তোমার কোন চিন্তা নেই খোকন। যা জোরে বাতাস বইছে কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
তুমি একটা আস্ত মূর্খ, ধমকে উঠল কিল মাস্টার। বাতাসেও শব্দ ভাসে, এমন কি হংকং থেকেও কেউ কথা বললে। এখানে শোনা যেতে পারে, বুঝলে বোকারাম?
হঠাৎ বন্ড কব্জিঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখে ঘড়ির কাঁটাগুলো দপদপ করে জ্বলে উঠল। প্রিন্স ও প্রিন্সেস-এর দিকে বলে উঠল, লোকটার আসার সময় হয়ে গেছে। তোমরা এবার একটু আড়ালে যাও।
বরং তোমরা দুজনে এখানে অপেক্ষা কর, প্রিন্স বলে, এ কাজটা আমি ভাল করতে পারব। ফিরে এসে তুমি দেখতে পাবে। তোমার জন্য এই লোকটার গা থেকে পোশাকটা কেমন খুলে নিয়েছি।
সঙ্গে সঙ্গে বন্ড পকেট থেকে লুগারটা বার করে প্রিন্স-এর বুকে ঠেকিয়ে বলল, এর আগেও মাফ করেছি। এরপর আবার বেয়াদপি করলে একেবারে খতম করে দেব, বুঝলে?
প্রিন্স ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ঠিক আছে। তোমার উপদেশ মনে থাকবে। এই বলে প্রিন্সেসকে নিয়ে আড়ালে গেল।
মিনিট খানেক বাদেই মোজাম্বিক রেজিমেন্টের সেই কালো লোকটা এল। এবং খুন হল বন্ডের হাতে। সুদূর মোজাম্বিক থেকে হাজার হাজার মাইল ছুটে এসেছিল সে বন্ডের হাতে খুন হওয়ার জন্য। বেচারা জানতেও পারল না কি অপরাধে তাকে প্রাণ দিতে হল। বন্ড ছুরি ব্যবহার করেনি পাছে লোকটার পোশাকে রক্তের দাগ লেগে যায়। তাই সে পেছন থেকে অতর্কিতে ঝাঁপ দিয়ে গলা টিপে হত্যা করল। লোকটার প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে স্ত হাতে তার দেহ থেকে পোশাকটা খুলে নিল। ওদিকে প্রিন্স ও প্রিন্সেস সমুদ্রের তীর থেকে উঠে এল। বন্ড বলল, এসো। ইউনিফর্মটা ভালই আছে–রক্ত কিংবা কাদার দাগ একেবারেই লাগেনি। আশা করি, তোমার গায়ে ঠিক ফিট করবে।
প্রিন্স তার পোশাক বদলানোর পর বন্ড বলল, এবার আমার ঘড়ির সঙ্গে তোমার ঘড়ির সময় মিলিয়ে নাও। তারপর আমি তোমার পথে রওনা হয়ে যাব।
ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। ইঁদুর ধরার সময় তখনো আধঘণ্টা বাকি ছিল। সাবেকী মা কক মিউ মন্দির পেরিয়ে এসে তারা বন্দরের পথ ধরে চলল। ওদের দু জনের পরণে কুলির পোশাক।
বন্ড চায় না রুয়া দা নোরকায় গোল্ডেন ট্রাইগারের ত্রিমুখি সংঘর্ষ হোক। আসলে চুন লি র একটা ফাঁদ বলে মনে হচ্ছে। ফোনটা ছিল একটা টোপ মাত্র। বন্ড আর প্রিন্সেস হংকং-এ এসেছে কিনা সেটা জানার জন্যই এই আহ্বান।
চলতে চলতে বন্ড থমকে দাঁড়াল। সামনে শোভা পাচ্ছিল ম্যাকাও প্রাসাদের সাইন বোর্ডটা। প্রাসাদের চারদিকে আলোর রোশনাই, মধ্য ম্যাকাও তখন প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর। আর একটু এগিয়ে দুটো বাড়ি পেরুতেই সে দেখল একটা সরু গলি। এই গলির পথেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাই টপ হোটেলের পিছন দিকে যেখানে জেনারেল বুলেঙ্গারের অতিথি রূপে উঠেছে। হয়ত এটাও একটা ফাঁদ। তার মত কর্নেল চুন লিও জানে যে এটা একটা ফাঁদ। এই মারন ফাঁদের উদ্যোক্তা সে নিজেই।
