(১) প্রায় এক বছর হল আমি ডাবল জিরো বিভাগের কর্মে নিয়োগ ছিলাম ও সময় সময় আপনিও থাকেন, মহাশয় তাই আমার কাজে অনিহা প্রকাশ করে আমার আনন্দ প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু অত্যধিক দুঃখের ব্যাপার হল যে, (এই সুন্দর কথাটি ব্যবহার করতে পেরে বন্ড খুব খুশি হল) অপারেশন থান্ডারবল -এর সাফল্য শেষ হলে আমাকে দীর্ঘদিনের জন্য (আরেকটা চমৎকার কথা) নিয়োগ করা হল আর্নস্ট স্বাভো ব্লোফেন্ড এবং প্রেতাত্মা সংঘ অর্থাৎ SPECTRE-The Special Executive for Counter intelligence, Revenge and Extortion-এর (অর্থাৎ প্রতি-গুপ্তচরবৃত্তি, সন্ত্রাসবাদ, প্রতিহিংসা ও অত্যাচারের বিশেষ কার্যনির্বাহক সংস্থা) অনুসরণ ও গ্রেফতারের কাজে–অবশ্য যদি অপারেশন থান্ডার বলের চরম মুহূর্ত হয়ে যাবার পর উক্ত সংস্থা পুনর্গঠিত হয়ে যায়।
(২) হয়ত আপনার মনে থাকবে আমার মত না থাকা সত্ত্বেও এই কাজে হাত দিয়েছিলাম এবং একথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলাম যে এটা মনে হয় একটি অনুসরণের কাজ, যার সমাধান সরল পুলিশী সহায়তায় বা আমাদের গুপ্তচর সংস্থার অন্যান্য বিভাগের (যথা আঞ্চলিক বিভাগ সমূহ, সম্মিলিত বৈদেশিক গুপ্তচর সংস্থা) বা ইন্টারপোলের সাহায্যেও সম্ভব। আমার এই রূপ আপত্তিতে কানে দেওয়া হয়নি এবং গত এক বছর হল আমি প্রতিটি সামান্য গুজব বা সূত্র অনুসন্ধান করে সারা পৃথিবী শুদ্ধ যে বিরামহীন গোয়েন্দাগিরিতে ব্যাপৃত ছিলাম, তা সম্পূর্ণভাবে বিফল হয়েছে। অবশ্য ঐ ব্যক্তি বা প্রেতাত্মা সংঘের, যদি আদৌ এই সংঘের অস্তিত্ব থাকে, তার কোন চিহ্নই পাওয়া যায় না।
(৩) এই বিরক্তিকর ও নিষ্ফল কর্মভার থেকে মুক্তি পাবার জন্য আমার অজস্র অনুরোধের চিঠি স্বয়ং আপনাকে লিখছি। তাই মহাশয়, এই চিঠি গুলিও সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে, বা কয়েকটি ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্লোফেন্ড যে মরে গেছে এ সন্দেহ যতবারই আমি প্রকাশ করেছি, ততবারই আমার এই মতটির প্রতি যে পরিমাণ সৌজন্য দেখাবার, তাকে সামান্য বললেও দ্বিরুক্তি হয় না (চমৎকার! বোধহয় একটু বেশিই সুন্দর হবে)।
(৪) উপরে বর্ণিত আনন্দহীন পরিবেশের চরম সীমায় গিয়ে পালের্মোতে আমার এই সময়ের গুপ্ত-অভিযান (দ্রষ্টব্য ও স্টেশন R-এর PX. 437/007) শেষ হয় একটি মারাত্মক রকম ভ্রান্ত সূত্রের অনুসরণে। শেষ পর্যন্ত জানতে পারলাম, আমার শিকারটির নাম ব্লউয়েন ফেন্ডার–এক অতীব উচ্চস্থানীয় জার্মান নাগরিক, যিনি এই সময়ে আঙুর-চাষের, বিশেষতঃ এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় সিসিলীয় আঙুরে চিনির পরিমাণ বৃদ্ধির কাজে ব্যস্ত আছেন। এই ভদ্রলোকের উপর অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি মাফিয়া দলের কুচোখে পড়ি এবং যথেষ্ট অপমানজনক ভাবেই আমাকে সিসিলি ত্যাগ করতে হয়।
