এখন সাড়ে আটটা। বন্ড তার অল্প কয়েকটা জিনিস গুছিয়ে নিয়ে হাফ-প্যান্ট আর চটি পরে নিল। তারপর কফি আর বেকন ভাজার চমৎকার গন্ধ পেল সে। প্রাতঃরাশ খেতে খেতে তার দৈনিক ব্যায়ামের রুটিন ঠিক করে ফেলল, সকাল সাতটায় ওঠা, সিকি মাইল সাঁতার, প্রাতঃরাশ, একঘণ্টা সূর্যস্নান, একমাইল দৌড়, আবার সাঁতার, মধ্যাহ্নভোেজ, ঘুম, সূর্যস্নান, একমাইল সাঁতার, গমর পানিতে গোসল ও মালিশ, নৈশভোজ এবং নটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া।
প্রাতঃরাশের পর, তার রুটিন মাফিক শরীরচর্চা শুরু করল। পরের সপ্তাহটা একটানা পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে কাটল। ব্যতিক্রম ঘটাল কেবল দৈনিক গ্রীনার-এর একটা সংক্ষিপ্ত সংবাদ ও প্লেডেল স্মিথ–এর কাছ থেকে একটা টেলিগ্রাম। গ্লীনার জানাচ্ছে যে H. 2473 নম্বরের একটা সানবীম আলপাইন গাড়ি ভয়ংকর দুর্ঘটনায় পড়েছে। কিংসটন থেকে মন্টেগো যাবার পথে ডেভিলস্ রেসকোর্স নামক একটি আঁকাবাঁকা রাস্তায় অজ্ঞাত পরিচয় লরী বাঁকের মাথায় সানবীমটির ওপর এসে পড়ে। দুটি গাড়িই রাস্তা থেকে ছিটকে পাশের উপত্যকায় পড়ে যায়। সানবীমটির দুজন আরোহী, হারবার স্ট্রীট-এর বেন গীবনস ও জোসিয়া স্মিথ নিহত হয়েছেন। লরী ড্রাইভার এর খোঁজ চলছে। জনৈক মিঃ বন্ড, একজন ইংরেজ টুরিস্ট, এদেরকে গাড়িটি ধার দিয়েছিলেন। তাঁকে নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।
বন্ড গ্রীনারের সেই সংখ্যাটা পুড়িয়ে ফেলল, এটা দেখলে কোয়ারেলের মন খারাপ হবে।
রওনা হবার ঠিক আগের দিন প্লেডেল স্মিথ-এর কাছ থেকে টেলিগ্রামটা এল। তাতে লেখা ছিল, প্রতিটি ফলের মধ্যে যে পরিমাণ পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল, এক একটা ঘোড়া মারবার পক্ষে তা যথেষ্ঠ। মনে হয় তোমার অন্য দোকান থেকে ফল কেনা উচিত। শুভেচ্ছা সহ–প্লেডেল স্মিথ।
টেলিগ্রামটিকে বন্ড পুড়িয়ে ফেলল।
কোয়ারেল একটা নৌকা ভাড়া করে তিনদিন ধরে তা চালানো রপ্ত করল। নৌকায় আছে দুজন দাড়ি বসবার জায়গা, দুটো দাঁড়, ক্যানভাসে তৈরি একটা ময়লা পাল।
সাত কি আট ঘণ্টা ক্যাপ্টেন। তারপর পাল নামিয়ে আমরা দাঁড় বাইব। রেডারের পক্ষে আমাদের ধরা তাহলে আরও শক্ত হবে।
সন্ধ্যা হল। বন্ড খুশি হল, যাক শেষ পর্যন্ত এগোতে পেরেছে। তার নিয়মিত ব্যায়াম থেকে সে মাত্র একবার বেরিয়েছিল, জিনিসপত্র কিনতে। আর কোয়ারেলের জীবন বীমা করাতে। সে স্বীকার করেছিল যে এই অ্যাডভেঞ্চারে বেশ উত্তেজনা আছে। এতে সব উপাদান আছে দৈহিক পরিশ্রম, রহস্য আর একজন নির্দয় শত্রু। তার সঙ্গীটিও চমৎকার। M বলেছিলেন সূর্যের আলোয় ছুটি উপভোগ করতে। তার মুখের মত জবাব হবে এটা।
জ্বলন্ত সূর্য সুন্দরভাবে অবলুপ্তির পথে চলেছে।
