কিন্তু বন্ড অন্য রকম ভেবে দেখল, সে তার জায়গা ছেড়ে উঠে পড়ল। এক ছুটে সিঁড়ির ধাপগুলি পার হয়ে বালির ওপর জোরে চলতে থাকল মেয়েটির দিকে। তার পেছনে যে দুটো লোক বসেছিল তারাও আন্দাজ করছে অন্য কিছু। তাদের মধ্যে যে কোন একজন কয়েকটা পয়সা টেবিলে রেখে দিয়ে দুইজনে উঠে পড়ল এবং সমান তালে পা ফেলে সেই ফাঁকা স্থানটা পার হয়ে গিয়ে বেলাভূমিতে নেমে গেল। অতি নিপুণভাবে মিলিটারি ভঙ্গিতে ঠিক পাশাপাশি চলতে থাকল যে পথে বন্ড চলে গিয়েছিল।
এখন সেই বিস্তীর্ণ লাল রঙের বালির পটভূমিতে আঁকা আছে মূর্তিগুলিকে খুব তীব্র স্পষ্ট দেখাচ্ছে। সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে কোথায় যেন এক ভয়ের গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে। মেয়েটি খুবই ফর্সা। একটি ছেলে আর তার পিছনে দু টি চওড়া চেহারার লোক সামনে এগিয়ে যাওয়া তাই সমস্ত ঘটনাটার মধ্যে কেমন যেন ভয়ের বিহ্বলতা মিশে আছে।
মেয়েটি ও বন্ডের মধ্যের দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছিল। সে বুঝতে পারল, যে পানির রেখাটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখামাত্রই সে তাকে ধরে ফেলবে। এবার কিন্তু বন্ড ভাবতে লাগল মেয়েটির কাছে গিয়ে কি বলা তার উচিত হবে। আমার মনে হচ্ছে, তুমি নিজেকে মারতে যাচ্ছ। তাই আমি তোমাকে বাঁচাতে এলাম। অথবা সমুদ্রের ধারে হাঁটতে গিয়ে তোমাকে দেখে হঠাৎ চেনা মনে হতে এগিয়ে এলাম। তোমার সাঁতার শেষ হলে এক পাত্র চলবে কিনা।–না, কোনটাই খাটবে না, নেহাৎ ছেলেমানুষির মত দেখাবে। অবশেষে সে মনে ভেবে নিল–ওরে ট্রেসিং যে। তারপর সেই মেয়েটি সামনে ঘুরবে–আমি তো তোমার জন্য চিন্তায় অস্থির হয়ে গেলাম। যেটা অন্ততঃ কোন ভণিতা বলে মনে হবে না।
হলুদ দিগন্তের একেবারে নিচ সীমায় সমুদ্রকে যেন লোহার পাতের মত বলে মনে হল। তীরের ওপর থেকে বাতাস ভাঙ্গার গরম হাওয়াকে টেনে নিয়ে চলে গেল পশ্চিম দিকে। আর সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউ গুলিকে ভয়ানক সাদা বলে মনে হল। গাঢ় নীল রঙের গোধূলি বেলার সাগর ভূমিকে বড় ফাঁকা, নিঝুমকে মনে হচ্ছে কোন বিষাদ এসে হাজির হয়েছে। মেয়েটির সাদা রঙের সাঁতারের পোশাক ও ছন্দময় স্বর্ণদেহী দেখতে দেখতে বন্ডের মনে হল যেন গাংচিল, সমুদ্রের শব্দকে ভেদ করে তার গলার শব্দ শুনতে হলে বেশ সময় লেগে যাবে। পানির কাছে এসে মেয়েটির চলার গতি অনেক কমে গেল। ঘাড়ের ওপরে এক রাশ চুল নিয়ে মেয়েটির মাথা বোধ হল ক্লান্তি ও চিন্তার ভারে সামান্য নিচু হয়ে আছে। বন্ড এত তাড়াতাড়ি হাঁটল যে, মেয়েটির থেকে মাত্র দশ পায়ের তফাতে এসে তাকে ডেকে উঠল, এই! ট্রেসি।
কিন্তু মেয়েটি না চমকে এসে দাঁড়াল বন্ডের কাছে। তার পা থেমে গিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর একটু ঘুরে দাঁড়াল। একটা অতি ক্ষুদ্র ঢেউ এসে তার পায়ে আছড়ে পড়ল। বন্ডের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ দুটি ফোলা ও পানিতে ভর্তি। এই চোখ দিয়ে বন্ডকে দেখে নিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর ফিরে এসে আবার বন্ডের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। নিরুত্তাপ গলায় বন্ডকে মেয়েটি বলল, কি ব্যাপার? তুমি আমার কাছে কি চাও?
