কঠোর দৃষ্টিতে প্রিন্সেসের দিকে তাকাল বন্ড। তারপর গম্ভীর স্বরে বাথরুম দেখিয়ে বলল, আমি তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। চটপট তৈরি হয়ে নাও।
.
০৪.
ক্রিস্টোফার মারলোর সময়ে তৈরি অতি পুরাতন পান্থশালা কক এন্ড বুল। অনেকের ধারণা মারলো এখানে খুন হয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া ডক রোডের উপর এই পান্থশালাটিতে আজ আর সেই রমরমা ভাব নেই।
লন্ডন শহরের পুরনো অঞ্চলের নির্জন উপকণ্ঠে এই পান্থশালাটি দেখলে কেউ বুঝবেই না যে, বাড়ির নিচে শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত অনেকগুলি ঘর গোলক ধাঁধার মত সাজানো এবং স্কটল্যান্ডের ইয়ার্ডের স্টেশন ব্রাঞ্চের অফিস।
এ্যাক্স-র প্রধান ডেভিড হক একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সাবধানী লোক। তিনি তার দায়িত্বের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। তিনি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত একটা ঘরে পায়চারী করতে করতে তার সংস্থার নাম্বার ওয়ান এজেন্টের দিকে স্থির। চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন, নরকের মতই এসব জঘন্য, বে-আইনী বুঝলে? আমরা পুর্তগীজ, নিগ্রো সবই পিচ্ছিল জমির উপর দাঁড়িয়ে আছি। ওদের কোন দেশ নেই, যাযাবরের মত। পুর্তগীজরা একটু ভালর দিকে। ব্রিটিশদের। ব্যাপারে তাদের একটু সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ, এ্যাংগোলার ব্যাপারে আমরা তাদের পথ নিয়েছি। তাই তারা সিংহের ল্যাজ মোচড় দিতে চায় না আর সেই কারণেই প্রিন্সেসকে ছিনিয়ে নিতে সাহস রাখে না তারা।
বন্ড এবং তার বস দু জনে মিলে প্রায় আধঘণ্টা ধরে আলোচনারত। হক নিজে থেকেই আবার বলেন, সাড়ে চার ঘন্টা আগে আমার বিছানায় ঘুমাচ্ছিলাম। ফোনটা বেজে উঠল। স্টেটের সেক্রেটারীর ফোন। পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে আমি, মিঃ আই প্লেনে উঠি। আটলান্টিকের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় দু হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া কম কথা।
এখনো কিন্তু আমি আপনার কথার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারিনি স্যার। বন্ড বলে, সেক্রেটারীর দূত আলোচনা করার জন্য ছুটে আসছেন তার নিজস্ব প্লেনে। এর কারণ পুর্তগীজরা তারস্বরে চিৎকার করছে। এ্যাক্স-এর একটা নিজস্ব সুপারসোনিক প্লেন থাকা উচিত। তার জন্য অবশ্য ফরমাশ দিয়েছি। বন্ড কাটারের অসীম ধৈর্য, বসের কথা শোনার ফাঁকে সে প্রিন্সেসের কথা জেনে নেয় একবার। বেসমেন্ট কমপ্লেক্সের আর একটা ঘরে বন্দিনী প্রিন্সেস। হকের নির্দেশ প্রিন্সেসকে সুস্থ করে কথা বলতে ২৪ ঘণ্টা লাগবে। প্রিন্সেসের উপর নজর রাখার সবরকম ব্যবস্থা করছেন হক।
দেওয়াল মানচিত্রটা টেনে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন হক। খুব ভাল একটা প্রশ্ন পুর্তগীজদের সম্পর্কে। তুমি মনে করছ, সংকেত পেলেই আমেরিকার মত একটা দেশ ঝাঁপিয়ে পড়বে? কেপ ভার্দি দ্বীপের নাম শুনেছ?
ভাসা ভাসা শুনেছি। কখনো যাইনি সেখানে। দ্বীপটা পুর্তগালের?
হকের মুখে ভাজ পড়তে দেখা গেল এবং বিরক্তিভাবে বললেন, হু! ১৪৯৫ সাল থেকে দ্বীপটা পুর্তগালের অধীনে। দেখ
মানচিত্রের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বৃদ্ধ হক বলতে থাকেন, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে তিনশো মাইল দূরে। আলজিরিয়া মরক্কোর কাছে। আশে পাশে আরো কয়েকটা ছোট বড় দ্বীপ আছে। এর মধ্যে একটা কিংবা তারও বেশি দ্বীপে আমেরিকা কিছু গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছে।
গুপ্তধন স্যার? বলে কি লোকটা? আজগুবি গল্প নয় তো? বন্ড প্রায় চিৎকার করে বলল।
গুপ্তধন মানে হাইড্রোজেন মালমশলা। ব্যাপারটা একদম টপ সিক্রেট, আশা করি, সেটা তোমাকে খুলে বলতে হবে না।
বন্ড মাথা নাড়ল বিজ্ঞের মত।
এখন ব্যাপারটা এইরকম দাঁড়িয়েছে–পুর্তগালের লোক চাইছে, আমাদের সেই সব হাইড্রোজেন বোমার মাল মশলা সেখান থেকে বার করে নিতে।
হক সিগারেট মুখে দিয়ে আবার বলতে থাকেন, বিশ্বের প্রায় সবজায়গাতেই আমাদের এইরকম বোমা লুকানো আছে। কিন্তু একমাত্র এখানে এই দ্বীপে তাই আমরা এখন ওগুলো সরাতে চাই। আমাদের এই কাজে অফিসার হবে পুর্তগীজরা এ ব্যাপারে ঠিকমত আভাষ দেওয়া।
কিন মাস্টারের কাছে ব্যাপারটা তখনও ঠিক মত পরিষ্কার হচ্ছিল না। দেখা যাচ্ছে ওরা এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি, বন্ড বলল, কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না, এত দ্রুত কিভাবে পুর্তগীজ সরকারের প্রতিক্রিয়া হল? তারপর সে তার বসকে সব খুলে বলল সকালের ঘটনা থেকে প্রিন্সেসকে ডিপ্লো মাঠ থেকে তুলে আনা সব কিছু।
বস কাঁধ ঝাঁকাল, এত খুবই সহজ ব্যাপার। এরা প্রিন্সেসের পিছু নিয়েছিল নিঃশব্দে এবং ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল তোমার কাছ থেকে। সবশেষে চেয়েছিল নিজের প্রচার। আমার ধারণা মেয়েটি যখন ক্লাবে ঢোকে তখন থেকেই ওরা তাকে অনুসরণ করে। তুমি তাকে সেখান থেকে বার করে নিয়ে এসেছিলে, সে দৃশ্যটাও নজর এড়ায়নি। তোমাকে চিনেও থাকবে হয়ত। মেজর এক সময় কাউন্টার ইনটেলিজেন্সিতে ছিল, আর পুর্তগীজের কাছে ফাইলও আছে। অতএব সে অনেকগুলো ফোন করে। সম্ভবত এ কাজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লেগে থাকবে। প্রথমে মেজর তার দূতাবাসে ফোন করে, দূতাবাস লিসবনে, এবং ওয়াশিংটনকে।
আর সেক্রেটারি জানায় আমাকে, হক তার কথার জের টেনে বলেন। বন্ড সিগারেট ধরিয়ে হকের দিকে তাকাল। এই মুখ আগেও দেখেছে। লোভী কুকুরের দৃষ্টি, সে জানে কোথায় মাংসল হাড় পাওয়া যায়। কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রাখার জন্য বদ্ধপরিকর সে।
