পাঁচটা মুখ তার দিকে ঘুরল, চোখ বড় করে বন্ডের দিকে চেয়ে আছে। বন্ড সোজা দাঁড়িয়ে বলল, গোল্ডফিংগার মারা গেছে। তোমাদের কেউ মাথা নাড়াবার বা অবাধ্য হবার চেষ্টা করলে শেষ করে দেব। পাইলট, আমাদের অবস্থান। গতিপথ ও উচ্চতা, গতিবেগ জানাও।
ঢোক গিলে জবাব এল, স্যার আমরা গুসবের পাঁচশো মাইল পূর্বে আছি। গতি ঘণ্টায় আড়াইশো মাইল, উচ্চতা দু হাজার ফুট।
-এত কম উঁচুতে আর কতক্ষণ উড়তে পারবে, পেট্রল খাচ্ছে তো বেশ।
–হা স্যার, আমার হিসেব অনুযায়ী এই গতি ও উচ্চতায় আর মাত্র ঘণ্টা দুয়েক উড়বে।
–কটা বাজে?
নেভিগেটর জবাব দিল, ওয়াশিংটনে এখন ভোর পাঁচটা বাজতে পাঁচ মিনিট স্যার। এই মাত্র টাইবা সিগন্যাল পেলাম আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ভোর হয়ে যাবে।
আবহাওয়া জাহাজ চার্লি কতদূরে?
–উত্তর পূর্বে প্রায় তিনশো মাইল হবে।
–গুসবে পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে?
–না স্যার, তার আগেই পেট্রল শেষ হয়ে যাবে। কোন মতে উপকূলে পৌঁছন যাবে।
–ঠিক আছে আবহাওয়া জাহাজ চার্লির দিকে ঘুরে যাও। অপারেটর ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দাও।
–আচ্ছা স্যার।
অপারেটরের মৃদু গলা শোনা গেল। সামুদ্রিক স্টেশন চার্লি। আমি স্পীড বোর্ড ৫১০, থেকে কথা বলছি। সাড়া দাও। জি অ্যালজি থেকে ডাকছি। চার্লিকে ডাকছি জি, অ্যাল জি… (প্লেনটির সাংকেতিক নাম)।
তীক্ষ কণ্ঠস্বর শোনা গেল, জি অ্যালজি তোমার অবস্থাও জানাও। গ্যাভোর বিমানবন্দর থেকে কথা বলছি। জরুরী দরকার। জি অ্যালজি…
হঠাৎ চার্লি থেকে শান্ত স্বর ভেসে এল, সামুদ্রিক স্টেশন চার্লি থেকে স্পীডবোর্ড ৫১০-কে ডাকছি। শুনতে পাচ্ছ?
বন্ড পিস্তল পকেটে পুরে মাইক্রোফোন হাতে নিল। বলল, চার্লি, আমি জি-অ্যালজি স্পীডবোর্ড থেকে বলছি। যে প্লেনকে গত সন্ধ্যায় আইডল ওরাইন্ড থেকে হাইজ্যাক করা হয় তাদের সর্দারকে মেরে ফেলেছি এবং কেবিনের যথেষ্ট ক্ষতি করেছি হাওয়া বার করে দিয়ে, যার জন্য এরা বেশি উঁচু দিয়ে যেতে পারছে না। গুসবে পর্যন্ত যাওয়ার মত পেট্রল নেই। তোমার যথাসম্ভব কাছে সমুদ্রের পানিতে প্লেন নামাতে চাই। পানির ওপর আলো লাগানোর ব্যবস্থা কর।
এবার একটা নতুন কর্তৃত্বপূর্ণ গলা শোনা গেল। জাহাজের ক্যাপ্টেন নিজেই বলছেন বোধহয়, স্পীডবোর্ড আমি চার্লি থেকে কথা বলছি। তোমার বার্তা আমরা শুনতে পেয়েছি কে কথা বলছ জানাও।
এরপরের কথাগুলো যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করবে সে কথা মনে পড়ে হাসল বউ। বলল, চার্লি, স্পীডবোর্ড থেকে বলছি, আমি ব্রিটিশ গুপ্তচর বাহিনীর এজেন্ট নম্বর 007, আবার বলছি 007 হোয়াইট হল রেডিও মারফত আমার কথার প্রমাণ পাবে।
