তারা জাহাজে গিয়ে উঠতে তাদের অভ্যর্থনা জানান হল রাজকীয় সম্মান এর সঙ্গে। বন্ড কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এখন ক্লান্তিতে শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে, হুইস্কির জন্য প্রাণটা ছটফট করছে আর ভাবছে পুসি গ্যালোর গোল্ডফিংগারকে ছেড়ে কেন তার কাছে এল।
কেবিনের পাশে দরজা খুলে পুসি ভেতরে ঢুকল। পরনে সংক্ষিপ্ত পোশাক। পটে আঁকা ছবির মত লাগছে তাকে। ইতস্তত করে বলল, আমি এসেছি।
বন্ড কড়া গলায় বলে উঠল, দরজাটা বন্ধ করে সোয়েটারটা খুলে বিছানায় উঠে এস, ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
বাধ্য মেয়ের মত কথা শুনল পুসি। বন্ডের হাতে মাথা রেখে বলল, সাধারণ একটা মেয়ের মত নরম সুরে, আমি চলে গেলে আমাকে চিঠি লিখবে তো?
বন্ড গভীর চোখে তাকাল তার দিকে। পুসির আর সে কঠোরতা, সে ঔদ্ধত্য নেই। নিচু হয়ে দু চোখে চুমু খেল বন্ড।
গোল্ড লাইন
গোল্ড লাইন
০১.
লন্ডন শহর গরমে ঝলসে উঠেছে; জুলাই শেষ থার্মোমিটারের পারা ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে আশি ডিগ্রিতে এসেছে। ব্রিটেনে এটাই সবচেয়ে বেশি গরম, বিয়ার এবং ঘামের ভ্যাপসা গন্ধ ফারেনহাইটের দাগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। চলেছে।
পোরটেবোনো রোডের স্যাঁতসেঁতে দি গোল্ডেন ইউনিকর্ণ বার তখন বন্ধ হওয়ার মুখে। এই বারে এয়ার কন্ডিশন নেই, অত্যন্ত নোংরা। বিয়ার, টোব্যাকো, গায়ের ঘাম এবং সস্তা প্রসাধনীতে একটা জঘন্য অবস্থা। বারের মালিক সমাগত মাতালদের কানে তালা ধরিয়ে দিতে থাকে, মাল শেষ করুন চটপট, দরজা বন্ধ হওয়ার সময় হয়েছে।
বারের পিছন দিকে ছ জন মাতালকে দেখা গেল। ওরা কি যেন পরামর্শ করছে। ওদের মধ্যে পাঁচজনকে দেখলেই বোঝা যায় ওরা লন্ডন শহরের বেশ ডাকসাইটে মস্তান, তাদের মধ্যে একজন অন্য ধরনের। পোশাক বেশ কনজারভেটিভ, দ্রভাব। ভদ্রলোকের নাম থিওডোর ব্লেকার। বন্ধু-বান্ধবদের কাছে টেড বা টেডি। অবশ্যই থিওডোরের বন্ধুবান্ধব বেশি নেই। থিওডোর আগে ছিল কুইনা আলস্কার রাইফেনাস-এর ক্যাপ্টেন। রেজিমেন্টের তহবিল তছরূপের দায়ে তাকে চাকরিটা হারাতে হয়।
থিওডোর কথা শেষ করে পাঁচজন মস্তানকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে বলল, বুঝতে পারছ তোমাদের কি করতে হবে? কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে এখুনি কর, পরে আমার পক্ষে জবাব দেওয়ার সময় হবে না।
একজন মস্তান বলল, আমার অনেক প্রশ্ন আছে, তার আগে একটা বোতল ওস্তাদ।
থিওডোর অদূরে বারের মালিকের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল। বিরক্তভাব প্রকাশ করল না। কারণ আগামী কয়েক ঘণ্টার জন্য এই বেয়াদব লোকগুলিই তার দরকার–অন্ততঃ মান বাঁচাবার জন্য। থিওডোের সিগারেট ধরাল, আর কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার, তারপর আর কে পায় তাকে? তার ব্যবসায় লেনদেন হলে তার পকেটে অনেক টাকা আসবে। তবে হ্যাঁ, তাকে অবশ্যই ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাতে কি আছে, দক্ষিণ আমেরিকা দেশটি দেখার জন্য সবসময়ে তার মন চেয়ে এসেছে।
মস্তানদের ওস্তাদ আলফি ডুলিৰ্টল লোকটা দারুণ চতুর, ঠোঁট চলকে গড়িয়ে পড়া মদ হাত দিয়ে মুছল। থিওডোরকে নিরীক্ষণ করে তারপর জিজ্ঞেস করল, কোন খুন খারাপি হবে না তো টেড়? স্রেফ মাথায় রড, কিন্তু খুন নয়। এই তো? তাছাড়া পাঁচশ পাউন্ডের জন্য খুনই বা করতে যাব কেন, তাই না?
