বন্ড পাসপোর্টের ভিতর থেকে সার্টিফিকেট বার করে দিল। লোকটি সেটা ভালভাবে পরীক্ষা করে দিয়ে বলল, কিছু মনে করবেন না স্যার, গ্যান্ডার শহরে টাইফয়েড ছড়িয়ে পড়েছে বলে নির্দেশ এসেছে, যে সব যাত্রী ঐ শহরের এয়ারপোর্টে পা দেবেন তাদের প্রত্যেককে প্রতিষেধক ইঞ্জেকশন নিতে হবে। লন্ডনে যেতে গেলে আমাদেরকে গ্যান্ডার হয়ে যেতে হবে। সোজাপথে ঝড় চলছে।
ইঞ্জেকশন নিতে বন্ডের একদম ভাল লাগে না। বিরক্ত হয়ে বলল, দেখুন গত বিশ বছর ধরে আমি যত রাজ্যের প্রতিষেধক ইঞ্জেকশন নিয়েছি তাতে একদিন না নিলে কিছু এসে যাবে না। চারদিকে তাকাল সে। বি. ও. এ. সি-র রেবোবার দরজাটা আশ্চর্যরকম নির্জন। বলল, অন্য যাত্রীরা কি বলছে কোথায় তারা?
–তারা সবাই রাজি হয়েছেন। প্রত্যেকেই গেছেন ইঞ্জেকশন নিতে। আপনি একটু এদিকে আসুন স্যার, এক মিনিট ও লাগবে না।
-আচ্ছা ঠিক আছে। লোকটার পিছন পিছন বন্ড বি. ও. এ. সি-র স্টেশন ম্যানেজারের অফিসে গিয়ে উপস্থিত হল। সেখানে চিরাচরিত সাদা পোশাক পরা এক ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন তার মুখের নিচটা সাদা কাপড়ে ঢাকা হাতে ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, এই শেষজন তো? কর্মচারিটিকে প্রশ্ন করলেন তিনি।
-হ্যাঁ ডাক্তার।
-ঠিক আছে, কোট খুলে ফেলে বাঁ হাতে আস্তিনটা গুটিয়ে নিন। গ্যান্ডারের লোকগুলো বাড়াবাড়ি না করলে এসব কোন ঝামেলা হত না।
–বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা উচিত। টাইফয়েড নিয়ে এত ভয় পাবার কি আছে, এত আর প্লেগ নয়। স্পিরিটের গন্ধ পাওয়া গেল, সেই সঙ্গে সূঁচ বিধানোর।
ধন্যবাদ ব্যাজার মুখ করে বলল বন্ড। শার্টের আস্তিন নামিয়ে দিয়ে চেয়ারের পেছন থেকে কেস্টটা নিতে গেল, হাত বাড়াল ছুঁতে পারল না। হাতটা সোজা নেমে এল নিচে আরও নিচে, সেই সঙ্গে শরীরও।
প্লেনের সবকটা আলো জ্বলছে। মনে হচ্ছে যেন অনেক সীট খালি। বন্ড উঠে অন্য একটা চেয়ারে বসতে গেল, সঙ্গে সঙ্গে এমন চক্কর দিল গাটা, যে থেমে গেল। চোখ বুজে খানিকক্ষণ বসে রইল। তাজ্জব ব্যাপার, প্লেনে চড়বার জন্য তো কখনও শরীর খারাপ হয় না। মুখে ঘাম ফুটেছে। রুমালবার করতে গেল বন্ড। পরক্ষণেই আবিষ্কার করল হাত দুটো বাধা চেয়ারের হাতলের সঙ্গে। ব্যাপারটা কি, ইঞ্জেকশন নেবার পর বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারপর কি হয়েছে এসব। ডানদিকে তাকাল সে। বিস্ময়ে দু চোখ বড় হয়ে উঠেছে, অডজব। অডজব বসে আছে বি. ও. এ. সি কোম্পানির পোশাকে।
নির্লিপ্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে ঘন্টি বাজাল। পাশে স্কার্টের খসখস শব্দ। বন্ড দেখল পুসি গ্যালোর। এয়ার হোস্টেসের নীল ইউনিফর্ম পরে বেশ ছিমছাম দেখাচ্ছে তাকে। সেই গভীর সন্ধানী দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বলল, এই যে কার্তিক মশাই।
বন্ড মরিয়া হয়ে বলে উঠল, সৃষ্টিকর্তার দোহাই এ সব কি হচ্ছে? তুমি আবার কোথা থেকে এলে?