বন্ড তার শোবার ঘরে গিয়ে দুটো পিস্তল বার করল। বেরেটার মত কোনটাই নয়। কিন্তু এই দুটো পিস্তল নাকি বেরেটার চেয়ে ভাল। কোনটাকে সে সঙ্গে নেবে? শেষ পর্যন্ত বেশি ভারি স্মিথ অ্যান্ড ওয়েগন-টাকেই নিতে হল। ক্র্যাবে-কী-তে গুলি যদি চালাতেই হয় তাহলে তা দূর থেকে চালানোরই সম্ভাবনা। ওয়ালথার এর চাইতে এটার গুলি আরো পঁচিশ গজ বেশি ছোটে। বন্ড বেল্টের সঙ্গে পিস্তলের খাপটাকে ঝুলিয়ে নিল। পকেটে গুলি নিল কুড়িটা।
বন্ড বরফের বাক্স থেকে এক পাইট ক্যানাডিয়ান ক্লাব হুইস্কি আর কিছু বরফ ও সোডা ওয়াটার সঙ্গে নিয়ে বাগানে গিয়ে বসে সূর্যের শেষ রক্তরেখা দেখতে লাগল।
সমুদ্রের তীর থেকে কোয়ারেন্স এসে বলল, সময় হল ক্যাপ্টেন।
বন্ড পানীয় শেষ করে কেম্যান দ্বীপের লোকটির সঙ্গে নৌকার দিকে গেল। দু জন নৌকার দু প্রান্তে বসল। গোটানো পালটা পেছনে রইল। বন্ড বৈঠা নিয়ে নৌকা ছেড়ে দিল। দুজন মিলে সহজেই নৌকা চালাতে লাগল। এখন অন্ধকার। তারা চট করে ডাঙা ছেড়ে সমুদ্রে এসে পড়েছে।
বন্ডের কাজ এখন কেবল চালিয়ে যাওয়া। কোয়ারেল হাল ধরে আছে। বার বার বন্ডের বৈঠা পাথরের সঙ্গে ঠুকে যেতে লাগল। অনেকটা তলায় নীল রঙের বালি দেখা গেল। আর তারা এসে পড়ল গভীর সমুদ্রের ভারি পানিতে।
কোয়ারেল বলল, ঠিক আছে ক্যাপ্টেন। বন্ড বৈঠা তুলে বসল আর কোয়ারেল পাল টাঙাল। গতির ফলে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে মুখে লাগছে। আরও বেশি ঠাণ্ডা লাগবে এরপর। বন্ড হাত গুটিয়ে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বসল।
নৌকার কাঠ বন্ডের পিঠে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। সে বুঝল রাত্রিটা বড় কষ্টে কাটবে।
অন্ধকারে বন্ড পৃথিবীর কিনারা দেখতে পেল। কুয়াশার একটা স্তর, তার পরেই তারাদের রাজত্ব। কতগুলো তারা? তারাগুলোর আলোতে সমুদ্রটাকে একটা রাস্তার মত দেখাচ্ছে। বারটার সময় অর্ধেক পথ পেরিয়ে যাবে তারা। তখন বন্ডের নৌকা বাইবার পালা।
একটা ঠং করে আওয়াজ হতে বন্ডের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘড়িতে তখন বারটা বেজে পনের মিনিট। বন্ড বলল, আমি দুঃখিত কোয়ারেল, আগে জাগাওনি কেন?
তাতে কি হয়েছে? আপনার তো ঘুমোনো দরকার।
জায়গা বদল করল তারা। বন্ড হাল ধরল। বন্ড এমনভাবে নৌকাটাকে ঘুরিয়ে নিল যে, কোয়ারেলের ঘুমন্ত মাথার ওপর রইল ধ্রুব তারাটি।
রাত্রির রূপ একই রকম রইল–কেবল অন্ধকার আরও ঘন হল। আরো যেন শূন্য মনে হল। বৈঠাতে ফসফরাস লেগে গিয়ে ঝরে পড়তে লাগল হীরে মুক্তার মত। একঝাক উড়ন্ত মাছ নৌকাটির সামনে থেকে পানি ভেদ করে উঠে পড়ল, তারপর ফাটা বোমার টুকরোর মত ছড়িয়ে পড়ল। নৌকার পাশে পাশে কয়েকটা উড়তে লাগল কিছুক্ষণ। বোটের শতশত ফ্যাদাম নিচে কত কিছুই হচ্ছে হয়ত। বড় বড় মাছ-হাঙর, ব্যারাকুড়া, টারপন, সেলফিন, হাজার হাজার ম্যাকারেল, কিংফিশ, বনিটো, আর তলায় জেলির মত নরম, কাঁটাহীন অজানা সব মাছ যাদের কখনো দেখা যায় না।