অপর প্রান্ত বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। আবার পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এক সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা শুরু হল। গ্যাভোর থেকেই ওদের থামিয়ে দেওয়া হল। চার্লির গলা শোনা গেল। ঠিক আছে হোয়াইট হলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি, আলোও জ্বালাবার ব্যবস্থা করছি। কিন্তু লন্ডন ও গ্যাভোর থেকে আরও তথ্য চাইছে তোমার…
বন্ড বাধা দিল, কিছু মনে করো না চার্লি, পাঁচজন লোককে পাহারা দিতে দিতে এত গল্প চলে না। আমাকে কেবল সমুদ্রের অবস্থাটা বলে দাও। তারপর না নামা পর্যন্ত আর কথা নয়।
-ঠিক আছে স্পীডবোর্ড। বুঝতে পারছি। সমুদ্র ঠাণ্ডা আছে, অল্প হাওয়া বইছে। প্লেন নামাতে অসুবিধা হবে না। আমরা এখুনি তোমাদেরকে ধরে ফেলে নজর রাখছি রেডারে। এক গ্লাস হুইস্কি ও পাঁচ জোড়া হাতকড়াও তৈরি রাখছি। শুভেচ্ছা রইল।
বন্ড বলল, ধন্যবাদ চার্লি, সেই সঙ্গে এক কাপ চাও তৈরি করে রেখ। আমার সঙ্গে একটা সুন্দরী মেয়েও আছে।
মাইক্রোফোনটি ফেরত দিয়ে বন্ড বলল, পাইলট, ওরা সমুদ্রের ওপর আলোর সারি লাগানোর ব্যবস্থা করছে, সেই সঙ্গে বজরাও রাখছে। মাথা গরম না করে, আমরা সবাই যাতে জ্যান্ত অবস্থায় বেরোতে পারি সেই চেষ্টা কর। প্লেন পানিতে পড়া মাত্রই আমি দরজা খুলে দেব, তার আগে পর্যন্ত কেউ ককপীটের দরজায় পা দিলে শেষ হয়ে যাবে। ঠিক আছে।
পেছনে মেয়ের গলা শোনা গেল, আরেকটু হলেই দরজায় পা দিয়ে ফেলেছিলাম আর কি। আর সেটি করছি না, গুলি খেতে একটুও ভাল লাগে না। তুমি বরং চার্লির লোকটাকে ডেকে বলে দাও দুটো হুইস্কি তৈরি করতে, চা খেলে আমার হেঁচকি ওঠে।
বন্ড বলল, পুসি নিজের জায়গায় গিয়ে বস। শেষবারের মত সবদিক দেখে নিয়ে ককপীট থেকে বেরিয়ে এল।
দু ঘণ্টা পরে ওয়েদারশিপ চার্লির এক উষ্ণ কেবিনে শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনছিল বন্ড। শরীরের নানা জায়গা ব্যথায় টনটন করছে। প্লেনের একেবারে পিছন দিকে চলে গিয়েছিল, মেয়েটাকে হাঁটু মুড়ে চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছিল, আর নিজে মেয়েটার লাইফ-জ্যাকেট পরা শরীর পিছন দিক থেকে জাপটে ধরেছিল।
তাদের দুজনের শারীরিক অবস্থান সম্পর্কে রসাল মন্তব্য করছিল পুসি, এমন সময় ঘন্টায়–একশ মাইল বেগে বিশাল স্ট্রোটোক্রুজার বিমান নেমে এল সমুদ্রের পানিতে। প্রথম ধাক্কার তাই প্লেনের মেরুদণ্ড ভেঙে গেল। স্বর্ণ ভাণ্ডারের চাপে সেটা দুটুকরোও হয়ে গেল। বন্ড আর মেয়েটি ছিটকে পড়ল পানিতে। সমুদ্রের পানি তখন লাল আলোয় রক্তের মত দেখাচ্ছে। অর্ধচেতন অবস্থায় লাইফ জ্যাকেটে ত্র দিয়ে ভাবার পর লাইফ বোটের লোকেরা তাদের তুলে নিল। পাইলট পাঁচজন তিন টন সোনা নিয়ে ততক্ষণে আটলান্টিক মহাসাগরের অঞ্চলে। লাইফ বোটের লোকেরা দশ মিনিট ধরে খুঁজেও কাউকে পেল না।
