হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়। বড় ভুল করেছিল, এবং সেজন্য শাস্তি পেয়েছে, ব্যস। তার গুপ্তচরদের ব্যাপার কারো কাছে উপদেশ শুনতে M পছন্দ করে না। M হঠাৎ বলে উঠলেন, স্টাইনক্রোনের নাম শুনেছেন–ডক্টর পিটার স্টাইনক্রোন।
না, কে তিনি।
এক আমেরিকান ডাক্তার। তার লেখা একটা বই আমাদের ওয়াশিংটন অফিসে লাইব্রেরির জন্য পাঠিয়েছে। তাতে তিনি লিখেছেন মানুষের দেহ কতটা চোট সহ্য করতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ দেহের কোন কোন অংশ ছাড়াই বাঁচতে পারে। পাছে কাজে লাগে তাই সেই তালিকাটা আমি টুকে রেখেছি। শুনবেন নাকি?
M কোটের পকেট থেকে কাগজটা বার করে হাঁক দিলেন। হ্যালো, স্যার জেমস্। এই যে শুনুন : গল ব্লাডার, পেটের পিলে, দুটো টনসিল, অ্যাপেনডিক্স, দুটো কিডনির একটা, দুটো ফুসফুসের একটা, শরীরের তিন-চার সের রক্তের দেড় সের, যকৃত-এর পাঁচ ভাগের দু ভাগ, প্রায় সবটা পাকস্থলী, ২৩ ফুট নাড়িভুড়ির চার ফুট আর মগজের আর্ধেকটা। অপর প্রান্ত চুপচাপ দেখে প্রশ্ন করলেন, কিছু বলবেন, কিছু বলবেন, স্যার জেমস?
ওদিক থেকে নিরুৎসুক ধ্বনি ভেসে এল, ভাবছি উনি এর সঙ্গে একটা হাত, একটা পা অথবা একজোড়া হাত-পা জুড়ে দেননি কেন। আর আপনি কি বলতে চাইছেন তাও বুঝতে পারলাম না।
কাস্ট হেসে M বললেন, আমি বলতে চাইছি না কিছুই। লোকটি যতটুকু আঘাত পেয়েছে, তা ঐ রকম আঘাতের তুলনায় কিছুই নয়। এ নিয়ে আর তর্কাতর্কি নয়। জ্যামাইকাতে একটি ব্যাপার হয়েছে। ওখানে গেলে ওর বিশ্রাম নেওয়া ছাড়া বিশেষ কিছু করবার থাকবে না। ওখানে আমার এক পুরুষ ও এক নারী কর্মচারি একসঙ্গে পালিয়েছে। উক্ত লোকটি অনুসন্ধানকারী হিসাবে সেখানে কিছুদিন বেড়িয়ে আসতে পারে। কেমন হবে?
খুব ভাল কথা। এমন বিশ্রী দিনে অমন একটা কাজ পেলে আমিও খুশি হতাম। আপনি ভাববেন না, M, যে আপনার ব্যাপারে আমি নাক গলাচ্ছি। কিন্তু মানুষের সাহসের একটা সীমা আছে। আপনি নিশ্চয়ই চান না যে এরা। অল্প বয়সেই ফুীগয়ে যাক। আপনার এই লোকটা সত্যিই দক্ষ। আমি বলতে পারি এর কাছ থেকে আরও অনেক কাজ পাবেন আপনি। কিন্তু আপনি জানেন মর্গ্যান তার বইয়ে সাহস সম্বন্ধে কি মত প্রকাশ করেছেন।
মনে পড়ছে না।
তিনি বললেন, সাহস জিনিসটা মূলধনের মত, খরচ করলে কমে যায়। আপনি তাঁর সঙ্গে একমত। আমি শুধু বলতে চাই, যে, এই লোকটি যুদ্ধের আগে থেকেই খুব বেশি খেটে চলেছে। এখনও সে ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু এরও একটা সীমা আছে।
ঠিক তাই।
M ঠিক করলেন, এ নিয়ে আর কথা বলা নয়। আজকাল দেখছি সবাই নরম হয়ে পড়ছে। ঐজন্যেই আমি তাকে বাইরে পাঠাচ্ছি। জ্যামাইকাতে ছুটি উপভোগ করে আসুক। ভাববেন না স্যার জেমস, আমি তার ওপর নজর রাখব। ভাল কথা, রাশিয়ান মহিলাটি ওকে কি বিষ দিয়েছিল, জানতে পেরেছেন?
