নাঃ স্ট্রাংওয়েজ কাঁধ ঝাঁকালেন। সে রকম পরিস্থিতি কখনোই আসবে না। শেষপর্যন্ত হয়ত সমস্ত ব্যাপারটা নেহাৎ জোলো। দেখা যাবে সমস্ত রহস্যটাই বেরিয়েছে ঐ চীনেদের এক অপরূপ কল্পনা থেকে।
একই সঙ্গে সে ঐ তিনজন অন্ধলোকগুলির দিকে লক্ষ্য রাখছিল। তারা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এগিয়ে আসছে। তিনি গাড়িতে পৌঁছবার দু-এক সেকেন্ড আগেই ওরা সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাবে। পকেটে তিনি হাত ঢোকালেন, তিনি বুঝে নিশ্চিত হলেন একটা শিলিং, পেনি নয়। আরে, এরা দেখছি সবাই চিগ্রো। আশ্চর্য ব্যাপার। স্ট্র্যাংওয়েজ মুদ্রাটা টিনের কাপে দিল।
সৃষ্টিকর্তা আপনার মঙ্গল করুন হুজুর সামনের লোকটি বলল। আর দু জনও প্রতিধ্বনি করল, সৃষ্টিকর্তা আপনার মঙ্গল করুন।
স্ট্র্যাংওয়েজ এক মুহূর্তের জন্যে অনুভব করলেন যে, ফুটপাথে লাঠি ঠোকার শব্দ থেমে গেছে। সে শেষ লোকটিকে অতিক্রম করামাত্র তারা তিনজনে ঘুরে দাঁড়াল। পেছনের দু জন অল্প সরে এল যাতে গুলি চালাবার রাস্তা পরিষ্কার হয়। সাইলেন্সর লাগান তিনটি রিভলবার বেরিয়ে এল ছেঁড়া কাপড়-চোপড়ের অন্তরালে লুকোনো খাপ থেকে। নিখুঁত ভঙ্গিতে তারা স্ট্রাংওয়েজের মেরুদণ্ডের তিনটি জায়গায় লক্ষ্য স্থির করল–একজন কাঁধের মাঝখানে, অন্যজন পিঠের কেন্দ্রস্থলে ও তৃতীয়জন মেরুদণ্ডের নিম্নতম প্রান্তে।
তিনটি রিভলবারের গর্জন যেন একসঙ্গে বেরুলো, স্ট্র্যাংওয়েজের দেহ সামনের দিকে ছিটকে গেল, যেন কেউ ধাক্কা দিয়েছে পেছন দিক থেকে। ফুটপাথের ওপর তার মৃতদেহটা নিশ্চল পড়ে রইল।
এখন ছ টা-সতের। তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে শবাধারবাহী কালো মোটরগাড়ি মোড় ঘুরে এসে দাঁড়াল রিচমন্ড রোডের ওপর। তার ছাদের চার কোণে চারটে কৃষ্ণ পতাকা উড়ছে। গাড়িটা তাদের পাশে থামবার আগে তারা তিনজন স্ট্র্যাংওয়েজের দেহটা তুলে নেবার সময়টুকু কেবল পেল। গাড়ির পেছনের দরজাটা খোলা। ভেতরে ঢাকা খোলা একটা সাধারণ চেহারার কফিন।
তিনজন মিলে দেহটাকে তুলে ফেলল কফিনের মধ্যে। ঢাকা বন্ধ করে গাড়ির দরজা টেনে দেওয়া হল। চিগ্রো তিনজন কফিনের চার কোণে চারটি চেয়ারে বসে পড়ল। সহজ ভঙ্গিতে তাদের সাদা লাঠি পাশে রেখে গায়ের ছেঁড়া জামা কাপড়ের ওপরেই চাপিয়ে নিল কালো রঙের ধূসর আলপাকার কোট।
ড্রাইভারটিও এক চীনে নিগ্রো। সে ভয়ে-ভয়ে পেছন দিকে তাকাল।
চালাও, চালাও। সবচেয়ে বড় চেহারার খুনিটা বলল। তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল, ছটা কুড়ি। কাজ সারতে ঠিক তিন মিনিট লেগেছে।
কালো গাড়িটা ডান দিকে মোড় নিল। তারপর ত্রিশ মাইল বেগে রাজপথ ধরে পাহাড়ের দিকে চলতে লাগল। কালো পতাকা উড়ে বিষণ্ণ ভাষায় সকলকে জানাচ্ছে মৃতদেহের কথা। আর তিনজন ভেতরে বসে রয়েছে, বুকের ওপর দু হাতে ক্রশচিহ্ন এঁকে।
