ছ টা পনেরোর ঠিক আগে রিচমন্ড রোডের নীরবতা ভাঙল। তিনজন ভিখারী এগিয়ে গেল গাড়ি চারটের দিকে। তারা চিগ্রো অর্থাৎ চীনের নিগ্রো। ভারি চেহারা তাদের। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে ঝুঁকে হাতে সাদা লাঠিগুলো ফুটপাথের পাশে ঠুকছিল। প্রথমে লোকটির চোখে নীল চশমা, ডানহাতে একটা টিনের কাপ, বাঁ হাতে লাঠির বাকা দিকটা। দ্বিতীয় লোকটার ডান হাত প্রথম জনের কাঁধে এবং তৃতীয়ের ডান হাত দ্বিতীয়জনের কাঁধে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভিখারীর দু চোখ বোজা। তিনজনের পরনে শতছিন্ন পোশাক ও মাথায় বেস্ব খেলার টুপি। ছায়াচ্ছন্ন ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলেছে, লাঠি ঠোকার মৃদু শব্দ ছাড়া সব নিঃস্তব্ধ।
কিংসটনের ফাঁকা রাস্তায় তারা এক বিরূপ পরিবেশের সৃষ্টি করল। এটাও বড় অদ্ভুত যে এরা সবাই চীনে নিগ্রো।
তাস খেলার ঘরে কম্যান্ডার স্ট্র্যাংওয়েজ-এর রোদেপোড়া হাত সবুজ টেবিলের ওপর থেকে চারটে তাস নিল। এ পিঠটা পড়ল অন্যগুলোর ওপর। একশ অনার্স, তিনি বললেন, আর নিচে নব্বই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি। এবার তোমার তাস দেবার পালা, বিল। কিছু পানীয়ের অর্ডার দাও। আমি চলে গেলে আমার হাতটা সাজিয়ে দেবার বৃথা চেষ্টা কোর না। আমি ঠিক ধরে ফেলব।
ব্রিগেডিয়ার বিল টেম্পলার হাসলেন। বললেন, তাড়াতাড়ি ফিরে এস। যখন তোমার পার্টনার টাকা লুঠতে শুরু করে, তখনই তোমার চাড় পড়ে খেলাটা ঠাণ্ডা করে দিতে।
ইতিমধ্যেই স্ট্রাংওয়েজ দরজার বাইরে চলে গেছেন। অন্য তিনজন চুপচাপ, বেয়ারা এল। তারা নিজেদের জন্য। পানীয় আর স্ট্র্যাংওয়েজের জন্য হুইস্কি এবং পানির অর্ডার দিলেন।
প্রতিদিন ছ টা পনেরোতে বাগড়া পড়ে অর্থাৎ দ্বিতীয় রাবারের মাঝামাঝি। এই সময়ে তাকে নাকি অফিস গিয়ে একটা ফোন করে আসতে হয়। কিন্তু ট্র্যাংওয়েজ এই চারজন দলের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই ব্যাপারটা অন্যদের সহ্য করতে হয়। তারা কেউ জানেন না ফোন কাকে করা হয়, কারণ তারা জানেন স্ট্র্যাংওয়েজের কাজকর্ম গোপনীয়। তিনি কখনো কুড়ি মিনিটের বেশি দেরি করেন না, আর এ সময়টার অন্য সকলে যে পানীয় নেবেন, তার দাম তিনিই দেবেন।
পানীয় এল। তারা তিনজনে ঘোড়দৌড়ের আলোচনা শুরু করলেন।
সত্যি বলতে, দিনের এ সময়টা স্ট্র্যাংওয়েজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডনের রিজেন্ট পার্কে তার গুপ্তচর বিভাগের সদর দপ্তরের ছাদে যে শক্তিশালী ট্রান্সমিটারটি বসানো আছে, এই সময়ে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করেন। প্রতিদিন সন্ধ্যে সাড়ে ছ টায় তাকে বেতারে দৈনিক স্থানীয় রিপোর্ট পাঠাতে ও নির্দেশ গ্রহণ করতে হয়।
