মেয়েটা খাবারের ট্রে ফেরত নিতে আসতেই বন্ড হাত থেকে ন্যাপকিন ফেলে দিল নিচে। পরে সেটা কুড়িয়ে মেয়েটার হাতে দিয়ে চোখে চোখ রেখে হাসল। মেয়েটা চুকুস করে গালে চুমু খেল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল, স্বপ্নে আবার দেখা হবে কার্তিক মশাই। বলে চলে গেল সামনের দিকে।
এবার বন্ড মনস্থির করে ফেলেছে। কি কি করতে হবে তাও ঠিক করে নিয়েছে। গোড়ালি থেকে ছোরা খুলে পকেটে কোটের ভিতর রেখেছে আর সীট বেল্টের সবচেয়ে লম্বা অংশটা বাঁ হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। এখন অডজবের দেহ সামনের জানালা থেকে সরলেই হয়। অডজব ঘুমোবে এমন আশা করা ভুল, তবে একটু গা এলিয়ে দিলেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু দেখা গেল সে একভাবে ছোট একটা আলোর নিচে বসে আছে।
এক ঘন্টা, দুঘন্টা, তালে তালে নিদ্রার ভান করে নাক ডাকতে শুরু করল। অডজবের দুই হাত কোলের ওপর উঠে এল, চুলে পড়তে পড়তে সামলে নিল। শেষে জানালা থেকে সরে এসে আরাম করে বসল।
বন্ড একইভাবে নাক ডাকছে, আর পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে একটু একটু করে এগোচ্ছে। ছোরাশুদ্ধ হাত উঁচিয়ে ধরল অডজবের চেয়ার ও জানালার কাঁচের মাঝখানে ফাঁক টুকুর দিকে। হাত যথাস্থানে পৌঁছে গেছে। ছোরার সুতীক্ষ্ণ আগাটা পার্সপেক্স কাঁচের জানালার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির হয়ে আছে। বন্ড সীট বেল্ট আরও শক্ত করে ধরে ছোরা বাগিয়ে ঝাঁপ দিল।
ছোরার ফলা জানালার কাঁচ চিরে দেখার পর যে কি হবে সে বিষয়ে বন্ডের কোন ধারণা ছিল না। তার শুধু মনে আছে খবরের কাগজে পড়েছিল, পারস্যের আকাশে সেই প্লেনটার জানালা ফেটে যাওয়ায় প্লেনের ভেতরের উচ্চ চাপ আবদ্ধ হওয়া সেই টানেই জানালার পাশে বসা লোকটিও জানালার বাইরে। এখন ছোরা টেনে নেবার সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত গর্জন করে সব হাওয়া ভাঙা জানলা দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। হাওয়ার টানে বন্ড ছিটকে গিয়ে পড়ল অডজবের চেয়ারের পেছনে, হাত থেকে সীট বেল্ট খুলে গেল। সেখান থেকেই এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখতে পেল বন্ড। অডজবের দেহ লম্বা হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে হাঁ করা কালো গর্তের দিকে। মাথাটা সশব্দে বেরিয়ে গেল। কিন্তু কাঁধজোড়া ধাক্কা খেল জানালার ফ্রেমে। পরক্ষণেই ভয়ঙ্কর শিসের মত এক শব্দের সঙ্গে লোকটির দেহ সেই গর্ত দিয়ে বাইরে অদৃশ্য হয়ে যেতে গিয়ে তার ভারি কোমর ফ্রেমে আটকে গেল, শেষে বোমার মত শব্দ করে ঠিকরে বাইরে পড়ে গেল।
পরমুহূর্তেই প্রলয় শুরু হল। কাপ প্লেট ভাঙ্গার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল প্লেন সোজা নিচে ঝাঁপ দিল। বন্ড দেখল খোলা জানালা দিয়ে তীব্র গর্জন ভেসে আসছে, আর সব বালিশ চাদর ঝটপট করে বাইরে উড়ে চলে যাচ্ছে। শেষবারের মত প্রাণপন চেষ্টায় সামনের চেয়ারটা জাপটে ধরে তীব্র বুকের ব্যথায় অক্সিজেনের অভাবে জ্ঞান হারাল।