সবে গতকাল জেনেছি? প্রসঙ্গান্তরে আসতে পেরে তিনিও খুশি হলেন। M বুড়ো আজকের আবহাওয়ার মতই বিশ্রী। তিনি এতক্ষণ যা বকবক করে গেলেন, তা M-এর মোটা মাথায় ঢুকল কিনা কে জানে। বার করতে আমাদের তিনমাস লেগেছে। শেষ পর্যন্ত স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের এক তুখোড় ছোকরা বিষটা ধরতে পেরেছে। ঔষধটার নাম ফুগু। জাপানীরা আত্মহত্যা করতে এই বিষ ব্যবহার করে। জাপানী গ্লোব মাছের যৌনাংশে এটা পাওয়া যায়। রাশিয়ানরা সত্যিই এমন সব জিনিস ব্যবহার করে, যার নাম পর্যন্ত কেউ শোনেনি।
এই বিষ ঠিক কুরারী মত কাজ করে স্নায়ুকেন্দ্রকে অসাড় করে দেয়। ফুগু র বৈজ্ঞানিক নাম টেট্রোজটাক্সিন। সাংঘাতিক জিনিস, আর কাজ করে ভীষণ তাড়াতাড়ি। আপনার লোকটির শরীরে যে পরিমাণে বিষ ঢুকেছিল তাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশীগুলো অবশ হয়ে পড়বার কথা। প্রথমে সে সামনের সব-কিছু দু টো করে দেখতে পায়, তারপর আর চোখ খুলে রাখতে পারে না। এরপর ঢোক গেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মাথা ঝুঁকে পড়ে সামনের দিকে, আর তুলতে পারে না। মারা পড়ে শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে।
কপাল জোরে বেঁচে গেছে দেখছি।
অতি আশ্চর্য ব্যাপার। এর জন্য তার সঙ্গী ফরাসি লোকটি অনেকখানি দায়ী। তিনি তাকে মাটিতে শুইয়ে ফেলে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করেন। ভাগ্য ভাল যে, সেই ডাক্তারটি দক্ষিণ আমেরিকায় কাজ করছিলেন। তিনি এটাকে, কুরারী বিষের ক্রিয়া দশলাখে সন্দেহ করে সেইমত ব্যবস্থা করেন। এরকম অবস্থায় একজন বাঁচে। ভাল কথা, রাশিয়ান মহিলাটির কি হল?
M সংক্ষেপে বললেন, তিনি মারা গেছেন। আর আপনার রোগীর সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি দেখব যাতে সে সহজ কাজ পায়। নমস্কার?
M ফোন নামিয়ে রাখলেন। বেতার সংকেতের ফাইলটা টেনে নিয়ে চটপট চোখ বুলিয়ে নিলেন। সব কাজ শেষ করে কাগজপত্রের রাশি আউট লেখা বাক্সতে ফেললেন। তার সামনে রইল কেবল চা-রঙের ফোল্ডার। তার ওপর অত্যন্ত গোপনীয় মার্কা লাল তারকা চিহ্ন। ফোল্ডারের মাঝামাঝি বড় বড় অক্ষরে লেখা ও ক্যারিবিয়ান স্টেশন, আর নিচে বাঁকা হরফে ট্র্যাংওয়েজ ও ট্রব্লড স্টেশন।
ইন্টারকমের আলো জ্বলে উঠল। সুইচ টিপে M বললেন, বল।
007 এসেছে স্যার।
ভেতরে পাঠিয়ে দাও। আর অস্ত্র বিভাগের বড়কর্তাকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দেখা করতে বল।
