এবার লোকটা সামান্য সরে দাঁড়াল। যাতে গুলি করার পথটা খালিই থেকে যায়। আর অন্য আরেক জন বন্ডের ওয়ালথার পি, পি,-কে পিস্তলটা বেল্টের নিচের নরম চামড়ার খাপ থেকে বের করে নিল। পাকা হাত দিয়ে বন্ডের সর্বাঙ্গ হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল যে, কোন অস্ত্র তার গায়ে লুকানো আছে কিনা। তারপর আবার পিছনে দাঁড়িয়ে ওয়ালথারটা পকেটে ভরে নিজের পিস্তলটা হাতে নিল। বন্ড এই সুযোগে এক মুহূর্তের মধ্য পিছনের দিকটা দেখে নিল। মেয়েটি-এর মধ্যে একটা কথাও বলেনি। বিস্ময় ও ভয়ের লেশ মাত্র তার মুখে নেই। মেয়েটি এখন কিন্তু তাদের দিকে পিছন ফিরেই দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে সমুদ্রের দিকে স্থির ও অবিচল হয়ে। আচ্ছা! এই গুলি কি হচ্ছে মেয়েটাকে কি তাহলে তারা টোপ হিসাবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কার জন্য? তাহলে বর্তমানে কি হবে। এই ঢেউগুলির ভিতর কি তাকে খুন করে ফেলে দেবে। এই তো সম্ভব হবে। তার শেষ সময় এসে পড়েছে।
কিন্তু সত্যিই তাই হবে। উত্তর দিকে ঘন নীল গোধূলীর মধ্যে দিয়ে শোনা গেল একটা মোটর বোটের ইঞ্জিনের তীব্র আওয়াজ। বন্ডের উপর ক্রমশ সেটা এক বম্বার্ড রক্ষাকারী বোটের চেহারা নিল। যাক, পুলিশ তবে তাদের দেখতে পেয়েছে। উপকূল রক্ষাকর্তাদের হাতে গিয়ে পড়লে এই গুণ্ডাদের সে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে। কিন্তু মেয়েটার কথা সে কি বলবে?
বন্ড লোক দু টোর দিকে আবার তাকাল। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার সব আশা নিরাশাতে পরিণত হল। লোকদুটো তাদের প্যান্টটা গুটিয়ে নিয়ে সেই বোটটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। তাদের একহাতে পিস্তল আর অন্যহাতে পিস্তল। তার মানে তার রক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। মোটর বোটটা হয়ত তাকে তুলে নেওয়ার জন্যই আসছে। ধুত্তোর! লোক দু টোর দিকে দৃষ্টিপাত না করে বন্ড নিচু হয়ে প্যান্টের পা দুটো গুটিয়ে নিল। আর তাদের জুতা মোজা খুলতে খুলতে গোড়ালির কাছ থেকে বার করে নিয়ে এল লুকানো ছোরাটা। তারপর একটু সামান্য দূরে দাঁড়ানো বোটটার দিকে দেখতে দেখতে চট করে ছোরাটা প্যান্টের ডানদিকের পকেটে ঢুকিয়ে দিল। কেউ কোন কথা বলল না। প্রথমেই মেয়েটা বোটে উঠে বসল, তারপর বন্ড ও সবশেষে সেই লোক দুটো। বম্বার্ড মোটর বোটটার ভোতা নাকটা ঘুরে গেল, ছুটে চলল ভিন্ন দিকে, উন্মত্ত ঢেউ গুলির ভিতর দিয়ে।
মেয়েটার সোনালি চুলের রাশ পেছন দিকে উড়ে গিয়ে বন্ডের গালে হাল্কা চাবুকের মত লাগল।