জ্ঞান ফিরতেই জোর লাথি পাঁজরার ওপর। মুখে যেন রক্তের স্বাদ লাগল। বন্ড ককিয়ে উঠল, আরেকটা লাথি এসে পড়ল। অতিকষ্টে হাঁটু গেড়ে বসে ঝাপসা চোখে দেখে গোল্ডফিংগার দাঁড়িয়ে, হাতে অটোম্যাটিক পিস্তল।
আবার পা তুলে সজোরে মারলেন। বন্ডের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। পাটা ধরে ফেলে এমন জোরে মোচড় দিল। যে আরেকটু হলৈ ভেঙে যেত। চিৎকার করে এমনজোর পড়লেন যে প্লেনটা কেঁপে উঠল। বন্ড ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর সঙ্গে সঙ্গে বন্ডের মুখের একপাশ দিয়ে একটা গুলি বেরিয়ে গেল তীব্র শব্দ করে। পরমূহর্তে বন্ড গোল্ডফিংগারের তলপেটে হাঁটু দিয়ে জোরে আঘাত হানল। পিস্তলটা বাঁ হাতে চেপে ধরে।
জীবনে এই প্রথম বন্ড একেবারে ক্ষেপে গেল। দু হাতের মুঠো ও দুই হাঁটু দিয়ে গোন্ডফিংগারের সারা শরীরে। আঘাতের পর আঘাত করে চলল, আর কপাল দিয়ে চকচকে মুখটার ওপর ঘা মারতে লাগল। পিস্তলটা তুলতেই বন্ড হাতের পাশে আঘাত করল। পিস্তল ছিটকে পড়ল চেয়ারগুলোর পাশে।
গোল্ডফিংগার বন্ডের গলা টিপে ধরেছে আর বন্ড তার টুটি। হাঁপাতে হাঁপাতে সবটুকু ওজন দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে বন্ড। তার চকচকে মুখের চেহারা বদলে ঘনবেগুনী হয়ে গেল। চোখ উল্টে গিয়ে, গলা থেকে হাত খসে পড়ল। গোল্ডফিংগারের জিভ বেরিয়ে পড়েছে, আর ফুসফুসের গভীর থেকে এক ঘড়ঘড়ে আওয়াজ ভেসে এসেই সব স্থির। বন্ড গোল্ডফিংগারের গলা থেকে তার আঙ্গুলগুলো খুলে নিল।
বন্ড দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল আস্তে আস্তে। ঘোলাটে চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে সামনের চেয়ারে সীট বেল্ট জড়িয়ে পড়ে আছে পুসি গ্যালোর। প্লেনের মাঝামাঝি হাত পা ছড়িয়ে আর একজন প্রহরী, তার হাত মাথা বেঁক্লে গেছে। সীট বেল্ট না থাকায় প্লেনের ছাদের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে বোধহয়।
বন্ড মুখে হাত বোলাল, হাতের তালু ও গালের খানিকটা ঝলসে গেছে। ক্লান্তভাবে আবার হাঁটু গেড়ে বসে পিস্তলটা চেয়ারের তলা থেকে বার করে দেখে কোল্ট ২৫ অটোম্যাটিক পিস্তল, এখনো চারটে গুলি বাকি আছে। এবার মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল বন্ড। মেয়েটার বুকে হাত দিয়ে অনুভব করল হৃৎপিণ্ডের গতি, তারপর উপুড় করে শুইয়ে। দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করল। মেয়েটা একটু আওয়াজ করতেই উঠে সামনের প্রহরীর কাছ থেকে পিস্তল খুলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখল একটা অক্ষত বুর্বো বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেটা তুলে গলায় ঢেলে দিল ছিপি খুলে। ছিপি বন্ধ করে এগিয়ে গেল ককপিটের দরজার দিকে। একটু ভেবে নিয়ে দুই হাতে পিস্তল ধরে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
