হঠাৎ ভীষণ ক্লান্তি লাগছে। মাত্র চারটে বাজে–কিংসটনের উত্তাপ তার সর্বাঙ্গ ঝলসে দিচ্ছে। বন্ড ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে ফিরে চলল। আজ সারাদিন ভালোই কাজ হয়েছে। আজ রাতটা কোনরকমে কাটিয়ে কাল ভোরেই পালাতে হবে।
রিসেপশান ডেস্কের কাছে গিয়ে বন্ড জানতে চাইল কোয়ারেলের কাছ থেকে কোন সংবাদ আছে কিনা।
কোন খবর নেই স্যার, তবে রাজবাড়ি থেকে একঝুড়ি ফল এসেছে। মধ্যাহ্নভোজের ঠিক পরেই।
লোকটি দেখতে কেমন?
একজন কালো আদমী স্যার। বলল যে সে এ.ডি.সি-র অফিস থেকে আসছে।
ধন্যবাদ। বন্ড ঘরের চাবিটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল। তার হাত চলে গেল কোটের পকেটে পিস্তলের ওপর। পা টিপে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
বন্ড ভেতরে গিয়ে দরজাটার তালা বন্ধ করল। তার ড্রেসিং টেবিলে রাখা আছে একটি বিরাট সুন্দর ফলের ঝুড়ি। তার মধ্যে সাজানো কমলালেবু, বাতাবিলেবু, সিঁদুরে কলা, আতা, আপেল, এমন কি গোটা দুয়েক তাজা পীচ ফল। ঝুড়ির হাতলে রিবনে বাধা একটি সাদা খাম। সেটা খুলে বন্ড দেখল–রাজ্যপালের আন্তরিক শুভেচ্ছাসহ।
বন্ডের নাক দিয়ে একটা আওয়াজ বেরোল। একবার ঝুড়ির গায়ে কান লাগিয়ে শুনল। তারপর হাতল ধরে ঝুড়িটাকে মেঝেতে উপুড় করে দিল। ফলগুলো লাফিয়ে গড়িয়ে, ছড়িয়ে পড়ল। তবু একটা সম্ভাবনা থেকে গেল। প্রথমে পীচ ফলটি তুলে নেওয়াই স্বাভাবিক। বন্ড তারই একটা নিয়ে বাথরুমে ওয়াশ বেসিনে সেটিকে রেখে আবার শোবার ঘরে ফিরে এল।
আলমারির তালা পরীক্ষা করার পর সে সেটা খুলল। সুটকেসটা বার করে সে এসে দাঁড়াল ঘরের মাঝখানে। চাবি লাগানোর জায়গাতে সে পাউডার লাগিয়ে রেখেছিল। পাউডারগুলো জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে এবং চারপাশে অস্পষ্ট আঁচড়ের দাগ। যে লোকটি তার ঘরে অনুসন্ধান কার্য চালিয়েছে তাকে সাবধানী বলা চলে না।
সুটকেসের ডালা খুলে বন্ড তার যন্ত্রপাতির বাক্স থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ঠুলি বার করল। তারপর বাথরুমে গিয়ে দাড়ি কামাবার আয়নার সামনের আলোটা জ্বালাল। ঠুলি চোখে লাগিয়ে নিয়ে ওয়াশ বেসিন থেকে পীচ ফলটি নিয়ে আস্তে আস্তে চোখের সামনে যোরাতে লাগল।
ঘোরানো বন্ধ করল বন্ড। সে ফলের গায়ে একটা খুব ছোট ছিদ্র দেখতে পেল। ছিদ্রটার ধারগুলো ঈষৎ বাদামি। ফলের গায়ে খাজের মধ্যে একটা এমন লুকিয়ে ছিল, যে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের সাহায্য ছাড়া খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বন্ড সাবধানে ফলটিকে ওয়াশ বেসিনে নামিয়ে রাখল। বিষাক্ত ফল!
