বন্ড প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল। ফলগুলোর কথাও কোয়ারেলকে বলেনি সে। কোয়ারেল শক্ত মানুষ, কিন্তু তার মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার মানে হয় না। একটা আধুনিক বাড়িতে কি এদের পাওয়া যেতে পারে? ধর জুতা বা ড্রয়ার বা বিছানার মধ্যে?
না। নিশ্চিত কণ্ঠে বলল কোয়ারেল। যদি না তাদের ইচ্ছে করে এনে রেখে দেওয়া হয়। এরা খোলা জায়গায় মোটেই আসতে চায় না।
তাই নাকি বন্ড প্রসঙ্গে বদলাল, ভাল কথা, সেই লোকটি দুটি সানবীম নিয়ে রওনা হয়ে গিয়েছে তো?
নিশ্চয়ই, ক্যাপ্টেন। কাজটা পেয়ে ওরা ভারি খুশি। আর ওরা সত্যি অনেকটা আমাদের মত দেখতে। কোয়ারেল আড়চোখে বন্ডের দিকে তাকিয়ে দ্বিধার সঙ্গে বলল, আমার মনে হয় ওরা বিশেষ সুবিধের লোক নয়। আমার মত দেখতে লোকটা ভিখিরী। আর যে লোকটা আপনার মত দেখতে সে ব্যাটা বেটশীর জোগাড় করা এক অকর্মা সাদা আদমী।
বেটশী কে?
মেয়েটা এ শহরে বাজে এক স্বৈরিনী ব্যবসা চালায়। কোয়ারেল গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে থুথু ফেলে। ঐ সাদা লোকটা হিসেব পত্র দেখে।
বন্ড হেসে বলল, আরে, লোকটা গাড়ি চালাতে জানলেই হল। ওরা ঠিকমত মন্টেগোতে পৌঁছলেই হল।
সে বিষয়ে চিন্তা করবেন না। ঠিকমত না পৌঁছলে পুলিশকে খবর দেব যে ওরা দুজন গাড়িটা চুরি করেছে।
কোয়ারেল বন্ডের চিন্তাস্রোতে বাধা দিয়ে বলল, মাপ করবেন ক্যাপ্টেন। অনেক মাথা ঘামিয়েও আপনার মতলব আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।
আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কোয়ারেল। তুমি তো জানই কমান্ডার স্ট্র্যাংওয়েজ ও তার সেক্রেটারি নিরুদ্দেশ হওয়ায় আমাকে এখানে আসতে হয়েছে। আমার ধারণা তাদের খুন করা হয়েছে।
তাই নাকি? কে তাদের খুন করেছে বলে আপনার মনে হয়? আমার তো মনে হয় ডঃ নো এ ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে একমত। আমার মতে হত্যাকারী হচ্ছে ডক্টর নো, ক্র্যাব-কীর সেই চীনেটা। ঐ পাখিদের ব্যাপারে ডক্টর নো-র কাজে স্ট্র্যাংওয়েজ নাক গলিয়েছিল। মনে রেখো, সব কিছু আমার আন্দাজ ছাড়া কিছু নয়। তবে গত চব্বিশ ঘণ্টায় কয়েকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। এর জন্যই সানবীম গাড়িটাকে আমি মন্টেগো পাঠিয়েছি। শত্রুকে বিপথে চালিত করবার জন্য।
আর তারপর।
প্রথমত আমার শরীরটাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলতে চাই–গতবার তুমি আমাকে যেমন ব্যায়াম করিয়েছিলে।
নিশ্চয়ই ক্যাপ্টেন। আবার সে রকম করা যাবে।
আর তারপর ভাবছি তুমি আর আমি মিলে ক্র্যাব-কী দ্বীপটা একবার ঘুরে আসব।
কোয়ারেল শিস্ দিল। শিসের সুরটা নিচে নেমে থেমে গেল।
শুধু একবার দেখে আসা। ডক্টর নো-র বিশেষ কাছে ঘেঁষবার দরকার নেই। পাখিদের আড্ডাটা আমি একবার দেখতে চাই। আর ওয়ার্ডেনদের তাবুটায় আসলে কি হয়েছিল। যদি কিছু গণ্ডগোল দেখি পালিয়ে আসব। একটা বড় গোছের অনুসন্ধান চালাবার জন্যে হাতে কিছু প্রমাণ থাকা চাই। তোমার কি মনে হয়?
