যদি হঠাৎ একটা বড় ঢেউ এসে নৌকাটা ডুবিয়ে দেয়? তারা কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবে? চারটে বাজল, কোয়ারেল জেগে উঠে দিকে তাকিয়ে বলল, মাটির গন্ধ পাচ্ছি হুজুর। একটু পরেই সামনে অন্ধকারটা যেন আরো জমাট মনে হল। তাদের পেছনে এবার মাইল দুয়েক দূরের দ্বীপটাকে স্পষ্ট দেখা গেল। কানে ভেসে এল ভেঙে পড়া ঢেউ-এর ক্ষীণ আওয়াজ।
আবার তারা জায়গা বদল করল। কোয়ারেল পাল নামিয়ে দিল, আর দু জনেই বৈঠা ধরল। আর একমাইল তারা ঢেউয়ের আড়ালে যেতে পারবে। শেষ মাইলটা অবশ্য তাড়াতাড়ি যেতে হবে। ভোর হতে দেরি নেই।
এবার সেও মাটির গন্ধ পেল। বিশেষ কোন গন্ধ নয়, তবে ঘন্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রের ওপর থাকার পর একটা নতুন গন্ধ লাগল নাকে। ঢেউগুলো ক্রমশ রুক্ষ হয়ে উঠছে। কোয়ারেল বলল, এইবার হুজুর। এখন মনে হচ্ছে নৌকাটা আর যেন এগোচ্ছে না। বন্ডের কাঁধ দারুণ ব্যথা করছে। তার হাত প্রায় অবশ। বৈঠাটা যেন সিসে দিয়ে তৈরি।
সাংঘাতিক অবস্থা। কিন্তু তবু তারা কোনক্রমে এগোল। পাথরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে তারা একটা ঢোকবার রাস্তা খুঁজল। একশ গজ দূরে বালিগুলোকে দুভাগ করে দিয়ে একটা স্রোতরেখা দ্বীপের দিকে গেছে। নদী। তাহলে ঠিক জায়গাতেই তারা এসেছে। কোয়ারেল হালের সাহায্যে নৌকো নিল পাথুরে জায়গার দিকে, যেখানে তটভূমি শেষ হয়েছে।
এবারে তাড়াতাড়ি হাত চালানোর পালা। তারা নৌকাটিকে আরও কুড়িগজ টেনে নিয়ে গেল গুল্মঝোঁপের মধ্যে। নৌকাটাকে সমুদ্রের শুকনো লতাপাতা আর ভেসে আসা কাঠের টুকরো দিয়ে ঢেকে ফেলল। তারপর তালপাতার ঝাটা দিয়ে বালির ওপরকার সব চিহ্ন মুছে দিল।
এখনও আকাশ পরিষ্কার হয়নি। পাঁচটা বাজে। কোয়ারেল পাথরের ফাঁকে আর বন্ড একটা জায়গায় শুকনো বালি খুড়ে শোবার জায়গা করল। কাছেই কয়েকটা তপস্বী কাঁকড়া ঘুরছে। কতরকম পোকামাকড় যে তার গায়ের গন্ধ পেয়ে আসতে পারে তা একবারও ভাবল না। সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।
.
