বন্ড ঘুরে আরাম করে বসল। এবার গোল্ডফিংগার, তুমি আমাকে বল এসব কি হচ্ছে, প্লেনটা কি করে দখল করলে আর আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছ।
গোল্ডফিংগার পায়ের ওপর পা দিয়ে বসলেন। অন্য দিকে তাকিয়ে সহজ ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন, তিনটে ট্রাক নিয়ে হ্যাঁটেরাস অন্তরীপের দিকে পালিয়ে গেছিলাম। এই ট্রাকের একটিতে আমার নিজস্ব স্বর্ণভাণ্ডার, অন্য দুটোতে ছিল কয়েকজন ড্রাইভার ও সেই ছ জন দস্যু সর্দার। মিস গ্যালোর ছাড়া কাউকে আমার প্রয়োজন ছিল না। কয়েকজন বাছাই করা অনুচর বাদে সবাইকে অনেক টাকা দিয়ে ছেড়ে দিলাম। উপকূলে পৌঁছে মিস গ্যালোরকে ট্রাকে রেখে বাকিদের নিয়ে আলোচনার জন্য নির্জন স্থানে গেলাম, সেখানে আমার নিজস্ব কায়দায় মাথাপিছু একটা করে বুলেট খরচ কর মারলাম।
ট্রাকের কাছে গিয়ে ওদের বললাম যে, ঐ চারজন টাকা নিয়ে যে যার পথে চলে গেছেন। এখন আমার কাছে রইল ছ জন লোক, মেয়েটি ও একরাশ সোনা। একটা প্লেন ভাড়া নিয়ে নেওয়াক শহরে চলে এলাম। সোনার বাক্সগুলোকে এক্সরে প্লেট বলে চালাতে অসুবিধাই হয়নি। সেখানে থেকে একলা নিউইয়র্ক চলে এসে একটি বিশেষ জায়গা থেকে আমি বিশ্বে আমার সংস্থার সাথে বেতার যোগাযোগ করলাম। তাদেরকে জানালাম অপরেশন এ্যান্ড স্লামের ব্যর্থতার কথা। এই প্রসঙ্গে তোমার নামটাও উল্লেখ করেছি আমি। আমার এই সংস্থাটির নাম SMERSH, নামটা নিশ্চয়ই চেনা চেনা লাগছে –কঠিন দৃষ্টিতে বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন।
তোমার নাম শুনেই ওরা চিনতে পারল, আর আসল পরিচয় জানিয়ে দিল। তোমার সঙ্গে আলাপ করতে ইচ্ছুক। কথাটা বিবেচনা করে যথাসময়ে একটা মতলব খাড়া করলাম। তোমার বন্ধু পরিচয় দিয়ে তুমি কোন প্লেনের টিকিট কিনছ তা বেশ সহজেই জেনে নিলাম। আমার অনুচরদের মধ্যে তিনজন গত মহাযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীতে কাজ করেছে। তারা জানাল প্লেন চালাতে তারা জানে। বাকি রইল শুধু কাজ হাসিল করা। ধাপ্পা, ছদ্মবেশ ও সামান্য গায়ের জোরে আইডল ওয়াইল্ড বিমানবন্দরে বি. ও. এ. সি-র যাবতীয় কর্মচারি, প্লেনের পাইলট ও যাত্রীদের তোমারই মত ঘুম পাড়ানো ওষুধ দিয়ে দিলাম। পোষাক বদলে করে সোনা প্লেনে তুলে, তোমায় কাবু করে স্ট্রেচারে করে প্লেনে ওঠান হল, আর আমার কর্মীরা বি. ও. এ. সি-র প্লেন নিয়ে আকাশে উঠল।
