বন্ড বলল, আপনার কি মনে হয় জায়গাটা এতই দাম? এর দাম কত হতে পারে বলে আপনার ধারণা?
প্লেডেল স্মিথ বললেন, গুয়ানে পাখি হচ্ছে পৃথিবীর সেরা দামের পাখি। এক জোড়া গুয়ানে প্রতি বছর দু-ডলারের মত গুয়ানো তৈরি করে–আর এজন্য মালিককে একটি পয়সাও খরচ করতে হয় না। প্রতিটি স্ত্রী গুয়ানে গড়ে তিনটি করে ডিম পাড়ে বছরে দু বার। আর প্রতিবার তার মধ্যে দুটো বাচ্চা হয়। ধরা যাক এক জোড়ার দাম পনেরো ডলার আর ক্র্যাব-কীতে লাখ খানেক পাখি আছে। বেশ বড় সম্পত্তিই বলা যায়। প্লেডেল স্মিথ ঘণ্টা বাজালেন, আহা! ঐ ফাইলটাতেই তো সব আছে–সেটার হল কি?
বন্ডের পেছনের দরজা খুলল, ফাইলগুলোকে এখনো দিলে না, বলি ব্যাপার কি, মিস তারো?
নরম গলায় মেয়েটি বলল, আমরা দুঃখিত স্যার, ফাইলগুলো কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না মানে? এর আগে কে ঐ ফাইল চেয়েছিল?
কম্যান্ডার স্ট্র্যাংওয়েজ, স্যার।
আমার স্পষ্ট মনে আছে ফাইলগুলো ফেরত এসেছিল এই ঘরে। তারপর সেগুলোর কি হল?
বলতে পারি না স্যার। মলাটগুলো আছে কিন্তু ভেতরে কিছু নেই। বন্ড একবার ঘুরে মেয়েটিকে দেখে আবার ঠিক হয়ে বসল। সে জানত ফাইলগুলো কোথায় আছে। এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারল তার সম্পর্কের পুরনো ফাইলটা কেন সেক্রেটারির টেবিলের ওপর ছিল। সে বুঝল তার এখানে আসবার কথা। জেমস বন্ড নামটা। কিভাবে এখানে বিশেষ জায়গায় পৌঁছে গেছে। ডক্টর নো যেমন–মিস অ্যানাবেল চুং যেমন–তেমনি লাজুক নম্র খাঁটিয়ে চেহারার এই শিং এর ফ্রেম-এর চশমা পরা মেয়েটিও তাই–চীনে।
.
শত্রুর সন্ধান
কলোনিয়াল সেক্রেটারি বন্ডকে লাঞ্চ খাওয়ালেন কুইনস্ ক্লাব-এ। তারা মেহগনির প্যানেল দেওয়া ভোজঘরের একটি কোণে বসে জ্যামাইক নিয়ে গল্পগুজব করলেন। কফি যখন এল সেই সময়ের মধ্যে প্লেডেল স্মিথ পৃথিবী যাকে জানে একটি শান্তিময় জায়গা বলে, সেই অঞ্চলের অনেক গভীরে তলিয়ে গেছেন কথায় কথায়।
পাইপ নিয়ে কায়দা করতে করতে তিনি বললেন, ব্যাপারটা হল এই-জ্যামাইক্যানরা মোটামুটি অলস, দয়ালু এবং এদের পাপপুণ্য সবই ছোট ছেলেমেয়েদের মত। একজন জ্যামাইকান খুব সমৃদ্ধ দ্বীপে থাকে। কিন্তু নিজে কখনো ধনী হয় না। প্রথমত সে ধনী হবার কায়দা জানে না। দ্বিতীয়ত সে অত্যন্ত অলস। ইংরেজরা আসে-যায়, আর কিছু হাতিয়ে নিয়ে সরে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি মারে ইহুদীরা। তারা বৃটিশদের সঙ্গে এসে আর যায়নি। কিন্তু তারা আবার খুব জাকজমক পছন্দ করে। তারা বাড়ি তৈরি করতে দারুণ খরচ করে। পার্টি দেয়। নাচের ব্যবস্থা করে। তাদের ব্যবসা রাম ও তামাক। তারা এদিকে বড় বড় বৃটিশ ব্যবসাদারের প্রতিনিধিত্ব করে। তারপরের লাইনে আছে সিরীয়ানরা। খুব বড়লোক কিন্তু ব্যবসায় বড় কাঁচা।