অপরূপা ঊর্বশী
বন্ডের ঘুম ভাঙল। বালির ছোঁয়ায় তার মনে পড়ল যে সে কোথায় এসেছে। দশটা বাজে। সূর্যের উষ্ণ আলো আসছে সামুদ্রিক আঙুরের মোটা পাতার ভেতর দিয়ে। সামনে দিয়ে একটা বড় ছায়া মত সরে গেল। কোয়ারেল না কি? বন্ড তার মাথা সরিয়ে বাইরেটা দেখে। তার হৃদপিণ্ড মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়েই জোরে ধক্ আওয়াজ করতে লাগল।
একটি অনাবৃত মেয়ে, তার দিকে পেছন ফেরা। সম্পূর্ণ নগ্ন নয়। কোমরে চওড়া একটা চামড়ার কোমর বন্ধ, তার ডান দিকে ঝুলছে একটা শিকারী ছুরি-চামড়ার খাপে মোড়া। মেয়েটি তার থেকে পাঁচ গজ দূরে দাঁড়িয়ে নিজের হাতে কি যেন দেখছে। প্রাচীন ভাস্কর্যের নগ্ন নারীমূর্তির মত দাঁড়িয়ে-শরীরের ভার তার ডান পায়ে আর বাঁ পায়ের হাঁটুটা ভেতরের দিকে একটু বেঁকে রয়েছে।
ভারি সুন্দর পেছনের দিকটা। গায়ের রঙ হালকা কফি রঙের মত, আর পায়ের গোছাটা মেটে রঙের সার্টিনের মত। শিরদাঁড়ার গভীর খাঁজ দেখে শরীরের অসাধারণ শক্তি বোঝা যায়। নিতম্বদেশ অনেকটা কম বয়সী ছেলেদের মত নিটোল।
ধূসর সোনালি ভিজে চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। কপালের ওপর তোলা পানির নিচের মুখোস। সবুজ রবার দিয়ে চুলগুলো পেছন দিকে বাঁধা। পেছন দিকে থেকে বত্তিচেলি ভেনাসের মত দেখাচ্ছে।
এখানে মেয়েটি এল কি করে? করছেটা কি? বেলাভূমিটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল বন্ড। শুধু বালির ওপর বেগুনী রঙের কি সব রয়েছে, তাছাড়া কোথাও কিছু নেই। বন্ডের মনে হল সেগুলো ঝিনুক কিংবা শামুক। বাঁ দিকে তাকাল বন্ড। কুড়ি গজ দূরে দ্বীপের পাহাড় শুরু হয়েছে। হ্যাঁ, লতাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা আছে একটা নৌকা। নৌকোটা নিশ্চয়ই হালকা, নইলে মেয়েটির পক্ষে সেটাকে এতদূর টেনে আনা সম্ভব হত না। একজোড়া পায়ের ছাপ চলে গিয়েছে। শিলা থেকে পানির দিকে, আবার পানি থেকে ঠিক যেখানে মেয়েটি দাঁড়িয়ে। মেয়েটি কি এখানেই থাকে না জ্যামাইকা থেকে নৌকা বেয়ে এসেছে? কি করছে মেয়েটা?
যেন বন্ডের প্রশ্নেরই জবাবে মেয়েটি কি যেন ছুঁড়ে ফেলল ডাত হাত দিয়ে, আর কয়েকটা ঝিনুক ছড়িয়ে পড়ল বালিতে। সেগুলো গভীর বেগুনী রঙের। মেয়েটা আস্তে আস্তে শিস দিল। গানটির নাম মারিয়ন। কেবল জ্যামাইকাতে নয় তার বাইরেও গানটি জনপ্রিয়।
হঠাৎ মেয়েটি গান বন্ধ করল। বন্ড হেসে শিস দিয়ে গানটাকে সম্পূর্ণ করবার চেষ্টা করল।
মেয়েটার দুটো হাত বুকের ওপর চলে এল। মেয়েটা শুনছে। তার মুখ এখনো এলোচুলের আড়ালে।
একটু দ্বিধার সঙ্গে সে আবার গান ধরল। চকিতে বন্ডের দিকে মেয়েটি ফিরে দাঁড়াল। এবারে একটা হাত নিচের দিকে, অন্যটি মুখের ওপর ঠিক চোখের নিচে। ভীতিবিহ্বল কণ্ঠে সে বলল, কে?
সামুদ্রিক আঙুরলতা সরিয়ে বন্ড বেরিয়ে এল। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আমি আর একজন অনুপ্রবেশকারী। ভয় পাবার কিছু নেই।
মেয়েটা মুখ থেকে হাত নামিয়ে কোমর বন্ধের ছুরির হাতলের ওপর রাখল। মুখটা ভারি সুন্দর। গভীর নীল চোখ, চওড়া ঠোঁট, থুতনির রেখা কঠোর। স্বাধীনচেতা মেয়েদের মত মুখ। তার নাকটা থ্যাবড়ানো। মুষ্টিযোদ্ধার নাকের মত। এত সুন্দর মেয়েটাকে কে এমন করে মারল?