কোয়ারেল হিপ পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরাল। ক্যাপ্টেন, আমার মতে লুকিয়ে চুরিয়ে ঐ দ্বীপে যাওয়াটা নিছক পাগলামি। শুধু একটা কথা ক্যাপ্টেন, কে ম্যানস দ্বীপে আমার ছোট একটা পরিবার আছে। ঐ দ্বীপে রওনা হবার আগে আমার একটা জীবন বীমা করিয়ে দিতে পারবেন কি?
নিশ্চয়ই, কোয়ারেল। কালকেই আমি পোর্ট মারিয়াতে গিয়ে তার ব্যবস্থা করে ফেলব। বেশ বড় বীমা। এই ধর পাঁচ হাজার পাউন্ড। এবার বল আমরা কিসে চড়ে ঐ দ্বীপে যাব। নৌকায়?
হা ক্যাপ্টেন। শান্ত সমুদ্র আর একটু মৃদু হওয়া চাই। আর অন্ধকার রাত্রি। এখনি ঠিক সময়। দ্বীপের কোথায় নামবেন, ক্যাপ্টেন
দক্ষিণ উপকূলে, নদীর মোহনার কাছাকাছি। তারপর আমরা নদীর গতিপথ বেয়ে জলাশয়টার দিকে যাব। আমার বিশ্বাস ঐখানেই ওয়ার্ডেনদের তাবুটা ছিল, যাতে তারা মিষ্টি পানি পায় আর সমুদ্রে ধরতে পারে।
কোয়ারেল ঘোৎ করে আওয়াজ করল। বলল, কতক্ষণ থাকব ওখানে, ক্যাপ্টেন? পাউরুটি, পনির, নোনা শুয়োরের মাংস সঙ্গে নিতে হবে। তামাক নেওয়া চলবে না–ধোয়া আর আগুন অনেক দূর থেকে দেখা যায়। জায়গাটা কিন্তু। বড় বিশ্রী, জলাভূমি আর ঝোঁপঝাড়।
বউ বলল, দিন তিনেকের জন্য যাওয়াই ভাল। কারণ দুর্যোগের জন্য দু এক রাত্রি আটকে যেতে পারি। গোটা দুয়েক ভাল শিকারী ছুরি নিতে হবে। আমি একটা রিভলবার সঙ্গে নেব। কিছু বলা যায় না।
সত্যিই তাই, কোয়ালের জোরের সঙ্গে বলল। তারপর সে চুপ করে বসে-বসে কি যেন ভাবতে লাগল। পোর্ট মারিয়া পৌঁছানো পর্যন্ত তার দিক থেকে আর কোন শব্দ শোনা গেল না।
ছোট শহরটার ভেতর দিয়ে চলল তারা। অন্তরীপটা চক্কর দিয়ে তারা মর্গা হারবারে ঢুকল। ছোট রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে অজস্র স্মৃতি বন্ডের মনে ভীড় জমাতে লাগল। আঁখের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে নির্জন স্পেনদেশীয় পুরনো জাহাজের মত বোডেজার্ট প্ল্যানটেশানের বিরাট বাড়িটার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেল সে।
বাংলোর গেটে পৌঁছাল তারা। কোয়ারেল নেমে গেট খুলল। বন্ড গাড়িটা ঢুকিয়ে নিয়ে গিয়ে রাখল সাদা একতলা বাড়িটার একগজ পিছনে। বাড়ির পাশ দিয়ে লন বেয়ে গিয়ে সমুদ্রের ধারে দাঁড়াল। হ্যাঁ, এই সেই বিশাল, গভীর নিঃশব্দ পানির রাশি–এই পথ বেয়ে সাবমেরিনে চড়ে সে সারপ্রাইজ দ্বীপে গিয়েছিল। এখন মাঝে মাঝে সেই সব স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে তার কাছে ফিরে আসে। বন্ড সেদিকে তাকিরে সলিটেয়ার-এর কথা ভাবছিল, যে মেয়েটাকে সে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত অবস্থায় এই সমুদ্র থেকে তুলে এনেছিল। এই লনটা পেরিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ভেতরে। কেমন আছে এখন মেয়েটি? কোথায় আছে? স্মৃতির রেশগুলোকে মন থেকে তাড়িয়ে বন্ড রুক্ষভাবে ঘুরে বাড়িটার দিকে চলল!
