গাড়ির গতি বাড়তে লাগল ঘণ্টায় ১০০ মাইল ১১০, ১২০ কিন্তু তবু ব্যবধান কম হচ্ছে না। বন্ড হাত দিয়ে ড্যাশ। বোর্ডের ওপর একটা লাল সুইচ পুশ করল। গাড়ির ভিতর থেকে সাংঘাতিক যান্ত্রিক আর্তনাদ তার কানে এসে আঘাত হানল এবং তার গাড়ি স্পষ্টতঃই সামনের দিকে এক ধাক্কা খেল।–১২০, ১২৫-এবার দেখা গেল দূরত্ব কমে আসছে। ৫০ গজ, ৩০ গজ, ৪০ গজ। এবার সে গাড়ির সামনের ছোট্ট আয়নাটায় মেয়েটার চোখ দুটো অবধি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এবার কিন্তু ভাল রাস্তা আর পাওয়া যাবে না। তার ডান দিকে বিদ্যুৎ বেগে বেরিয়ে যাচ্ছে বিস্ময়ের চিহ্ন আঁকা একটা পোস্টার, যার সামনে রাস্তাটা খারাপ।
রাস্তাটা এবার সামান্য উঁচু হয়ে গেল দূরে দেখা গেল গীর্জার চুড়া। পাহাড়ের কোলে একটা ছোট গ্রামের একগাদা ঘিঞ্জী বাড়ি, আর রাস্তার পাশে একটা সতর্কতামূলক চিহ্ন মানে সামনের রাস্তাটা s অক্ষরের মত আঁকাবাঁকা আছে।
এখন দু টো গাড়িই স্পীড কমিয়ে দিয়েছে–ঘণ্টায় ৯০, ৮০, ৭০ মাইল। বন্ড দেখল অন্য গাড়িটার পিছনের আলো জ্বলে উঠেছে, আরো দেখল মেয়েটির ডান হাতে আছে গীয়ার। তারপরেই এসে পড়ল বাঁকটায়, কাঁচা নুড়ি ছড়ানো রাস্তা–তখন বন্ডকে ব্রেক কষতে হল। সে হিংসের চোখে দেখতে থাকল মেয়েটির গাড়িটা কিভাবে সহজভাবে কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটে চলেছে। এটা তার গাড়ির ক্ষমতার বাইরে। চোখের পলকে রাস্তা ফুরিয়ে এল। আবার বাঁকটা শেষ হতেই মেয়েটি পুরোদমে গাড়ি সামনের দিকে চালিয়ে নিল খাড়া রাস্তার উপর দিয়ে। বন্ড আবারও পঞ্চাশ গজ পেছনে পড়ে গেল।
ওদের দুজনের মধ্যে রেস শুরু হল। এবার সোজা রাস্তা পড়ে গেলেই বন্ড দ্রুত এগিয়ে আসছে। কিন্তু গ্রামের পথে এলে ল্যানসিয়ার চাকাগুলোর আশ্চর্য রাস্তা আঁকড়ে ধরার শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে পিছনে পড়ে গেল। এই বিফলতার পিছনে যে মেয়েটার বিস্ময়কর দুঃসাহসিক গাড়ি চালানোর ক্ষমতাও অনেকটা দায়ী, তাকে স্বীকার করতে বাধ্য হল। এখন পুনরায় রাস্তার পাশে একটা লেখা দেখা গেল–মন্ট্রিল-৫ মাইল, রয়েল-লে উ-১০ মাইল, ল্য তুকে পরিপ্লাগ-১৫ মাইল। মেয়েটা কোথায় যেতে পারে তাই-ই বন্ড ভাবছে। মনে মনে সে বিচার করতে থাকল যে। রয়েল হোটেল এবং সেখানকার ক্যাসিনোয় এক রাত্রি কাটাবার জন্য এই মেয়েটির সঙ্গ নেবে কিনা–শয়তানটাকে, জানার জন্য।
এই সিদ্ধান্ত নিতে বন্ডের একটুও দ্বিমত হল না। মন্ট্রিলের পথ অতি বিপদের আঁকাবাঁকা, নুড়িতে ভরা আর সর্বদা চাষীরা যাওয়া-আসা করে। বন্ড মেয়েটার থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে আছে। কিন্তু মন্ট্রিলে ঢোকার পর বন্ড তার গাড়ি নিয়ে সেই সব আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে মেয়েটাকে কিছুতেই অনুসরণ করতে সক্ষম হল না। শহর ও লেভেল ক্রসিং পার হয়ে যেতে যেতে মেয়েটি চোখের আড়ালে চলে গেল। কিছু দূরে গিয়ে পথটা বাঁদিকে চলে