অপরূপ সুন্দর সরল ও বিশাল এক সমুদ্রের তীরের দৃশ্য। ব্রিটানি ও পিকার্ডির সৈকতের এই সব বৈচিত্রপূন্য দৃশ্যই বোদা, টিসসা ও মোনেটের মত খ্যাত শিল্পীদের প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে অক্ষয় রাখার জন্য।
এক কংক্রীটের দেওয়ালের আড়ালে জেমস্ বন্ড বসেছিল, সূর্যাস্তের ঠিক মুখোমুখি। সমস্ত পরিবেশটায় তার মনে কিছুক্ষণের মধ্যে এক তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল। ভীষণ ভাবে তার মনে হল ছোটবেলার সমস্ত কথা–সেই পায়ের তলায় তপ্ত ছোট ছোট বালুকণার রেশমী অনুভূতি আর জুতা মোজা পরার সময় পায়ের সাথে ভেজা বালি ঘষা লাগার ব্যথা, জানলার নিচে যত্নে সাজানো ঝিনুক ও শৈবালের সেই চমৎকার স্তূপ (ওগুলো তো নিয়ে যাওয়া যাবে না মানিক, তোমার প্যান্ট ময়লা হয়ে যাবে)। সেই সমুদ্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গাছের নিচে ছোট ছোট কাঁকড়া ধরার চেষ্টা করা, সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল উজ্জ্বল ঢেউগুলির ভিতর সাঁতারও ভীষণ বিরক্তিকর অথচ অমোঘ। এবার উঠে আসলে ভাল হয়। যেন তার সেই শৈশবে সব কিছু অতীতের পেট থেকে তার সামনে উঠে এল কোদাল ও বালতি হাতে করে। সেই সমস্ত ক্যাডবেরীর লজেন্সের আর লেমোনেড খাওয়ার বয়স থেকে অনেক দূরে সে সরে এসেছে।
বন্ড খুব অধৈর্য হয়ে একটা সিগারেট ধরাল। এতক্ষণ অলসভাবে বসেছিল। এবার সোজা হয়ে বসে এইসব ভাবনার স্মৃতিগুলোকে জোর করেই মনের এক বিস্মৃত চিলে কোঠায় ফেরৎ দিয়ে দিল। আজ সে পূর্ণ বয়স্ক যুবক, বহু বছরের বিশ্রী ও ভয়ঙ্কর স্মৃতিতে পরিপূর্ণ এক গুপ্তচর। এই কংক্রীটের আশ্রয়ে সে বসে রইল বিশৃঙ্খল সৈকতে, একদল পুঁচকে, ময়লা বাচ্চাদের দেখে তার ভাবালু হয়ে পড়ার জন্য তো নয়। সে আজ এখানে এসেছে গুপ্তচর বৃত্তি করতে। সে এসেছে একটি মেয়ের উপর লুকিয়ে নজর রাখবে বলে।
সূর্য তখন দিগন্তের কাছ বরাবর নেমে এসেছে। সেপ্টেম্বরের হিম দিনের উত্তাপের নিচে চাপা পড়েছিল। এতক্ষণে তার মৃদু স্পর্শ অনুভূতি হল। স্নানার্থী বাহিনী এবার ওদের ছোট ছোট তাঁবুগুলি খুলে রেখে তাড়াতাড়ি শহরের আশ্রয়ে ছুটে চলেছে। শহরের কফিহাউসগুলিতে আলো জ্বলছে একে একে। সুইমিং পুলের ঘোষকটি এখনো চিৎকার করে খদ্দেরদের সজাগ করে রাখছে। হ্যালো, হ্যালো, এখন সময় হয়ে গেছে, এবার আপনারা সুইমিং পুল ছেড়ে চলে যান–সূর্য যখন অস্ত যাচ্ছে ঠিক তার পিছনে দুটি বম্বার্ড রক্ষাকর্তার নৌকা ছুটে যাচ্ছে উত্তরদিকে বন্দরের দিকে। তাদের হলুদ পতাকার উপর নীল রঙের ক্রস চিহ্ন আঁকা আছে।
ভাটার টানে নম্র সমুদ্রের জলরেখা ইতিমধ্যে এক মাইল দূরে চলে গেছে। কয়েক মিনিটের ভিতরই এই বিশাল বেলাভূমিতে থাকবে শুধু ঝকঝক গাংচিল পিকনিকের এটোগুলি নিয়ে কাড়াকাড়ি করে খাবে। তারপর কমলালেবুর মতন সূর্যটি ঝুপ করে সমুদ্রে ডুব দিল। আর সমুদ্রতীর কিছুক্ষণের মধ্যে একেবারে জনশূন্য হয়ে যাবে। যতক্ষণ পর্যন্ত না জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকারা ঘুরতে ঘুরতে আনার্থীদের কুটীরগুলির পিছনে অন্ধকার কোণায় নিজেদের আরো কাছাকাছি সরে আসবে।
বন্ডের সামনে এলোমেলো বেলাভূমি থেকে এক দুঃসাহসিক বিকিনি পরা সোনার বরণ অঙ্গ নিয়ে দুটি মেয়ে প্রায় এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এল যেখানে বন্ড বসেছিল ঠিক তার কাছাকাছি। সেখানে দাঁড়িয়ে বন্ডের চোখের সামনে নিজেদের দেহ দেখাতে দেখাতে আবার নিজেদের মধ্যে কথা শুরু করে দিল। তারা লক্ষ্য রাখছে যে বন্ড কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে কিনা, সেই রকম কোন ভাব দেখা যাচ্ছে না দেখে তারা হাতে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে শহরের দিকে চলে গেল। আর বন্ড বসে থেকে শুধু ভাবতে থাকল, ফরাসী মেয়েদের নাভি যত সুন্দর আর গভীর অন্যদের সেরকম হয় না কেন? তবে কি ফরাসী সার্জেন্টরা মেয়েদের জন্মের সাথে সাথে ভবিষ্যতে যাতে যৌন আবেদন করতে পারে তার জন্য চেষ্টা করে থাকেন?