ট্রেসি তোমার মনে হয় ঠাণ্ডা লেগে যাবে। নাও, আমার কোটটা পরে নাও। বন্ড তার গায়ের কোট খুলে ফেলল। এক হাত এগিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে পরাতে সাহায্য করল। চেষ্টা করতে গিয়ে দু জনের হাতে হাত লেগে গেল। মেয়েটি তখন বন্ডের হাতে একটা মৃদু চাপ দিল। এ আবার কোন ব্যাপার। বন্ড তার দিকে সরে এল, সে বুঝতে পারল মেয়েটার শরীরও এতে সায় দিল। বন্ড তখনই আড় চোখে সেই লোক দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকল।
বাতাসের ঝাপটায় তারা একটু ঝুঁকে বসে আছে। তাদের হাত পকেটের মধ্যে-সতর্ক, কিন্তু কৌতূহলহীন। তাদের পিছনে রসেল -এর আলোর মালা শীঘ্র সরে যাচ্ছে দেখে ক্রমশঃ দিগন্তের একটা সোনালী ছাপে রূপান্তরিত হল। জেমস বন্ড ডানহাত দিয়ে পকেটের ছোরাটা আছে কিনা দেখে নিল, তার ক্ষুরধার ফলাটার ওপর আঙ্গুল দিয়ে এক বার পরীক্ষা করে নিল।
বন্ড তখন মনে মনে ভাবল এ অস্ত্রটা ব্যবহার করার সুযোগ হয়ত আদৌ পাওয়া যাবে কিনা, আর একই সাথে সে গত চব্বিশ ঘণ্টার ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে। এই অদ্ভুত ঘটনার একটা সূত্রের খোঁজে।
একটি ভাসন্ত বেল বয়া পানির উপর বিষাদ সুরে বেজে চলছিল। বম্বার্ড নৌকাটি স্রোতের বিরুদ্ধে তাকে এক পাশে রেখে এগিয়ে চলল। ছোট্ট ম্যারিনার উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ল, যাবতীয় চ্যানেল পারাপারকারী ইয়াট আরোহীরা সেখানে নিয়মিত আড্ডা মারে। বন্ডের একবার মনে হল, ম্যারিনার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেই বায়ুপূর্ণ রবারের বোট-টার তলদেশে ছোরার কয়েকটা কোপ বসিয়েই সাঁতার কেটে সোজা চম্পট দেবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই বন্ড ভাবল, পিস্তলের বুলেটগুলি যখন পিছন দিয়ে তার মাথা চূর্ণ করবে–একটা চিন্তার ঝলক তার মাথায় খেলে গেল, তবে কি এই শেষ! আর যদিও বা সাঁতরে পালানোর চেষ্টা করে, মেয়েটা সেই তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতরে যেতে পারবে তার নিশ্চয়তা কোথায়! সে মেয়েটার গায়ে ঈষৎ ঠেস দিয়ে ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করতে লাগল (কু-র খোঁজে)।
.
গ্র্যান টুরিসমো
ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পূর্বে জেমস্ বন্ড তার পুরান কন্টিনেন্টাল বেন্টলি গাড়িতে চড়ে যাচ্ছে আবেভিল ও মন্ট্রিল-এর মাঝখানের বিশাল পথ ধরে। বেশ নির্বিঘ্নে দ্রুত বেগে সে যাচ্ছে–ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ মাইলের ভেতর। আর মনে মনে সে গুপ্তচর বিভাগ থেকে তার নাম তুলে নেওয়ার পত্রটির লেখাটি কি রকম হবে তাই ঠিক করছে।
চিঠিটার ঠিকানার স্থানে লেখা থাকবে? M-এর জন্য, একান্ত ব্যক্তিগত। চিঠিটা সে এই পর্যন্ত প্রস্তুত করেছে?
প্রিয় মহাশয়, অতি সম্মানের সাথে আপনাকে অনুরোধ করছি, অতি শীঘ্র গুপ্তচর বিভাগ থেকে আমার পদত্যাগ। স্বীকার করে নিতে হবে।
অতি দুঃখের সঙ্গে আমার এই সিদ্ধান্তের বর্ণিত কারণগুলি নিচে দেখালামঃ