(৫) উপরোক্ত কারণের জন্য, এবং বিশেষতঃ যে সকল শক্তির জন্য, তাহা যত সামান্যই হোক না কেন, আমি ডাবল জিরো বিভাগের অধিকতর দুঃসাধ্য অথচ ফলস্বরূপ কাজের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছিলাম, সেই সকল ক্ষমতার দীর্ঘ অপব্যবহারের জন্যও আমি অতি বিনয়ের সাথে পদত্যাগ পত্র জমা দিচ্ছি।
ইতি
আপনার অনুগত এক কর্মচারি 007
অবশ্য এ পত্রের অনেকটাই আবার লেখা দরকার হবে, আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে লম্বা গাড়িটাকে বন্ড চালাতে চালাতে ভাবছিল এইসব। কয়েকটা স্থানে বড় জাকালো হয়ে যায়, আবার সামান্য জায়গায় জায়গায় পালিশ দিতে হবে বা সুরটাকে খানিক কোমল করতে হবে। তবে মোটামুটিভাবে এই জিনিসগুলি যে পরশুদিন অফিসে পৌঁছে তার সেক্রেটারিকে লিখে দিতে বলতে হবে। আর ভদ্রমহিলাকে যদি উচ্চস্বরে কাঁদতে দেখা যায় তবে তাকে জাহান্নামে যেতে হতে পারে। বন্ড কিন্তু সত্যি করেই ভেবে নিয়েছিল, ব্লোফেন্ডের ছায়া তাড়া করে সে একেবারে তিতিবিরক্ত হয়ে আছে। প্রেতাত্মা সংঘের ব্যাপারেও তাই হবে। তাই এই সংঘকে একবার উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও আশ্চর্যভাবে ব্লোফেন্ড বেঁচে গিয়েছে। তবে একেবারে অতবড় এক অন্যায়কারী সংস্থাকে নতুন করে চালু করে তার আশ্চর্য উন্নতি করা তার পক্ষেও সম্ভব নয়।
আর ঠিক এই সময়ও ঘটনাটা ঘটে গেল। বন্ড যাচ্ছিল জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা দশ মাইল লম্বা পথ দিয়ে তীক্ষ্ণ, তীব্র বেসুরো বাঁশির মতন ওয়াইন্ড-হর্নটা বাজিয়ে দিয়ে একটা হুডখোলা নিচু সাদা ল্যানসিয়া ফ্ল্যামিনিয়া। সাগাটো স্পাইডার দুসীটার গাড়ি অত্যধিকভাবে তীরবেগে তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটার জোড়া একসৃষ্ট পাইপের অদ্ভুত গর্জন সার বাধা গাছগুলোর গা থেকে একটা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে যায়। সেই গাড়িটাকে একটি মেয়ে চালাচ্ছিল। মাথায় একটি অতি উজ্জ্বল গোলাপী রঙের স্কার্ফ বাঁধা আছে, যার লেজটা বাতাসের ঝাঁপটায় দাঁড় হয়ে উড়ছিল তার মাথার পেছন দিকে।
একমাত্র বন্দুক ছাড়া পৃথিবীতে এই একটি জিনিসই শুধু বন্ডকে রীতিমত জাগিয়ে তুলতে পারে–আর গতির লড়াইতে এক মহিলার কাছে পরাজিত হল। এটাও সে তার এই অভিজ্ঞতা থেকে জেনে গেছে, যে মেয়েরা এমন মরজিতে গাড়ি চালায় তারা সব সময় সুন্দরী ও আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। এতক্ষণ এই গাড়ি অটোম্যাটিক কন্ট্রোলে চলছে। ওয়াইন্ড হর্নের আওয়াজ শোনামাত্র নিজেকে জানার পূর্বেই অন্য সব চিন্তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে সে কন্ট্রোল করা নিজের হাতে নিয়ে নিল। এবার সে সামান্য গম্ভীরভাবে হেসে অতি জোরে অ্যাসিলেটারের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরল। শক্ত হাতে স্টিয়ারিং-এর হুইল ধরে মেয়েটার পিছন নিল সে।
