দশ মিনিট পর বন্ড কোয়ারেলকে বলল গাড়িটাকে কিংসটনের দিকে নিয়ে যেতে। মনে হয় আমাদের খুঁজছিল গাড়িটা। একটু চোখ খোলা রেখ, ওকে বোকা বানিয়েছি বুঝতে পেরে সে আমাদের জন্য কোথায়ও ওৎ পেতে থাকতে পারে।
হা ক্যাপ্টেন ঠিকই বলেছেন।
এবারে তারা কিংসটনের গাড়ির স্রোতের মধ্যে বাস, মোটরগাড়ি, ঘোড়ায় টানা গাড়ি, বড় বড় ঝুড়ি নিয়ে গাধার দল, তাছাড়া নানারকমের ঠেলাগাড়ি, পেছনে অনেক গাড়ি, তাদের মধ্যে যে কোনটাই সেই আমেরিকান ট্যাকসি হতে পারে। সোয়া এক ঘণ্টা তারা ঐভাবে চলল–হ্যাফওয়ে ট্রি পর্যন্ত। তারপর গেল জংশন রোডের দিকে। তারপরই দেখা গেল একটা নিয়ম আলোয় আঁকা সবুজ তালগাছের ছবি, তার তলাতেই লেখা রু হিলস্ শ্রেষ্ঠ হোটেল বলতে এটাই। তারা হোটেলে ঢুকে গেল।
উপরের দিকে একশ গজ দূরে কালো ট্যাকসিটার ড্রাইভার অন্য সব গাড়িকে সাবধান করে বাঁ দিকে মোড় ঘুরল। তারপর একেবারে ঘুরিয়ে দিল কিংসটনের দিকে গাড়িটাকে।
ব্লু হিলস্ হোটেলটা পুরোনো আমলের, বেশ আরামেই থাকা যায় এখানে। বন্ডকে হোটেলের লোকেরা সবাই ভক্তিভরে অভ্যর্থনা করল কারণ ওর ঘরটা রিজার্ভ করেছিল রাজবাড়ি থেকে। তার ঘরটা ছিল বারান্দা সমেত এক কোণে। বারান্দা থেকে দেখা যায় দূরের বন্দরের দৃশ্য। খুশি হয়ে সে পোশাক ছেড়ে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল। পাঁচ মিনিট ধরে পরিষ্কার হল। তারপর আইল্যান্ডের ছোট প্যান্ট পরে নিল। সব জিনিস গুছিয়ে ওয়েটারকে ডাকল।
বন্ড বড় একটা গ্লাসে জিন আর টনিক আনতে বলল, সঙ্গে পুরো একটা লেবুর রস। লেবুর রস বের করে গ্লাসের প্রায় সবটাই ভরিয়ে ফেলল বরফ টুকরো দিয়ে। তারপর টনিক ঢেলে দিল। পানীয়টা নিয়ে সে বারান্দায় গেল। ভাবল হেড কোয়ার্টার থেকে দূরে থাকার আনন্দ আছে। তার মন বলছে যে এবারের কাজটা বেশ শক্ত গোছের হবে।
রাস্তাটা যেখানে সমুদ্র থেকে বেঁকে অন্যদিকে গেছে সেখানে উজ্জ্বল সোনালি রঙের নিয়ন আলোয় একটি স্পেন দেশের প্রাচীন জাহাজ আঁকা। তার উপর সবুজ আলোয় লেখা–দি জয় বোট। তারা মোটর গাড়ি রাখবার জায়গায় এল। গাড়ি থামানোর পর কোয়ারেলের পেছন পেছন বন্ড গেটের ভিতর দিয়ে এল। সেখানে একটা ছোট তাল বাগান। তারপরেই সমুদ্রের ধার। তালগাছের তলায় প্রচুর টেবিল পাতা রয়েছে। ঠিক মাঝখানে নাচের জায়গা, তার এক কোণে তিনজন ক্যালিপসো নাচছে।
অর্ধেক টেবিলে লোক, অধিকাংশই কালো। কয়েকজন আমেরিকান আর ইংরেজ নাবিক তাদের মেয়েদের নিয়ে বসে আছে। দারুণ মোটা একজন নিগ্রো সাদা ডিনার জ্যাকেট পরে বসেছিল। সে এসে সামনে দাঁড়াল।
এই যে মিস্টার কিউ, বহুদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই। দু জনের জন্য ভাল টেবিল চাই?