এবার সমুদ্রের নুলিয়ারা তাদের শিঙা বাজিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দিল যে তারা এখন আর এখানে থাকবে না। কিন্তু সুইমিং পুলের বাজনা মাঝপথেই থেমে গেল। আর সেই বিশাল সমুদ্রতট হঠাৎ খুব ফাঁকা হয়ে গেল।
তাই বলে একেবারেই কিন্তু ফাঁকা হয়ে গেল না। প্রায় একশ গজ দূরে সাদা-কালো মেশানো ডোরাকাটা চাদরটার ওপর এক ঘণ্টা আগে সেই মেয়েটি একভাবেই উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। অস্তমুখী সূর্য ও বন্ড এখন একই সরল রেখায় অবস্থান করছে। শেষ বেলার সূর্য সুইমিং পুলের পানিতে তার রক্ত রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে আর বন্ড বসে সেই মেয়েটিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বন্ড কি যেন ঘটে যাবে বলে অপেক্ষা করছে। অবশ্য সেটা কি হতে পারে তা সে জানে না। আসল উদ্দেশ্য মেয়েটির উপর নজর রাখা। তার মন থেকে বলে উঠছে মেয়েটা কোন বিপদে পড়ে আছে। নাকি বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা তার মনে উঁকি দিচ্ছে। বন্ড সেটাও বুঝতে পারছিল না। সে শুধু বুঝতে পারছে যে মেয়েটিকে একা ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না। বিশেষ করে এই সমুদ্রতীর থেকে সবাই চলে যাবার পর।
বন্ড নিজে ভুল করল। সমুদ্রতট থেকে সবাই মোটেই চলে যায়নি। তার পিছনে, ফাঁকা জায়গার অন্যদিকে কাফে দ্য লা প্লাগ-এ তখনো দুই জন লোক দেখা যাচ্ছে। তাদের গায়ে দেখা যাচ্ছে বর্ষাতি ও মাথায় কালো টুপি, বসে ছিল যাতায়াতের রাস্তার ঠিক পাশে, একটি শূন্য টেবিলে। দুজনের সামনে অর্ধেকটা খাওয়া কফির পেয়ালা। তারা চুপ করে বসেছিল। শুধু কেবল তাকিয়ে দেখছিল কিছুটা দূরে ঘষা কাঁচের তৈরি পার্টিশনটার দিকে। যেটা বন্ডের ঘাড় ও মাথা দিয়ে আড়াল করে রেখেছে। অনেক দূরে সাদা একটা বিন্দুর মত মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে। তারা সেদিকটাও লক্ষ্য রেখে যাচ্ছে। তবে খুব মন দিয়ে নয়। তারা যে ভাবে নিশ্চুপ হয়ে ও অসময়ে বর্ষাতি পরেছিল তা যে কোন ব্যক্তির চোখে পড়লেই সে অস্বস্তি বোধ করবে। কিন্তু ভাগ্য ভাল ওদের দেখার মত কোন লোক ওখানে ছিল না। অবশ্য ওয়েটার ভিন্ন। সে বুঝে ফেলল যে এরা শয়তান ধরনের লোক আর এটাও মনে করছে যে ওরা হয়ত এখনই চলে যাবে। কমলা রঙের সূর্য নিচের দিকে দিয়ে দিগন্তরেখাকে স্পর্শ করল এবং সঙ্গে সঙ্গেই, যেন এক সংকেত পেয়েই মেয়েটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। চুলের মধ্যে দিয়ে একবার পিছনে দু-হাত নেড়ে নিয়ে সে হাঁটতে শুরু করে দিল। একটা গতিতে ঠিক সূর্যের সামনের দিকে এক মাইল দূরের ফেনায় ভরা পানির রেখার উদ্দেশ্যে। ঠিক গোধূলীর সময়ে মেয়েটি গিয়ে পৌঁছাবে সমুদ্রের তীরে। যে কেউ হলে এই দৃশ্য দেখলে ভাবত যে, মেয়েটির মনে হয় আজই ছুটির শেষ দিন। তাই শেষবারের মত সমুদ্রে গোসল করতে এসেছে।