একটু থেকে উদাস ভঙ্গি করে বললেন, ছোটখাট গোলমাল অবশ্য কয়েকটা হয়েছে, কারণ বিমানবন্দরের সব কায়দাকানুন এক মিনিটে রপ্ত করা সম্ভব নয়। ওয়্যারলেস অপারেটর জানাল যে একটু আগে এই প্লেনে ব্যাপক তল্লাসী শুরু হয়েছে। কিন্তু তাতে আমি বিচলিত নই। সঙ্গে প্রচুর পেট্রল। আছে। পূর্ব বার্লিন, জবুয়েত বা মুর্মানস্ক এই তিনটি বিমান বন্দরের যে কোন একটায় নামার অনুমতি পেয়ে গেছি। যেদিকে আবহাওয়া সুবিধের মনে হবে সেই দিকে যাব। কোনরকম ঝামেলা দেখা দিলে কথার প্যাঁচে ম্যানেজ করে নিতে হবে। এত দামী একটা প্লেন চুরির রহস্য ও গণ্ডগোল পরিষ্কার হবার আগেই আমি আমার এলাকায় পৌঁছে যাব। বলা বাহুল্য, তারপরই বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যাব আমরা সবাই।
সেই অপারেশন এ্যান্ড স্ল্যামের পরিকল্পনা শোনার পর কোন কিছুই আর বন্ডের কাছে বিস্ময়কর বা অসম্ভব বলে মনে হয় না। এতবড় একটা প্লেন চুরি করা এমনিতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও গোল্ডফিংগারের অভিনব সোনা স্মাগলিং ও এটম বোমা কেনার কাছে এটা নেহাতই তুচ্ছ। গোল্ডফিংগারের প্রতিভার কাছে এইসব সুবিশাল অপরাধকে আর তেমন অসম্ভব নয় বলে মনে হয় না। অপরাধের ক্ষেত্রে গোল্ডফিংগার যে ভাস্কর সেলিনি বা বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনের মত এক অতুলনীয় শিল্পী, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না।-আর এবার ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের মিঃ জেমস বন্ড, তোমার শর্তটুকু পালন কর। সবকিছু বল আমায়। কারা তোমায় আমার পেছনে লাগিয়েছে কি সন্দেহ হয়েছিল তাদের কি করে তুমি আমার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিলে?
বন্ড গোল্ডফিংগারকে মোটামুটি সব বললেও বেশ কিছু বাদ দিতে ভুলল না। SMERSH-এর সম্পর্কে কিছু নয়, হোমার যন্ত্রের সম্পর্ক নয়। শেষে বলল, অতএব বুঝতে পারছ খুব অল্পের জন্য বেঁচে গেছ তুমি, জেনিভাতে টিলি মাস্টারটন নাক না গলালে অনেক আগেই তুমি ধরা পড়ে যেতে। এতদিনে হয়ত সুইস জেলখানায় বসে ইংল্যান্ডে পাচার হবার জন্য অপেক্ষা করতে। ইংরেজদের অত তাচ্ছিল্যের চোখে দেখ না। কাজ আমরা আস্তে আস্তে করি বটে কিন্তু কাজটা শেষ করেই ছাড়ি।
.
এবার প্রেম
আকাশের বুক চিরে, চাঁদের আলোয় ভরা পৃথিবীর অনেক ওপর দিয়ে ধাতব পক্ষী উড়ে চলেছে। ভিতরে অন্ধকার। বন্ড শুধু চুপচাপ বসে বসে ঘামছে, তার পরবর্তী পদক্ষেপের কথা চিন্তা করে।
এক ঘণ্টা আগে মেয়েটা খাবার এনেছিল, ন্যাপকিনের মধ্যে একটা লুকনো পেন্সিল দিয়ে কয়েকটা কড়া মন্তব্য করে বন্ডের সামনে থেকে চলে গেল।
কি যেন একটা কথা বারবার মনে পড়ছে। গত ১৯৫৭ সালে পারস্যের ওপর দিয়ে যাবার সময় একটা প্লেনে কি যেন ঘটেছিল? বন্ড কিছুক্ষণ একভাবে সামনের চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করল। হতে পারে! খুব হতে পারে!
ন্যাপকিনের ভিতর সে লিখে দিল : যথাসম্ভব চেষ্টা করছি। তুমি কোমরে সীট বেল্ট বেঁধে চুপ করে বসে থাক।–জ।