যদি সাড়ে ছ টায় তাকে না পাওয়া যায়, তাহলে সাতটায় আবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এর নাম নীল সংকেত। সাড়ে সাতটায় লাল সংকেত। এবারেও যদি বেতার যন্ত্র নীরব থাকে, তবে অবস্থা জরুরী হয়ে দাঁড়াবে এবং লন্ডনে তার নিয়ন্ত্রণকারী অফিস, সেকশন থ্রি, তাকে খুঁজবেন কি হয়েছে জানতে। একটা নীল সংকেত পর্যন্ত গুপ্তচরের পক্ষে অসম্মানের, যদি না সে লিখিতভাবে উপযুক্ত কারণ দর্শাতে পারে। সারা পৃথিবীতে লন্ডনের বেতারের জাল অত্যন্ত ব্যাপক।
স্ট্রাংওয়েজকে অবশ্য কখনো নীল সংকেতের অবমাননায় পড়তে হয়নি, লাল তো অনেক দূরের কথা। প্রতি সন্ধ্যা ছ টায় তিনি গাড়িতে চেপে ব্লু-মাউন্টেনের পিচের ছোট পাহাড়গুলোর ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে মর্গানস হারবারে তার বাড়িতে পৌঁছে, ছ টা পঁচিশে তিনি হলঘর পেরিয়ে পেছনদিকের অফিস ঘরে পৌঁছান।
ততক্ষণে মিস ট্ৰব্লও ভুয়া ফাইলের আলমারির মধ্যে লুকানো বেতারযন্ত্রের সামনে বসে পড়ে। এ মেয়েটি লোকচক্ষে তার সেক্রেটারী হলেও, বৃটিশ বাহিনীর নারী বিভাগের এক চীফ অফিসার ছিল। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে সে প্রথম বেতার যোগাযোগটা করতে চেষ্টা করে, ১৪ মেগাসাইলস-এ, তার গুপ্ত পরিচয় সংকেত wXN জানিয়ে। স্ট্রাংওয়েজ তার পাশে বসে দ্বিতীয় ইয়ার ফোনজোড়া তুলে নেন। মেরীর সুন্দর হাঁটুর ওপর থাকে একটা শর্টহ্যান্ড প্যাড। ঠিক ছ টা আঠাশে ট্র্যাংওয়েজ বেতার যোগাযোগের ভার নিজের হাতে নিয়ে নেন আর অপেক্ষা করেন ঈথারে সেই আকস্মিক শূন্যতার জন্যে, যার অর্থ লন্ডনের www-র সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
পুরো ব্যাপারটা কড়া নিয়মে বাঁধা। আর স্ট্র্যাংওয়েজ-ও যথেষ্ট কড়া নিয়মের মানুষ। তবে দুঃখের বিষয় ধরাবাধা নিয়মের কাজ কর্ম যদি শত্রুরা একবার ধরে ফেলে, তাহলে মারাত্মক দাঁড়ায়।
স্ট্রাংওয়েজ দীর্ঘঋজু দেহের অধিকারী। ডান চোখের ওপর এক কালো পট্টি। সমস্ত চেহারা যে ঈগল পাখির মত। তিনি দ্রুতপদে কুইনস ক্লাবের মেহগনির দরজা ঠেলে রাস্তায় নামলেন।
সন্ধ্যার নির্মল হাওয়া, আর তিনি যে বিচিত্র কৌশলে তিন ইস্কাবনের খেলায় জয়ী হয়েছেন সেই স্মৃতি ছাড়া আর কিছু তিনি ভাবছেন না। দুই সপ্তাহ আগে M অনেকটা উদাসীন ভঙ্গিতে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন একটা কাজ। কাজটা ভালই চলছে। অনেকটা দৈববলে চীনে সম্প্রদায়ের সঙ্গে এ রহস্যের যোগসূত্র আবিষ্কৃত হওয়ায় বড় সুবিধা হয়েছে। কতকগুলো অদ্ভুত ব্যাপারে আভাস পাওয়া গেছে, নুড়ি বিছানো পথে হাঁটতে হাঁটতে স্ট্র্যাংওয়েজ ভাবলেন, তাহলে তিনি সত্যিই এক আশ্চর্যতম সমাধানে পৌঁছবেন।
