুলে নেব।
বন্ড বলল, আমি প্রতিজ্ঞা করছি একটাও চুরি করব না। সৃষ্টিকর্তার দিব্যি।
আর আপনার পাখিগুলো কি জাতের? তারা কি দুষ্প্রাপ্য! এসব না জানলে আমিও আর কিছু বলব না।
পাখিগুলোর নাম রোজেন্ট শুনবিল, চ্যাপ্টা ঠোঁটওয়ালা গোলাপী সারসের মত দেখতে। দেখেছ নাকি?
ও ঐগুলো? এখানে হাজার হাজার ঐ পাখি ছিল। এখন সব ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। মেয়েটি বালির ওপর। বসল, যেন এই লোকটাকে ভয় পাবার কিছুই নেই।
বন্ড বসল একগজ দূর আধশোয়া অবস্থায়, একটা কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে। বন্ড সহজভাবে বলল, সত্যি! কি হয়েছিল? কে ভয় দেখাল তাদের?
এখানকার লোকেরাই ভয় দেখিয়েছে। একটা চীনেম্যান এখানে আছে। তার আবার ড্রাগন আছে। সেই ড্রাগনটিকে পাখির পেছনে লাগিয়েছিল। ভয়ে তারা পালিয়েছে আর তাদের বাসাগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে এই ড্রাগনটা। দুজন লোক পাখিগুলোর সঙ্গে থাকত। তারা পালিয়েছে, না হয় মারা গেছে না হয় অন্য কিছু হয়েছে।
এই ড্রাগনটা কেমন দেখতে তুমি দেখেছ ওটাকে?
হ্যাঁ, দেখেছি। আমি গত প্রায় একবছর ধরে এখানে আসছি, ঝিনুকের খোঁজে। মাত্র এক মাস আগে আমি ওগুলোর খোঁজ পেয়েছি। তবে অন্যান্য ভাল জাতের ঝিনুকও আমি পেয়েছি। বড়দিনের কিছু আগে আমি নদী গর্ভটা খুঁজে দেখব বলে নদী বেয়ে অনেকটা উঠে গেলাম যেখানে পাখিদের দুই রক্ষকের তাবু ছিল। দেখলাম তাবুটা পুড়ে গেছে। অনেক রাত হয়েছিল বলে আমি বাকি রাতটা ওখানেই কাটাব ভাবলাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল, দেখি ড্রাগনটা আসছে। আমার চেয়ে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে, বিরাট দুটো জ্বলন্ত চোখ আর লম্বা নাক। কেমন ছোট ছোট একজোড়া পাখা আর উঁচলো ল্যাজ। সমস্ত গায়ের রংটা কালো আর সোনালি মেশানো।
বন্ডের মুখের ভাব দেখে মেয়েটা জ কোঁচকালো, সেদিন পূর্ণিমা ছিল। আমি ওটাকে স্পষ্ট দেখেছি। কেমন একটা গর্জনের মত আওয়াজ করতে করতে আমার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। একঝাক পাখি তার সামনে পড়তেই হঠাৎ তার মুখ দিয়ে অনেকখানি আগুন বেরিয়ে এল। অনেকগুলো পাখি পুড়ে গেল। যে সব গাছে তারা বাসা বেঁধেছিল, তাতেও আগুন ধরে গেল। কি বীভৎস ব্যাপার, আমি জীবনে দেখেনি।
বুঝতে পারছি আপনার বিশ্বাস হল না। আপনি যে শহরের লোক। আপনারা তো কিছুই বিশ্বাস করেন না।
দেখ হানি, ড্রাগন বলে পৃথিবীতে কোন জিনিস নেই। তুমি যেটাকে দেখেছিলে সেটা অনেকটা ড্রাগনের মত দেখতে। বুঝতে পারছি না বস্তুটি কি হতে পারে।