গেছে হোটেল রয়েলের দিকে। মোড়ের ঠিক মুখে পাতলা একটু ধূলোর মত মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। বাঁদিকে গাড়িটা ঘুরিয়ে নিল বন্ড। কেন। যেন বন্ডের মনে হতে থাকল মেয়েটার সাথে তার আবার দেখা হবে। সামনের দিকে নিচু হয়ে বন্ড লাল সুইচটা বন্ধ করে দিল। ব্লোআরের গোঙানির শব্দ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। কোন শব্দ না করে গাড়ি চলছে। উত্তেজিত শরীরের পেশীগুলিকে স্বাভাবিক করে বন্ড ভাবছিল সুপার চার্জারটা ইঞ্জিনকে জখম করছে কিনা। রোলস রয়েস কোম্পানীর গম্ভীর এক সাবধান বাণীকে অগ্রাহ্য করে সে তার গাড়িতে ম্যাগনেটিক ক্লাচ কন্ট্রোলড এই আর্নট সুপার চার্জটি মোটেই : সহ্য করা যায় না ও তাদের পত্রপাঠ গ্যারান্টি ইত্যাদি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাদের এই ক্ষেত্রজ ছেলেটি (অথবা গাড়িটি) সম্পর্কে হাত ধুয়ে ফেলে। এই প্রথম গাড়িটাকে বন্ড ঘণ্টায় ১২৫ মাইল অবধি নিল। রিভোলিউশন কাউন্টারের কাঁটাটা। বিপদের কাছেই ছুঁয়ে গেল, তবে তেল ও গাড়ির তাপমাত্রা একদম ঠিক ছিল আর যদি সত্যি বলতে হয় তো মজাও বেশ লাগছিল।
নবীন বীচ গাছ আর তার সুগন্ধ ভরা পাইনের সারিতে দিব্য সাজানো হোটেল রয়েলের যাওয়ার পথে সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে সহজ গতিতে গাড়ি চালাতে চালাতে বন্ড অনেক আগ্রহ নিয়ে সামনের সন্ধ্যেবেলার কথা ভাবছিল। তার মনে পড়ে গেল, প্রতি বছরের মতন তীর্থ যাত্রীদের নিয়মিত এই যাতায়াতের কথা। বিশেষ ভাবে মনে হয়েছিল বহু বছর পূর্বে জুয়াখেলার টেবিলের ল্য শিফরের সাথে তার সেই বিশাল ও ভয়ংকর জুয়াখেলার স্মৃতি। সে সেই দিন থেকে বহু দূরে চলে আসে–অনেক বুলেট, অনেক নিশ্চিত মৃত্যুকে পাশে রেখে এবং অনেক মেয়ের সাথে প্রেম করেছে। কিন্তু সেই পুরানো রহস্যজনক অ্যাডভেঞ্চারটার ভিতর একটা নাটকীয়তা, একটা মদিরতা আছে যা প্রতি বছর তাকে এই হোটেল এবং বিখ্যাত ক্যাসিনোর রয়েলে টেনে নিয়ে আসে।
আজ এই সমারোহ অপরূপ সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যার সময় ক্যাসিনোতে তার জন্য হয়ত অপেক্ষা করছে একটা বড় সফলতা, এক ব্যাথাময় পরাজয়। এক অজানা সুন্দরী, সেই মুহূর্তের দেখা সুন্দরীটি।
প্রথমেই জুয়াখেলার কথা ভাবতে হবে। আজকের এই শনিবার রাতে ক্যাসিনো রয়েল বর্তমান ঋতুর শেষ রাতের উদ্ভাবন করবে। এ এক বিরাট উৎসবের রাত। বহুদূরে বেলজিয়াম ও হল্যান্ড থেকেও লোক আসবে এতে যোগদান করতে। প্যারিস এবং লি-এর বড়লোক খদ্দেররা তো আছেই। এছাড়া প্রত্যেক বছরের মতন আজও রয়েলের প্রধান কর্তা স্থানীয় সমস্ত কন্ট্রাক্টর ও যারা সরবরাহকারীরা রাতের এক বিরাট ভোজন আয়োজন করেছেন। বিনা পয়সায় শ্যাম্পেন দান করা হবে সারারাত ধরে মদের ফোয়ারা। খুব বেশি দিন নয় এই অনুষ্ঠানটি পরদিন সকালের আগেই শেষ হয়ে যাবে। জুয়ার প্রত্যেকটি টেবিল সারা রাত ভর্তি থাকবে, আর রীতিমত চড়া বাজির খেলা চলতে থাকবে।