চুন লি কি ধরে নিয়েছে, জেনারেল বুলেঙ্গারের সঙ্গে দেখা করবেই বন্ড প্রিন্স-এর কথা যদি ঠিক হয় তাহলে সমস্ত ব্যাপারটাই সাজানো, সাজিয়েছে চুন লি। তার সন্দেহ নিরসনের জন্য। সে কেবল দেখতে চায়, জেনারেল কি করে। জেনারেলকে চুন লি তার পাশার খুঁটি বানাতে চায়।
একটু পরেই বন্ড এসে পৌঁছল টাইটপ হোটেলের সামনে। পিছনে গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা। এ পাশে ফুটপাথের ওপর ঘুমন্ত কুলিদের দল। আফিমের গন্ধ।
টাই টপ হোটেলটা দশ তলা। জেনারেল থাকে আট তলায়। চুন লি নিশ্চয়ই জানে। বন্ড এখানে আসবে। চুন লি খুশি হবে বন্ড যদি বুলকে খতম করে। তাহলে তারপরেই বন্ডকে ধরা সহজ হবে। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল বন্ড সবই প্রহরী, কুলি মজুরের দল। ঘুমন্ত কুলিদের কাছ থেকে একটা মোট পিঠের ওপর তুলে নিল সে। দূরে গাড়ির মধ্যে একটি মেয়ের চিৎকার, বন্ড এগিয়ে গেল। চারদিকে, আশেপাশে কেউ নেই। একজন ঘুমন্ত প্রহরীকে দেখা গেল স্টোররুমের মত একটা কামরায়। বন্ডের পায়ের শব্দে সে চোখ মেলে তাকাল, তারপর ইশারায় জানাল মোট ওখানে রাখ। বন্ড মোট রেখেই প্রহরীকে চেপে ধরল। ক্যারাটের এক প্যাঁচে তার ঘাড় ভেঙে দিল। সেখান থেকে এগিয়ে গেল বন্ড ক্যাশ অফিসের দিকে। অভিনয় নিখুঁত করে তোলার জন্য সে তার মজুরী আদায় করতে চলল।
ক্যাশ ক্লার্কের মুখটা থমথমে, বন্ড গিয়ে বলল, আমার মজুরী চাই।
ক্লার্ক তাচ্ছিল্যের মত করে একবার সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করল, হায় সৃষ্টিকর্তা, একি করলে? ইঁদুরখেকো গুলোকে আস্ত গর্দভে পরিণত করে ছাড়লে? তারপর সে বন্ডের দিকে ফিরে বলল, আজ আর কাউকে মজুরীর টাকা দেওয়া হবে না। কাল এস। এখন ভালয় ভালয় এখান থেকে কেটে পড় দেখি।
বন্ড এগিয়ে এল আরো দু পা। হংকং ডলারে আমার মজুরী দেবে কিনা বল? আরেক পা এগিয়ে দেখল সামনেই একটা বারান্দা, বারান্দার শেষ প্রান্তে মালপত্র বহনের একটা লিফট।
ক্লার্ক এবার বন্ডকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কি বল?
নিকোলাস হান্টিংটন কার্টার।
লোকটার ইংরেজি উচ্চারণ খুবই স্পষ্ট। ক্লার্কের ঘাড়ের উপর প্রচণ্ড একটা ঘুষি মারল। টাল সামলাতে না পেরে লোকটা ছিটকে পড়ল। বন্ড বিদ্রুপের স্বরে বলল, দোস্ত, এ যাত্রায় খুব বেঁচে গেলে তুমি। সে ঘড়ি দেখল ভোর চারটে। চুন লি ধরেই নিয়েছে বন্ড আর আসবে না। বন্ড এবার লিফটে একেবারে আটতলায় উঠে গেল। ফাঁকা বারান্দা। তার পায়ে জুতার কোন শব্দ হল না।