তাহলে যুদ্ধ বেধেই গেল। বেশ, বেশ! আনন্দের কথা। বন্ড অনুভব করল তার তলপেটের পেশী হঠাৎ কেমন শক্ত হয়ে গেল। তাহলে তার অনুভূতি এবং যুক্তি ঠিক পথেই চলেছে। স্ট্র্যাংওয়েজ আর মেয়েটাকে খুন করা হয়েছে কারণ, তারা সঠিক পথেই চলতে শুরু করেছিল। সে যে রু-হিল হোটেলে উঠেছে সে খবর তারা পেয়েছে। তাকে লক্ষ্য করে প্রথম গোলাটা ছোঁড়া হল। পরের গুলোও আসছে। কিন্তু ট্রিগারের উপর আঙুলটা কার? কে তাকে এমন সুন্দর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে? বন্ড বিনা দ্বিধায় স্থির করল যে গোলা আসছে অনেক দূর থেকে, ক্র্যাব-কী থেকে। এবং গোলন্দাজটি হলের স্বয়ং ডক্টর নো।
বন্ড শোবার ঘরে ফিরে গেল। এক একটা করে সবকটা ফল বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের সাহায্যে পরীক্ষা করল। চুঁচ ফোঁটানোর দাগ ছিল প্রত্যেকটার বোটার কাছে বা কোন একটা খাজের ভেতর লুকানো। বন্ড নিচে ফোন করে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স, কিছু কাগজ আর দড়ি চেয়ে পাঠাল। সবকটা ফল সযত্নে বাক্সটায় বেঁধে ফেলে টেলিফোনে রাজবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে কলোনিয়াল সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলতে চাইল।
কে? প্লেডেল স্মিথ? জেমস বন্ড কথা বলছি। একটু মুশকিলে পড়েছি। কিংসটনে কি কোন পেশাদার কেমিক্যাল অ্যানোলিস্ট আছেন? ঠিক আছে। আমার কিছু জিনিস পরীক্ষা করতে চাই। আমি যদি তোমার কাছে বাক্সটা পাঠিয়ে দিই তুমি কি সেটা সেই ভদ্রলোককে পৌঁছে দিতে পারবে? এ ব্যাপারে আমার নাম উল্লেখ না হয় বুঝেছ তো? তার রিপোর্ট পেলে আমাকে টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দিও। সামনের সপ্তাহটা আমি মর্গান হারবারের বো-ডেজার্টে থাকব। পরে দেখা হলে সব বলব। অবশ্য অ্যানালিস্টের রিপোর্টটা দেখলে তুমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারবে। আমার ভাগ্য ভাল, আজ সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বিদায়।
পার্সেলটার ওপর ঠিকানা লিখে বন্ড নিচে নেমে গেল। একটা ট্যাক্সী ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে বলল রাজবাড়িতে এটাকে পৌঁছে দিতে। ছ টা বাজে। ঘরে ফিরে এসে সে শাওয়ারে গোসল করল। জামাকাপড় বদলে রাত্রের প্রথম পানীয়টি আনাল। গ্লাসটা হাতে নিয়ে বারান্দায় যাবে এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কোয়ারে ফোন করছে।
সব ঠিক করে ফেলেছি, ক্যাপ্টেন।
সব কিছু বহুৎ আচ্ছা। বাড়িটা পেয়েছ?
সব হয়ে গেছে। যথাসময়ে দেখা হবে, ক্যাপ্টেন।
চমৎকার। বন্ড বলল, কোয়ারেলের কর্মদক্ষতা আর সতর্কতায় সে খুশি হল।
বন্ড ভাবছিল, ওটা শহরে এসে পৌঁছলেই আলোগুলো জ্বলবে। ঠিক তাই হল। মাথার ওপরে প্লেনের গর্জন শোনা গেল। বিমানটাকে দেখা গেল–একটা সুপার কনস্টেলেশন। গতরাত্রে এইরকম একটা বিমানেই বন্ড ছিল। বন্ড দেখল প্লেনটা কেমন সমুদ্রের ওপর বিরাট চক্কর মেরে প্যালিসাডোর্স এয়ারপোর্টের দিকে ঘুরল। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় কতদূর চলে এসেছে সে।