wXN ডাকছি www কে WXN ডাকছি www কে…WXN…wXN…wXN…।
মেরী ট্রুব্লাডের মাঝের আঙুলটা প্রেরক যন্ত্রের চাবির ওপর মৃদু আঘাত করছে। বাঁ কব্জি তুলে ছ টা আঠাশ বাজে। স্ট্র্যাংওয়েজ এক মিনিট দেরি করে ফেলেছেন। এবার বোধহয় এক সেকেন্ডের মধ্যেই তার পায়ের আওয়াজ শোনা যাবে। কুণ্ঠিত হাসি হেসে সে বলবে, দুঃখিত মেরী। গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছিল না। কিংবা হাফওয়ে ট্রীর কাছে আমাকে আটকে দিল। মেরী দ্বিতীয় ইয়ারফোন জোড়া নামিয়ে রাখল, তাতে আধ সেকেন্ড সময় বাঁচবে।
WXN ডাকছি www কে। WXN ডাকছি www কে। ঘড়িতে ছ টা ঊনত্রিশ। এবার মেরীর দুশ্চিন্তা হল। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লন্ডনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
বাইরের গুপ্তচরদের কাছ থেকে যে সব বেতার সংকেত আসে তার প্রত্যেকটির ওপর রেডিও সিকিউরিটি কড়া নজর রাখে। যদি স্ট্র্যাংওয়েজের জায়গায় অন্য কেউ সংকেত পাঠায় তাহলে প্রেরক যন্ত্রের চাবির ওপর সামান্য চাপে পার্থক্য হবে। তাতেই ধরা পড়ে যাবে যে সে আসল প্রেরক নন। মেরী নিজের চোখে যন্ত্রটাকে দেখছে কিন্তু কিছু করার নেই।
পাছে কোন এক প্রেরকযন্ত্র শত্রুপক্ষের হাতে পড়ে যায় সেইজন্যেই এই সাবধানতা। আর যদি কোন গুপ্তচর শত্রুপক্ষের হাতে পড়ে তাকে যন্ত্রণা দিয়ে লন্ডনে বার্তা পাঠাতে বাধ্য করা হয় তাহলে তাকে শুধু তার প্রেরণের ভঙ্গির পরিবর্তন করতে হয়। তৎক্ষণাৎ সদর দপ্তর বুঝবে যে সে বন্দী।
লন্ডনের সাড়া পাওয়া গেছে। ঈথারে সহসা এক শূন্যতার সৃষ্টি হল যার অর্থ যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। মেরী। ট্রব্লও হাতঘড়ির দিকে তাকাল সাড়ে ছটা। সর্বনাশ। কিন্তু না, হলঘরে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
www ডাকছি wXN কে…www ডাকছি wXN কে…শুনতে পাচ্ছ? লন্ডন থেকে সংকেত আসছে।
দরজার কাছে পায়ের আওয়াজ। ঠাণ্ডা মাথায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মেরী সংকেত পাঠাল : শুনতে পাচ্ছি ..পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি..পরিষ্কার…
পেছন দিকে এক বিস্ফোরণের শব্দ। কি যেন তার গোড়ালিতে লাগল। নিচের দিকে দেখল যে দরজার তালাটা এসে লাগল।
মেরী চট করে পেছনে ঘুরে দেখল স্ট্রাংওয়েজ নয়, অন্য একজন লোক। এক নিগ্রো-গায়ের রং হলদে, চোখ দু টো বকা। তার হাতে রিভলবার, তাতে সাইলেন্সর লাগানো।
মেরী চিৎকার করবার জন্য হাঁ করল। লোকটা হাসল, রিভলবারটি তুলে মেয়েটির বা স্তনের চারদিকে তিনবার গুলি চালাল।