আমরা তোমার জন্য চিন্তায় আছি। এখানে তুমি কি করতে এসেছ। ব্যাপারটা জানাবে কি? আবার মেয়েটি বন্ডের পিছনটা একবার দেখে নিল। তার হাতটা ঠোঁটের উপর রাখল। তার আড়ালে কি যেন বলতে চাইল। বন্ড ঠিক সেটা বুঝল না। তারপর বন্ড তার পিছনে খুব কাছ থেকে অতি মৃদু অথচ খুব কোমল গলা শুনতে পেল–একদম নড়বে না, নড়লেই পায়ে গুলি লেগে যাবে।
বন্ড একটু নিচু হয়ে সাঁ করে ঘুরে দাঁড়াল। তার ডান হাতটা কোটের পকেটে ঢুকিয়ে দিলে একটা রিভলবারের হাতলের মধ্যে। একজোড়া অটোমেটিক সাদা রঙের পিস্তলের চোখ তার দিকে তাকিয়ে হেঁয়ালির হাসি হাসল। বন্ড এবার আস্তে করে সোজা হয়ে উঠল। পাশের দিকে পিস্তল থেকে হাত নামাল এবং একটা চাপা নিশ্বাস তার দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল। দুটো অবিচল পেশাধারী গুণ্ডা তার পিস্তল থেকে অনেক বেশি কিছু বুঝাতে চাইল। দুইজনের মুখে কোন ভয় উত্তেজনার চিহ্ন মাত্র নেই। তাদের হাসিগুলি হল মৃদু অথচ বেয়ারা ও পরিতৃপ্তের–তবে চোখ দুটোর মধ্যে কোন সাবধানতার চিহ্ন মাত্র দেখা গেল না। শুধু একটু ক্লান্তি। বন্ড কিন্তু এর আগেও এই রকম গুণ্ডার মুখোমুখি হয়েছে। এই ভাবেই এরা এসে থাকে। এরা দুই জনেই পেশাদার খুনী।
বন্ড-এর কিছু মাত্রই বুঝতে পারছে না–এই লোকগুলিই বা কে? এরা কার জন্য কাজ করছে বা এদের লক্ষ্যই বা কি? তবে আগে থেকেই ঘাবড়ে গিয়ে বিপদকে ডেকে আনার কোন কারণ দেখছি না। সে আর উত্তেজিত না হয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। মাথাটাকে ফাঁকা করে দিয়ে শুধু অপেক্ষা করতে থাকল কি হয় দেখার জন্য।
হাত দুটো মাথার উপরে তোলা। একদম শান্ত, তাদের গলার আওয়াজ শুনতে পেল। তারা মনে হয় দক্ষিণের লোক আর তাদের কথার টানও সেই রকম। মনে হয়, যতদূর সম্ভব ভূমধ্য সাগরীয় হবে। ওদের মুখ দেখলেও বোঝা যায়। চামড়া শক্ত দাগওয়ালা হলদে বাদামী রঙ। মার্সাই-এর লোক বলে মনে হয় কিংবা ইটালিয়ান। সেই বিখ্যাত মাফিয়াচক্র। লোকদুটো মনে হয় গুপ্তচর আর নইলে দুদে গুণ্ডা। বন্ডের মনে একটা আই, বি, এস কম্পিউটারের মত বিদ্যুৎ গতিতে কাজ করতে লাগল। এই অঞ্চলে কারা কারা তার শত্রু আছে? তবে কি ব্লোফেন্ডের দল হবে? শিকার কি তাহলে শিকারীর উপরই ঝাঁপিয়ে পড়ল? সামনে যখন আর কোন আশা নেই, যখন মনে হল সব কিছুই শেষ হয়ে গেল তখনই মনে হয় সবচেয়ে শান্ত হবার পালা। গাম্ভীর্য দেখানোর সময় ঔধাসীন্য দেখানোই ভাল। বন্ড তার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল–আমার মনে হয়, তোমার এই সব কাণ্ডকারখানা যদি তোমার মা দেখেন নিশ্চয় খুব খুশি। হবেন না। তুমি কি ক্যাথলিক? অতএব, আমি তোমার কথার অমান্য করছি না। এখন সব শুনে লোকটির চোখ দুটি জ্বলে উঠল। তাহলে বন্ডের কথার খোঁচাটা ধরেছে। বন্ড তার হাত দুটি মাথার পশ্চাদে সংবদ্ধ করল।