ভারতবর্ষের লোকেরাও এখানে ব্যবসা করে বিশেষ করে ঝকমকে জিনিসের কারবার এদের। তারা দলে ভারি নয়। এছাড়া আছে চীনেরা। শক্ত সমর্থ বেশ গুছিয়ে কারবার করতে পারে। আর এরাই জ্যামাইকার সবচেয়ে শক্তিশালী সম্প্রদায়। এদের বেকারী আছে, লন্ড্রী আছে আর ভাল খাবারের দোকানগুলো। তারা অন্য জাতের সঙ্গে আত্মীয়তা করে না। অবশ্য কখনোই যে তারা কালো মেয়েদের সঙ্গে মেশে না এমন বললে ভুল হবে। কারণ সারা কিংসটন জুড়ে তার প্রমাণ দেখতে পাবেন। আমি নিগ্রোদের কথা বলছি। তারা নিগ্রোদের নিচু জাত বলে মনে করে চীনেদের কাছে তারা নিচু জাত।
বন্ড বলল, আপনার সেক্রেটারি বোধহয় ওদেরই একজন। হ্যাঁ। মেয়েটার বুদ্ধি আছে আর চটপটে। মাস ছয়েক হল এ কাজে যোগ দিয়েছে।
বন্ড বলল, ওকে দেখে তো চালাকই মনে হয়। তা, এদের সংগঠন কেমন? নিগ্রো সমাজের কোন প্রধান ব্যক্তি আছেন নাকি?
এখনও এমন কেউ নেই, তবে হতে কতক্ষণ? তখন তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ দলে পরিণত হবে। ভাল কথা, এবার আমাকে পালাতে হচ্ছে। ঐ ফাইলগুলোর সম্বন্ধে কোন আইন কানুনের ঝামেলা আছে কিনা জানতে হবে। আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে… থামলেন তিনি।
বললেন, যাই হোক, আসলে আমি আপনাকে ক্র্যাব-কী এবং ঐ ডাক্তার ভদ্রলোক সম্পর্কে বিশেষ কিছু খবর দিতে পারলাম না। গোটা দুয়েক যুদ্ধের খবর আর সর্বশেষে যে অর্ডিন্যান্স সার্ভে হয়েছিল তার একটা কপি। পাণ্ডব বর্জিত যাচ্ছেতাই জায়গা। আপনি জ্যামাইকা ইনস্টিটিউটে যাচ্ছেন তো? চলুন ওখানকার মানচিত্র বিভাগের অধিকর্তার সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই।
পরবর্তী একঘণ্টা বন্ড লাইব্রেরির একটা কোণে বসে ক্র্যাব-কীর অর্ডিন্যান্স সার্ভের ম্যাপটি পর্যবেক্ষণ করে একটা খসড়া তৈরি করল। দ্বীপটির বিস্তৃতি প্রায় পঞ্চাশ বর্গমাইল। পূর্বদিকে দ্বীপটির বারোআনা জুড়ে কেবল জলাভূমি আর একটা গভীর জলাশয়। জলাশয়টি থেকে একটা নদী এঁকে বেঁকে নেমে গেছে সমুদ্রের দিকে। পশ্চিমদিকের দ্বীপটি পাঁচশ ফুট উঁচু পাহাড়ের রূপ নিয়েছে। এই পাহাড়টি চিহ্নিত করে ম্যাপে লেখা আছে- গুয়ানোর স্তূপ। কোনরকম হাঁটাপথের চিহ্নমাত্র নেই। রিলিফ ম্যাপে দ্বীপটাকে একটা ভাসমান উঁচর মত দেখাচ্ছে। ম্যাপ দেখে বোঝা গেল ক্র্যাব কীর চারিদিকে অগভীর পানি, কেবল পশ্চিম দিক ছাড়া। সেদিকের সবচেয়ে কম গভীরতা হল পাঁচশ ফ্যাদম। তার ঠিক পরেই কিউবা দ্বীপ-এর অতলস্পর্শী গভীরতা।