ঠিক বলেছ অক্টোপাস ভায়া, গান বাজনার চাইতে রান্নাঘরের কাছাকাছি হলেই ভাল হয়।
বড় চেহারার লোকটি তাদের সমুদ্রের দিকে একটা শান্ত পরিবেশে তাল গাছের তলায় বসিয়ে দিল। তালগাছটা একেবারে রেস্তোরাঁর বাড়ির ভিত থেকে বেরিয়েছে। কিছু পানীয় চাই কি?
বন্ড চাইল তার প্রিয় জিন এবং টনিক, সঙ্গে একটা লেবু, আর কোয়ারেল নিল একটা রেড স্ট্রাইপ বীয়ার। আর বলল, বড় চিংড়ির একটা রান্না, ঝলসানো স্টেক আর ওখানকার কিছু সবজি। পানীয় এল।
কোয়ারেল বলল, ঐ অক্টোপাস ভায়া আমার বন্ধু। লোকটা বড় ভাল। প্রিন্সটনে কি সব হচ্ছে তার সব খবরাখবর ওর জানা। আমাদের দুজনের একটা নৌকা ছিল একসময়ে। তারপর একদিন সে ক্র্যাবৃ-কীতে বুঝি হাঁসের ডিম সংগ্রহ করতে গেল। সে সাঁতরিয়ে একটা পাথরের দিকে গেছে আরো ডিম পাবার আশায়। এমন সময় বিরাট একটা অক্টোপাস তাকে আক্রমণ করে। ঐ অক্টোপাসটা ছিল বিরাট। অক্টোপাস ভায়ার সঙ্গে এই জন্তুটার মোলাকাত হওয়াতে তাকে বেশ কষ্ট পেতে হয়। নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার সময় একটা ফুসফুস ফেসে যায়। সেই থেকে তার ওসব কাজে যাবার সাহস হয় না। নৌকার অর্ধেক অংশ বেচে আমাকে দিয়ে সে কিংসটনে চলে যায়। সে যুদ্ধের আগের কথা। এখন ও হচ্ছে বড়লোক আর আমি এখন মাছ ধরেই চলেছি।
বন্ড বলল, ক্র্যাব-কী জায়গাটা কেমন?
কোয়ারেল তার দিকে ধারাল দৃষ্টিতে তাকাল। জায়গাটা এখন দারুণ অলক্ষুণে, ক্যাপ্টেন। এক চীনে ভদ্রলোক যুদ্ধের সময় জায়গাটা কিনে নেয়, তারপর লোকজন নিয়ে এসে পাখির নোংরা খুঁড়তে শুরু করে। কাউকে ঐ জায়গায় যেতে দেয় না, নামতেও দেয় না।
কেন?
লোকটার অনেক পাহারাদার। বন্দুক, মেশিনগান রাডার এমনকি বিমানও আছে। আমার কিছু বন্ধু ঐ জায়গায় গিয়ে আর ফেরেনি। ঐ চীনেটা কাউকে ওখানে যেতে দেয় না, এটাই হচ্ছে আসল কথা। জায়গাটাতে আমার দারুণ ভয়, ক্যাপ্টেন।
বন্ড চিন্তিতভাবে বলল, তাই নাকি, তাই নাকি? খাবার এল। তারা আবার এক পাত্র করে মদ খেয়ে খাবারে মন দিল। খেতে খেতে বন্ড স্ট্র্যাংওয়েজ-এর সম্পর্কে মোটামুটি সংক্ষেপে সব বলল। কোয়ারেল মন দিয়ে সব শুনল। ক্র্যাব-কীর পাখিদের সম্বন্ধে তার জানবার আগ্রহ বেশি দেখা গেল। বিমান ভাঙা সবই সে-আগ্রহের সঙ্গে শুনল। একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বেশ আস্তে আস্তে বলল সে, ক্যাপ্টেন, আমি জানি না ওখানে পাখি ছিল, কি মৌমাছি ছিল, কি প্রজাপতি ছিল। ক্র্যাব-কীতে কম্যান্ডার সাহেব নাক গলাতে গিয়েছিলেন বলেই ওকে ওরা খতম করেছে, আমি সর্বস্ব বাজী রেখে বলতে পারি। ওকে আর ওঁর মেয়ে বন্ধুকে দু জনকে ওরাই শেষ করেছে।