সোনার দামী কব্জি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্তভাবে বলল, আমি তো সব খুলেই বলেছি। একান্তই যদি ঝামেলা হয় তখন অন্য কথা। তোমাদের কাজ হবে আমাদের মক্কেলদের ওপর নজর রাখা। দেখবে কোন মক্কেল আমাকে না। কিছু করে বসে–বুঝলে আলফি, কেউ কেউ হয়ত দাম না দিয়েই আমার মাল উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
থিওডোর তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভাবল, এরা তেমন বুদ্ধিমান নয় বলেই সংগঠিতভাবে এরা কোন অপরাধমূলক কাজ করতে পারবে না। থিওডোর বলল, তোমরা ঠিক আড়াইটার সময় আসবে। আমার মক্কেলরা আসবে ঠিক তিনটের সময়। ওখানে বীটে কনস্টেবল ডিউটিতে থাকবে, তাই তোমরা একসঙ্গে না এসে আলাদাভাবে আসবে। আলফি, তোমাকে ঠিকানাটা বলে দিই, কেমন? ১৪ নং হাফ ক্রিসেন্ট মিউজ- মুরগেট রোডের ঠিক উল্টোদিকে, পাঁচতলা, মনে থাকবে তো?
নিশ্চয়ই।
ঠিক আছে। আমি এখন চলি। ঐ সময় তোমাদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে–চীয়ার্স।
থিওডোর চলে যেতেই ছোট-খাটো, বেঁটে, নাক উঁচু ওস্তাদ তার সঙ্গীদের বলল, শোন একদম ভদ্রলোকের মত। কোন রঙ নেই মাইরি। একেই বলে গুরু!
বারের মালিক আবার ঘোষণা করল, সময় নেই এবার দয়া করে তোমরা তল্পিতল্পা গোটাও।
ট্যাক্সি থেকে নেমে থিওভোর মুরগেট গেটের ১৪নং বাড়ির দিকে হেঁটে যায়। পাঁচতলা ভিক্টোরিয়া যুগের বাড়ি। গলিতে ঢুকেই থিওডোর তার প্রাক্তন রেজিমেন্টের টাইটা খুলে ফেলল। রেজিমেন্টের তহবিল তছরূপের দায়ে তার চাকরি যায়নি। আসল কারণ, তার বাবা ছিল কসাই। এবং মা বিয়ের আগে এক ভদ্রমহিলার পরিচারিকা ছিল বলে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
পাঁচতলায় সরু সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থিওডোরের খুব কষ্ট হচ্ছিল নিঃশ্বাস নিতে। মাঝামাঝি এসে সে হাঁপাতে লাগল, তবু ভবিষ্যতের কথা ভেবে কষ্ট সহ্য করল। মনকে বোঝাল, আরে বাবা মালকড়ি পেলে শরীর সারাতে আর ক দিন লাগবে। সবে তো সে বেয়াল্লিশটা বসন্ত পেরিয়েছে, এখনো জীবনে কত বসন্ত আসবে। কিন্তু টাকা চাই, অনেক টাকা। তারপর দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে তার টাকার গরমেই অর্ধেক স্বাস্থ্য ফিরে যাবে। টাকা থাকলে কি না হয়?