মেয়েটা উজ্জ্বল হাসি হেসে বলল, এই তো বেশ খাচ্ছি আর শ্যাম্পেন টানছি। তোমরা ইংরেজরা, দেখছি আকাশে উড়লে বেশ রাজসিক চালে থাক। ভাল ভাল, খাবার দাবারের একেবারে ছড়াছড়ি। তুমি ব্যস্ত হয়ো না। খুড়ো মশাই। তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসছেন। কোমর দুলিয়ে ককপিটের ওপরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কিন্তু সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার, ঢলঢলে এক বি. ও. এ. সি-র ক্যাপ্টেনের পোশাক পরে ককপিটের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং গোল্ডফিংগার। বন্ডের কাছে এলেন।
গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ বন্ডকে দেখে বললেন, মিঃ বন্ড নিয়তির নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের খেলার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে আমরা। এবার কিন্তু আর কোন গোপন চালাকি করার সুযোগ থাকবে না। কি বল? গোেল্ডফিংগারের গলায়। বিচিত্র সুর। দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষেছিলাম আমি। বিরাট মাথাটা সক্ষোভে নড়ে উঠল। কেন বাঁচিয়ে রেখেছিলাম তোমাকে। কেন মেরে ফেলিনি। তুমি আর ঐ মেয়েটি আমার অনেক কাজে লেগেছে। সে বিষয়ে কোন ভুল হয়নি, তবে এতবড় ঝুঁকি নেওয়াটা স্রেফ পাগলামি ছিল। তার গলা শান্ত মৃদু হয়ে এল। এবার বল মিঃ বন্ড, কি করে এ কাজ করলে তুমি। কেমন করে খবর পাঠালে বাইরে।
বন্ড শান্ত স্বরে বলল, বলব, গোল্ডফিংগার অনেক কথাই বলব। তার আগে বাঁধন খুলে দাও, আর সোডা ও এক প্যাকেট চেস্টার ফিল্ড সিগারেট আনতে বল। তারপর তোমার সব প্রশ্ন শোনার পর ভেবে দেখব উত্তর দেব কিনা? তুমি এই মাত্র বলছিলে আমার অবস্থা তেমন সুবিধার নয়, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে। মানে কোন কিছু হারাবার আর ভয় নেই। আমার কাছ থেকে কিছু পেতে চাইলে, আমার শর্ত অনুযায়ী চলতে হবে তোমাকে।
গোল্ডফিংগার গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তোমার শর্ত মানতে আমার আপত্তি নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তোমার ক্ষমতাকে সম্মান দেখাবার জন্যই তোমার এই শেষ যাত্রায় আরামের কোন ত্রুটি রাখব না। অডজ ঘন্টি বাজিয়ে মিস গ্যালোরকে ডাক আর ওই বাধন খুলে দাও। তুমি সামনের চেয়ারটাকে এতে বস। প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে খতম। করে দেবে। তবে জ্যান্ত অবস্থায় একে আমাদের গন্তব্য স্থলে নিয়ে যেতে পারলে ভাল হয়।
-আররুখ।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে সবকিছু এসে গেল। কড়া এক গ্লাস মদ ঢালল বন্ড, গ্লাস তুলে ছোট্ট একটা চুমুক দিল। আরো বড় সড় একটা চুমুক দিতে যাবে এমন সময় একটা আশ্চর্য জিনিস চোখে পড়ল। সাবধানে গ্লাস নামিয়ে রেখে সিগারেট ধরিয়ে আবার গ্লাস তুলে নিল, বরফের টুকরো গুলো তুলে নিয়ে গ্লাস খালি করতেই তলায় আটকান কাগজের টুকরোটা স্পষ্ট দেখা গেল। বন্ড গ্লাস নামিয়ে রাখল। তাতে লেখা ছিল? আমি তোমার সঙ্গে আছি।
