চেয়ারে ঢলে পড়ল মেরী। ইয়ার ফোনটা সোনার বরণ চুল থেকে খসে পড়ল মেঝের ওপর। লন্ডনে কনট্রোলারের ডেস্কে একটা ঘণ্টি বেজে জানাল যে WXN-এর কিছু গোলমাল হয়েছে।
খুনী দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। যখন সে ফিরে এল, তার হাতে প্রেস্টোফায়ার লেখা একটা শুকনো জ্বালানির বাক্স ও একটা খালি বড় থলে। বাক্সটা নামিয়ে রেখে মেয়েটাকে হিঁচড়ে ঢোকাল থলের মধ্যে।
ভারি বোঝাটা হলঘরে রেখে এল। ঘরের এক কোণে একটা সিন্দুক খোলা। তার থেকে বার করা সংকেত বইগুলো আর সিন্দুকে যাবতীয় কাগজপত্র ঘরের মাঝখানে ছুঁড়ে দিল। পর্দাগুলো ছিঁড়ে তার ওপর রাখল আর সব কিছুর উপর রাখল গোটাদুয়েক চেয়ার। জ্বালানির বাক্স খুলে সেই স্কুপের ওপর একমুঠো ফেলে আগুন ধরিয়ে দিল।
তারপর হলঘরে গিয়ে একই কায়দায় বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগাল। অগ্নিশিখা ঘরের প্যানেল স্পর্শ করল। লোকটা বাড়ির সামনের দরজা খুলল। ফুলঝোঁপের ভিতর দিয়ে দূরের শবাধারবাহী কালো গাড়িটা দেখা যাচ্ছে।
ঝিঁঝি পোকার গুঞ্জন আর কালো গাড়ির চলন্ত ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। লোকটা হলঘরে গিয়ে ভারি থলেটা কাঁধে করে বেরিয়ে এল।
দ্রুতপদে সে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। কালো গাড়ির পেছনের দিকে থলেটা ঢুকিয়ে দিল। আর অন্য দু জন সেটাকে কফিনের মধ্যে স্ট্র্যাংওয়েজের দেহের ওপর শুইয়ে দিল। লোকটা গাড়িতে উঠে বসল।
বাংলোর ওপরের জানালায় যখন আগুন দেখা গেল, কালো গাড়ি তখন সোজা সরোবরের দিকে যাচ্ছে। সেখানে। ওজনের সাহায্যে কফিনটাকে পঞ্চাশ ফ্যাদম পানির নিচে ডুবিয়ে দেওয়া হবে এবং ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের ক্যারিবিয়ান স্টেশনের কর্মীবৃন্দ ও নথিপত্র ধ্বংস করার কাজ শেষ।
.
অস্ত্র নির্বাচন
তিন সপ্তাহ পরে, লন্ডন শহরে মার্চ মাস এল যেন একটা ব্যাটল সাপের মত ঠকঠকিয়ে। পয়লা মার্চ সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শিলাবৃষ্টি ও তীব্র ঝড় শুরু হল। শহরের কাজে যাওয়া লোকেরা তাদের,ওভারকোটের নিম্ন প্রান্ত, পায়ের ওপর আর মুখে এসে লাগছে কনকনে ঠাণ্ডা।
দিনটা বড়ই বিশ্রী। M পর্যন্ত স্বীকার করেছিলেন আবহাওয়াটা বিশ্রী। ভুয়া নম্বর প্লেট লাগানো তার কালো সিলভার বে রোল গাড়ি যখন রিজেন্ট পার্কের বাড়িটা সামনে এসে দাঁড়াল এবং তিনি ফুটপাথে নামতেই বুলেটের মত শিলা এসে চোখে মুখে আঘাত করল। তিনি ড্রাইভারকে বললেন, আজ আর গাড়ির দরকার হবে না। স্মিথ, আমি আজ মাটির তলায় রেলগাড়ি চড়ে বাড়ি ফিরব। এখন গাড়ি চালাবার আবহাওয়া নয়।
ড্রাইভার স্মিথ হেসে বলল, আচ্ছা স্যার ধন্যবাদ। সে দেখল বয়স্ক ঋজু মূর্তিটা বাড়িটাকে উঠল। এ নির্দেশ M এরই উপযুক্ত। অধীনস্থ কর্মচারিদের প্রতি তার পূর্ণদৃষ্টি। স্মিথ গীয়ার বদলে গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবল এ ধরনের মানুষ আজকাল নেই।
লিফটে চড়ে M নতলায় উঠলেন। অফিসে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ওভারকোট ও স্কার্ফ খুললেন। বড় একটা নীল রুমালে মুখ মুছলেন। ডেস্কের সামনে বসে তিনি ইন্টারকমের একটা সুইচ টিপে বললেন, আমি এসেছি, মিস মানিপেনী। বেতার সংকেতগুলো পাঠিয়ে দাও। তারপর স্যার জেমস্ মলোনিকে টেলিফোনে ধরে দাও। এখন বোধহয় তিনি হাসপাতালে রাউন্ড দিচ্ছেন। প্রধান কর্মসচিবকে বল যে আমি আধঘণ্টার মধ্যে 007-এর সঙ্গে দেখা করব। স্ট্যাংওয়েজের ফাইলটাও দিয়ো।
M গা এলিয়ে বসলেন। হাত বাড়িয়ে পাইপটা নিয়ে তামাক ভরতে লাগলেন চিন্তিত মনে। তার সেক্রেটারি একতাড়া কাগজ রেখে গেল। বেতার সংকেতের ফাইলের ওপর আধা ডজন অত্যন্ত জরুরী মার্কা কাগজকেও তিনি উপেক্ষা করে গেলেন। তেমন জরুরী হলে কাল রাতেই তাকে জানিয়ে দেওয়া হত।
ইন্টারকমের ওপর হলুদ আলো দপদপিয়ে উঠল। কালো রঙের ফোনটি তুলে, কে, স্যার জেমস্? পাঁচ মিনিট সময়
আপনার জন্যে ছ মিনিট সময়ও হতে পারে। কোন মন্ত্রীকে হেলথ সার্টিফিকেট দিতে হবে নাকি?
আজ সে ব্যাপার নয়। আমি আমার এক কর্মচারি সম্বন্ধে জানতে চাইছি। আপনিই তার চিকিৎসা করছিলেন। বাইরের লাইন বলে তার নাম বলছি না। শুনলাম আপনি নাকি তাকে গতকাল ছেড়ে দিয়েছেন। সে কি আবার কাজ শুরু করতে পারবে?
অভিজ্ঞ চিকিৎসকের গাম্ভীর্য গলায়, দেহের দিক দিয়ে লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ। পা সেরে গেছে, তাকে এখন সুস্থ বলা চলে। একটু থেমে আবার বললেন, তবে একটা কথা, M-এর ওপর যে চাপ পড়েছিল তা এখনো কাটেনি। এখন তাকে একটু হালকা কাজ দিতে পারবেন? আপনার কথা শুনে মনে হয় গত কয়েক বছর ধরেই লোকটির ওপর খুব কাজের চাপ পড়ছে।
M গম্ভীর গলায় বললেন, কাজ করবার জন্যেই তাকে বেতন দেওয়া হয়। সে অক্ষম কি-না সেটা শিগগির বোঝা যাবে। এর আগেও কেউ কেউ ওরকম ভেঙে পড়েছে। সুতরাং খুব বেশি চোট তার লাগেনি। এর আগে আপনার কাছে। যে রোগীদের পাঠানো হয়, যাদের দেখে সন্দেহ হয় যে মাড়াই-এর কলে ফেলা হয়েছিল, তাদের তুলনায় কিছু নয়।
হ্যাঁ, সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে অবশ্য তাই। তবে যন্ত্রণাটা বড় অদ্ভুত জিনিস। যন্ত্রণা মাপা যায় না। প্রসব যন্ত্রণা ও কিডনীর যন্ত্রণা কোন্টা কম আর কোটা বেশি, তা বলা অসম্ভব। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে মানবদেহ খুব তাড়াতাড়ি ব্যথার স্মৃতি ভুলে যায়। কিন্তু M ভাবলেন না যে ওর হাত-পা ভাঙেনি বলে।
